Ajker Patrika

এএফপির প্রতিবেদন /বাংলাদেশের নির্বাচন বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বাংলাদেশের নির্বাচন বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য
ছবি: সংগৃহীত

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শেখ হাসিনাপরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব যখন কিছুটা স্থিমিত, তখন বেইজিং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালে তাঁর পতনের পর তাঁকে আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লি সম্পর্কের শৈত্যপ্রবাহ এই নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখলেও ভারতের সঙ্গেই ছিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক। বিশ্লেষকদের মতে, সেই সমীকরণ এখন বদলাতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার বাস্তব অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চীনের কৌশলগত চিন্তায় বাংলাদেশ এখন কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে এসেছে। চীন আত্মবিশ্বাসী যে, এই কৌশলে বাংলাদেশ চীনঘনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে।

এই কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে ড. ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরই ছিল চীনে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, যার আওতায় একটি ড্রোন কারখানা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনের ফল যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় অপরিবর্তনীয়।

এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং একে ‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলমান আক্রমণ’ বলে উল্লেখ করে।

যদিও বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন। তবে ঢাকার দাবি, ভারত সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরছে।

এর মধ্যেও সম্পর্ক মেরামতের কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় যান। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি পাঠান।

তবে পরে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিক্ষোভের মুখে এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হলে বাংলাদেশ ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, দুই দেশই শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদী অবস্থান নেবে। ঢাকা ও নয়াদিল্লি—উভয়ই জানে সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকলে তার মূল্য কতটা বড় হতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। এক দশকের বেশি সময় পর গত জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকার ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

দোন্থি বলেন, নতুন সরকার অস্থিরতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল হতে পারে। তিনি বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা জামায়াতে ইসলামীও এবারের নির্বাচনে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে।

তবে সব বিতর্কের মধ্যেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি এখনো অটুট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থিতিশীল রয়েছে এবং শেখ হাসিনা সরকারের সময় সই হওয়া মাত্র একটি চুক্তি (ভারতীয় টাগবোটসংক্রান্ত) বাতিল করা হয়েছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও ঢাকায় দেশটির উপহাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমনভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করে, যা ভারত পারে না। কিন্তু বাংলাদেশ যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল—বিদ্যুৎ ও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল—সেগুলো ভারত সরবরাহ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও তা ভারতের সঙ্গে শত্রুতায় রূপ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

হুমায়ুন কবির বলেন, এটা ‘একটি না হলে আরেকটি’ এমন পরিস্থিতি নয়। চীন ও ভারত দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক সমান্তরালভাবে বিকশিত হতে পারে।

এএফপি থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মাথায় গুলিবিদ্ধ জুলাই যোদ্ধা আশরাফুল মারা গেছেন

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত-আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়: সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি

ঢাকা–১৮ আসনে নির্বাচন না করার ঘোষণা মাহমুদুর রহমান মান্নার

আইসিসি-পিসিবির সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে হঠাৎ লাহোরে বিসিবি সভাপতি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শেষ সময়ে এমপিওর তোড়জোড়

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত