Ajker Patrika

মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, বন্ধুত্বের কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ২৭
মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, বন্ধুত্বের কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক
পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ছবি: বিবিসি

হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মক্কা চুক্তি অনুযায়ী, এই জোটের একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু সৌদি আরবে হুতিদের হামলার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তান বা তুরস্ক কেউই সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেনি।

গত কয়েকদিনে সৌদি ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এরপরও চুক্তিভুক্ত দুই প্রধান মিত্র পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সহায়তায় এগিয়ে না আসায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিকারের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট, নাকি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির একটি কাঠামো?

চুক্তিটি গঠনের সময় এটিকে অনেকেই ন্যাটোর আদলে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এটি ন্যাটোর মতো এমন কোনো ব্যবস্থা নয়, যেখানে একজন সদস্যের ওপর হামলাকে সবার বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়।

মূলত ২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে পরে তুরস্ককে যুক্ত করে মক্কা চুক্তি সম্প্রসারণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর সৌদি আরব যখন ধারাবাহিক হামলার মুখে, তখন পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থেকেছে কূটনৈতিক সমর্থন এবং সংহতির বিবৃতিতে।

গত সপ্তাহ থেকে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা এবং কৌশলগত অবকাঠামো।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বা পেট্রলাইনে হামলার মাধ্যমে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার পর এই পাইপলাইনই ছিল ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ।

এ ছাড়া ইয়ানবু থেকে এশিয়ার বাজারে তেল পাঠাতে হলে জাহাজগুলোকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। আর ইয়েমেন উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও মোখা বন্দর দখলের মাধ্যমে হুতিরা এখন সেই রুটেও বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে সৌদি আরবের দুটি বিকল্প জ্বালানি করিডরই চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবে হামলার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়—হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা আঞ্চলিক শান্তি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি। শাহবাজ শরিফ আরও বলেন, পাকিস্তান সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং হারামাইন শরিফাইনের (মক্কা ও মদিনায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী) নিরাপত্তার প্রশ্নে অবিচল।

তবে এই অবস্থান সত্ত্বেও পাকিস্তান কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। ইসলামাবাদের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। প্রথমত, হুতিদের প্রধান মিত্র ইরানের সঙ্গে ৯০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে পাকিস্তানের। কয়েক বছর আগেই সীমান্ত এলাকায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় দেশটির। দ্বিতীয়ত, পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা, উত্তর-পশ্চিমে আফগান তালেবানের সঙ্গে সংঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরে বেলুচ ও তেহরিক-ই-তালেবান বিদ্রোহ মোকাবিলায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে।

এ ছাড়া পাকিস্তানের বড় শিয়া জনগোষ্ঠীও ইরানবিরোধী যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকে রাজনৈতিকভাবে জটিল করে তুলতে পারে।

এদিকে তুরস্কও এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আঙ্কারার মূল আগ্রহ ছিল প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো সহযোগিতা সম্প্রসারণে। মক্কা চুক্তিকে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক সক্ষমতার বাজার বিস্তারের সুযোগ হিসেবেও দেখেছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আগে বলেছিলেন, এই চুক্তি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন বার্তা বহন করবে। তবে বর্তমান সংকটে সেই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ এখনো দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে বর্তমানে সৌদি আরব একদিকে হুতিদের হামলা, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক চাপের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি। যদিও মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদির প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন জানিয়েছে, তবু কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। আবার মিশর মক্কা চুক্তির আগের আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোটে যোগ দেয়নি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আর্থিক ও জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর সৌদি আরবের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকলেও ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে নামানো সহজ হবে না। অন্যদিকে, হুতিদের দখলে বাব আল-মান্দেব ও ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল চলে যাওয়ায় লোহিত সাগর হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহও নতুন ঝুঁকিতে পড়েছে।

প্রতিরোধ নাকি প্রতীকী জোট

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। চুক্তিটি এখনো ভেঙে যায়নি, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক সংহতি দেখালেও পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার যে ধারণা নিয়ে এটি প্রচারিত হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রমাণ এখনো মেলেনি।

ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আপাতত একটি কার্যকর যুদ্ধজোটের চেয়ে প্রতিরোধের একটি প্রতীকী কাঠামো হয়েই প্রতীয়মান হয়েছে—যার বাস্তব সামরিক সক্ষমতা এখনো অপ্রমাণিত।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত