Ajker Patrika

হত্যা-গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল চার সংস্থা—জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৫৫
হত্যা-গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল চার সংস্থা—জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে চারটি অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছিলেন শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দীকি। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি এ সাক্ষ্য দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে–১ এই জবানবন্দি নেওয়া হয়।

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দীকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাহিনীপ্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন; ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি, আনসার ও বিজিবিকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র; যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে।

জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি (তারিক আহমেদ সিদ্দীকি) পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (Military Secretary to Prime Minister), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সব নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাহিনীপ্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনীপ্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তারিক আহমেদ সিদ্দীকি বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন।

জেনারেল (অব.) ইকবাল বলেন, চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। তাঁদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।

র‍্যাব প্রসঙ্গে ইকবাল করিম জানান, সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই তিনি র‍্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরে লে. জেনারেল) মুজিবকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁকে ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলেন। সেনাপ্রধান তাঁকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেন। সে সময় মুজিব কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরে কিছুদিন পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা আসেনি। কিন্তু অচিরেই সেনাপ্রধান উপলব্ধি করতে পারেন, ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায়, যখন বেনজীর আহমেদ র‍্যাবের ডিজি এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন।

সেনাপ্রধান তাঁর ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার (আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। জগলুল আহসান সেনাপ্রধানকে জানান, তিনি কথা বলেছেন, কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছ থেকে পাননি। আর ফজল জানান, কথা বলে কোনো লাভ হয়নি। জিয়াউল আহসানের মাথা ইট ও পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা।

জিয়াউল আহসান সম্পর্কে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, তারিক আহমেদ সিদ্দীকি ও তাঁর কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রচ্ছায়ায় তিনি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করতে শুরু করেন। দুজন অফিসারের বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শাস্তি হিসেবে র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও তিনি তাঁদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। সেনাপ্রধান জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। তবে এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন সেনাপ্রধানকে ফোন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জিয়াউল আহসানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য তিনি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

সাবেক সেনাপ্রধান জানান, তাঁকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হলো, সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠানো হলে তাঁরা পেশাদার খুনি হয়ে ফিরে আসতেন। যাঁরা ফিরে আসতেন, তাঁদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে তিনি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র‍্যাবে থাকা সদস্যদের ফেরত আনার জন্য আবেদন করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন—র‍্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তবে প্রধানমন্ত্রী কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মাথায় গুলিবিদ্ধ জুলাই যোদ্ধা আশরাফুল মারা গেছেন

আইসিসি-পিসিবির সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে হঠাৎ লাহোরে বিসিবি সভাপতি

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত-আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়: সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শেষ সময়ে এমপিওর তোড়জোড়

আজকের রাশিফল: আপনার উন্নতি দেখে অনেকের জ্বলবে, চ্যাট হিস্ট্রি সাবধানে রাখুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত