Ajker Patrika

স্পেসএক্স–এক্সএআই একীভূতকরণ: রকেট আর এআইকে কেন এক সুতোয় বাঁধছেন মাস্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
স্পেসএক্স–এক্সএআই একীভূতকরণ: রকেট আর এআইকে কেন এক সুতোয় বাঁধছেন মাস্ক
স্পেসএক্স ও এক্সএআইকে একীভূত করার কথা ভাবছেন ইলন মাস্ক। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক। তাঁর অধীনেই পরিচালিত হয় মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি এক্সএআই। এই দুটি কোম্পানিকে একীভূত করতে চান তিনি। আর স্পেসএক্সের হাতে এক্সএআই–এর অধিগ্রহণ মাস্কের জন্য পরিচিত ধাঁচের একটি চুক্তি। বড় অঙ্ক, বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

মাস্কের ভাষায়, এই চুক্তির লক্ষ্য শুধু ‘চেতনাকে নক্ষত্রে ছড়িয়ে দেওয়া’ নয়। এর মাধ্যমে তাঁর রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপ এক্সএআই একত্র হয়ে তৈরি হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি ব্যবসা। এই হিসাবে স্পেসএক্সের মূল্য ধরা হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এক্সএআই–এর মূল্য ২৫০ বিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, মাস্কের জন্মদিন ও একটি নাক্ষত্রিক অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখে আগামী জুনে কোম্পানিটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি বা আইপিও হতে পারে।

তবে এই চুক্তি ঘিরে প্রশ্নও আছে। বিশেষ করে এটি স্পেসএক্সের সেই শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কতটা ভালো, যারা মাস্ক নন। পাশাপাশি, এই উদ্যোগের পেছনের প্রযুক্তিগত ধারণা আদৌ সফল হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

রকেট আর এআইকে কেন এক সুতোয় বাঁধছেন মাস্ক

এই চুক্তির মূল যুক্তি হিসেবে মাস্ক যে বিষয়টি সামনে আনছেন, তা হলো ডেটাসেন্টারকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া। ডেটাসেন্টারই এআই প্রযুক্তির কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। মাস্কের যুক্তি, এআই কোম্পানিগুলো এখনো পৃথিবীর ডেটাসেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এসব ডেটাসেন্টারের শক্তির চাহিদা বিপুল। এর সমাধান হিসেবে তিনি প্রস্তাব দিচ্ছেন, কক্ষপথে প্রায় ১০ লাখ স্যাটেলাইট বসিয়ে বিশাল সৌরশক্তিনির্ভর ডেটাসেন্টার তৈরি করা।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের স্কুল অব কনভার্জেন্স সায়েন্স ইন স্পেস, সিকিউরিটি অ্যান্ড টেলিকমসের সহপরিচালক অধ্যাপক জুলি ম্যাকক্যান ও অধ্যাপক ম্যাথিউ স্যান্টার বলছেন, ভবিষ্যতে সৌরশক্তিচালিত ডেটাসেন্টার এআই কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। তবে বর্তমান স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে কতটা কম্পিউটিং ক্ষমতা পাওয়া যাবে, তার সীমাবদ্ধতা আছে। তাই মাস্কের কল্পনার মতো পুরো গ্রহজুড়ে ছড়িয়ে থাকা, বহু স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল বিতরণকৃত কম্পিউটার প্রয়োজন হবে।

তাঁরা আরও বলছেন, এই ধারণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কক্ষপথে থাকা ডিভাইসগুলোর মধ্যে সংযোগের মান খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ, পৃথিবীর ডেটাসেন্টারের মতো কাজ করতে হলে এসব স্যাটেলাইটকে একসঙ্গে, সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং ফলাফল পৃথিবীতে পাঠাতে হবে।

এ ছাড়া সৌর বিকিরণ, যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা সমস্যাও আছে। তাঁদের ভাষায়, পৃথিবীর ডেটাসেন্টারে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়। যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া সেখানে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মহাকাশে যন্ত্রাংশ পাঠানো জটিল ও ব্যয়বহুল। সেখানে যন্ত্রাংশ কীভাবে বসানো হবে, সে ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের উদ্ভাবন দরকার হবে।

মাস্কের দাবি, এসব মহাকাশভিত্তিক ডেটাসেন্টার প্রতি বছর ১০০ গিগাওয়াট এআই সক্ষমতা যোগ করবে। অথচ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডেটাসেন্টারের মোট সক্ষমতা প্রায় ৫৯ গিগাওয়াট। অর্থাৎ, তাঁর কল্পনা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। বিশ্বের শীর্ষ ধনী এই ব্যক্তি মনে করেন, রকেট হার্ডওয়্যার ও এআই সফটওয়্যারের এই মেলবন্ধনই বিজয়ী সমাধান। কর্মীদের পাঠানো এক বার্তায় তিনি বলেন, এতে পৃথিবীর ভেতরে ও বাইরে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, উল্লম্বভাবে সমন্বিত একটি উদ্ভাবনী ইঞ্জিন তৈরি হবে।

ওয়েডবুশ সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক ড্যান আইভস বলেন, এই একীভূকরণ আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কম খরচে এআই কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরির একটি নতুন পথ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই করা হয়েছে। তাঁর মতে, শীর্ষ ইন্টারনেট ও মহাকাশ অনুসন্ধান কোম্পানির সঙ্গে শীর্ষ ডেটাসেন্টার নির্মাতাদের একত্র করাই এই উদ্যোগের মূল শক্তি।

এক্সএআই–এর কি স্পেসএক্সের অর্থনৈতিক সহায়তা দরকার

মাস্কের এআই কোম্পানি এক্সএআই এমন সব প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়ছে, যারা তাদের অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে এবং তুলছে। এসব অবকাঠামোর মধ্যে আছে ডেটাসেন্টার ও কম্পিউটার চিপ। এক্সএআই গ্রোক নামের একটি এআই টুল তৈরি করেছে এবং একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিকানাও তাদের হাতে। খবরে বলা হয়, গত বছর এক্সএআই প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। মেটা, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে এক্সএআই–এর কোনো পুরোনো, লাভজনক ব্যবসা নেই, যা থেকে তারা এআই উন্নয়নের অর্থ জোগাতে পারে।

টেসলা ও স্পেসএক্সের বিনিয়োগকারী রস গারবারের মতে, স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হলে এক্সএআই নগদ অর্থ ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও সহজে পৌঁছাতে পারবে। গারবার বলেন, মাস্কের হাতে এক্সএআই–এর জন্য অর্থ ফুরিয়ে আসছে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বীরা এআই খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার ঢালছে। এই পরিস্থিতিতে স্পেসএক্স ও এক্সএআই এক হলে এক্সএআই–কে সমর্থন দেওয়া সম্ভব হবে। কারণ, স্পেসএক্স অনেক বিনিয়োগকারীর কাছেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি প্রতিষ্ঠান।

স্পেসএক্সের শেয়ারহোল্ডাররা কী ভাবছেন

স্পেসএক্সের প্রযুক্তি জটিল হলেও ব্যবসার ধরন তুলনামূলকভাবে সহজ। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে তারা আয় করে। এর মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে রসদ পাঠানো। পাশাপাশি তারা স্টারলিংক নামে স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা চালায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্পেসএক্স প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্বের বিপরীতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে।

স্কেনিক ম্যানেজমেন্টের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল সোবেল বলেন, এক্সএআই যুক্ত হওয়ায় স্পেসএক্সের গল্প আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাঁর প্রতিষ্ঠান বেসরকারি কোম্পানির সেকেন্ডারি শেয়ার কেনে এবং তারা এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকেও বিনিয়োগ করেছে।

সোবেল নিয়মিত স্পেসএক্সের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, এক্সএআই–এর মতো একটি কোম্পানিকে যুক্ত করলে, যার মাসিক খরচ অনেক বেশি, তখন এক রাতেই পুরো কোম্পানির আর্থিক কাঠামো বদলে যায়। সেকেন্ডারি বাজারে সাধারণত সহজ ও স্পষ্ট ব্যবসায়িক কাঠামোই বেশি পুরস্কৃত হয়। এই একীভূকরণে বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি হিসাব–নিকাশ করতে হবে, বিশেষ করে এক্সএআই–এর খরচ স্পেসএক্সের মূল্যায়ন ও আইপিওর সময়সূচিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা বুঝতে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের বোঝা। এই প্ল্যাটফর্মটি প্রায়ই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবু সোবেলের মতে, এই চুক্তির পক্ষে যুক্তিটাও শক্তিশালী। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি সবচেয়ে উন্নত এআই ‘মস্তিষ্ক’কে সবচেয়ে উন্নত হার্ডওয়্যার ‘দেহ’-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। এর সম্ভাব্য সুফল হলো ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে নিউরাল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

রস গারবার, যিনি ২০২২ সালে টুইটার নামে পরিচিত এক্স অধিগ্রহণের সময় মাস্কের সঙ্গে বিনিয়োগ করেছিলেন, বলেন তিনি এই চুক্তিতে খুশি। তবে স্পেসএক্সের বিনিয়োগকারীরা কী ভাবছেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

গারবার জানান, এক্সের একজন শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তিনি খুবই সন্তুষ্ট। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর বিনিয়োগের টাকা হয়তো হারিয়ে গেছে। কিন্তু এখন সেই বিনিয়োগ পরোক্ষভাবে স্পেসএক্সের শেয়ারে রূপ নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটা তাঁর জন্য দারুণ। তবে তিনি নিজে যদি স্পেসএক্সের শেয়ারহোল্ডার হতেন, তাহলে তিনি ভীষণ বিরক্ত হতেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আইসিসি-পিসিবির সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে হঠাৎ লাহোরে বিসিবি সভাপতি

১৩ অস্ত্রসহ সুব্রত বাইনের সহযোগী দীপু গ্রেপ্তার

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শেষ সময়ে এমপিওর তোড়জোড়

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত-আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়: সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি

আজকের রাশিফল: আপনার উন্নতি দেখে অনেকের জ্বলবে, চ্যাট হিস্ট্রি সাবধানে রাখুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত