Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়েছে, নাকি সমঝোতা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়েছে, নাকি সমঝোতা
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। গত সোমবার দুই দেশের নেতারা বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা এ বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেন। প্রায় এক বছর ধরে চলা আলোচনার পর এই ঘোষণা আসে, যে আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছিল।

তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তার বেশির ভাগই এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সংক্ষিপ্ত মন্তব্য এবং ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নাম প্রকাশ না করা সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে।

যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তা হলো—চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত পাঠ, কোনো যৌথ বিবৃতি কিংবা বিস্তারিত তথ্যপত্র (ফ্যাক্ট শিট)। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক একে পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক বাণিজ্য চুক্তির বদলে একটি প্রাথমিক কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করছেন।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চমৎকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে’ এবং ঘোষণা দেন যে—দক্ষিণ এশীয় এই দেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হবে।

এরপর এক্সে দ্রুত এর প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান, তবে এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি বা শর্তের কথা বলেননি।

এ পর্যন্ত নতুন এই চুক্তি সম্পর্কে যা জানা গেছে, তার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ভারতীয় পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাবে। তিনি আরও বলেন, ভারত যদি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর আরোপ করা ২৫ শতাংশের শাস্তিমূলক শুল্কও তুলে নেবে।

গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে ভারতীয় রপ্তানির ওপর কার্যত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত ছিল। এর কারণ ছিল—রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রাখায় ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শুল্কহারযুক্ত দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন এবং তার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল আমদানি করবেন। এর বিনিময়ে শাস্তিমূলক শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘তিনি (মোদি) রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনতে সম্মত হয়েছেন। এটি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সহায়ক হবে।’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার পুরোপুরি নির্ভর করছে ভারতের রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করার ওপর।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ছাড়ে রাশিয়ার তেল আমদানি করা যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ভারত মস্কোর যুদ্ধ তহবিল জোগাতে সহায়তা করছে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত রাশিয়ার বড় তেল ক্রেতা না হলেও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া যখন ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছে কম দামে তেল বিক্রি শুরু করে, তখন ভারত তার অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের ফলে ভারতে রাশিয়ার তেলের প্রবাহ কিছুটা কমেছে, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি বা তাঁর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি যে, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে কি না। মোদি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় কেবল শুল্ক কমানোর বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে দারুণ লাগল। ‘‘মেড ইন ইন্ডিয়া’’ পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হওয়ায় আমি আনন্দিত।’

মোদি আরও বলেন, ট্রাম্পের নেতৃত্ব ‘বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।

অন্যদিকে, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ক্রেমলিন জানায়, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবে—এমন কোনো বক্তব্য তারা শোনেনি এবং দিল্লির সঙ্গে তাদের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং তা আরও গভীর করবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করবে—এই দাবি ‘বিশ্বাস করা কঠিন’। কারণ, মোদি কেবল শুল্ক নিয়েই কথা বলেছেন।

কুগেলম্যানের মতে, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ভারত তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা বন্ধ করবে—এটা অস্বাভাবিক এবং মানার মতো নয়।

তবে কুগেলম্যানও বলেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ভারত-যুক্তরাষ্ট্র গ্যাস চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের তেল আমদানি বাড়ানো—এসব বিষয়ই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ কমিয়েছে এবং চুক্তি চূড়ান্ত করতে সহায়তা করেছে।

ট্রাম্পের দাবি, মোদি তাঁর ‘বাই আমেরিকান’ (মার্কিন পণ্য কিনুন) নীতিতে সম্মত হয়েছেন এবং ভারত জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন পণ্য কিনবে। তবে তিনি এর কোনো বিস্তারিত দেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পক্ষে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এমন অঙ্গীকার করা কঠিন। বিশেষ করে, ভারতীয় পক্ষ প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু না বলায় ট্রাম্পের ঘোষণার এই অংশকে সবচেয়ে অস্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ইভান ফাইনগারবাম সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই লক্ষ্য বাস্তবতার তুলনায় অনেকটাই বাড়িয়ে বলা। ভারতের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও সময়সীমা বা খাতভিত্তিক স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব এই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি সম্ভবত স্বল্পমেয়াদি বাধ্যবাধকতার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষামূলক লক্ষ্য।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এক ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা জানান, চুক্তির আওতায় ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে এবং একই সঙ্গে কৃষি খাত আংশিকভাবে উন্মুক্ত করতে রাজি হয়েছে।

কিন্তু গত ১২ মাসের আলোচনায় কৃষি খাতই ছিল অন্যতম বড় বাধা। কারণ, সামান্য উদারীকরণও ভারতীয় কৃষকদের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।

ভারতের কৃষিশ্রমিকদের বড় অংশই ছোট ও প্রান্তিক কৃষক। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাত উন্মুক্ত করার বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁদের যুক্তি—যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা ব্যাপক ভর্তুকি ও আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থার সুবিধা পান, ফলে তাঁরা দেশীয় উৎপাদকদের সহজেই বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। গ্রামীণ জীবিকার ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরাও এ বিষয়ে সতর্ক। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধপণ্য বাজারে ঢুকলে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং প্রায় সাত কোটি ভারতীয়ের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, ভারতের দুগ্ধ খাত নিয়ে উদ্বেগ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, ভারত তাদের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের প্রবেশাধিকার দেবে—যেমনটা ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এটিই একসময় ছিল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ধারণা করা হচ্ছে, এখন এসে সেটা মেনে নিয়েছে দিল্লি। কিন্তু এই চুক্তির কোনো তথ্য কেউ জানে না বা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

ভারতের প্রায় ৭০ কোটি মানুষ কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, গত এক বছরে ট্রাম্প-মোদির পাঁচ দফা আলোচনা ও আটবার ফোনালাপ হয়েছে; কিন্তু দিল্লি কোনোভাবেই কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে চুক্তিতে সই করতে রাজি হয়নি। তাহলে এখন এ চুক্তি হলো কীভাবে? তবে কি ভারত তাদের ৭০ কোটি কৃষকের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দিল! যদি দিল্লি এমনটাই করে থাকে, তবে প্রশ্ন ওঠে—এটি আসলে বাণিজ্য চুক্তি, নাকি সমঝোতা?

দি ইনডিপেনডেন্ট থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিএনপি সরকার গঠন করলে এনসিপির অবস্থান কী হবে, যা জানালেন নাহিদ ইসলাম

নওগাঁয় হাসপাতালের সামনে পড়ে ছিল রাজস্ব কর্মকর্তার রক্তাক্ত লাশ

যেভাবে হত্যা করা হয় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফকে

ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব: জিতলেও ফল ঝুলবে বিএনপির ২ প্রার্থীর

অনলাইন গেমের নেশা: নিষেধ করায় গভীর রাতে ৯ তলা থেকে ঝাঁপ দিল ৩ বোন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত