Ajker Patrika

ট্রাম্পের ‘ফাইনাল ডিল’ কখনোই ফাইনাল হয় না, ব্যর্থতার নজির শতভাগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ট্রাম্পের ‘ফাইনাল ডিল’ কখনোই ফাইনাল হয় না, ব্যর্থতার নজির শতভাগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: ইপিএ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয় যখন কোনো কিছুকে ‘ফাইনাল বা চূড়ান্ত বা সেরা প্রস্তাব’ বলে ঘোষণা করেন, তখন তা অনেকটা লাস ভেগাস ক্যাসিনোগুলোর সেই কথার মতোই শোনায়, যেখানে ডিলার জুয়ার ডেক নতুন করে ওলটপালট করার ঠিক আগমুহূর্তে অংশগ্রহণকারীদের বলে, ‘ডাবল ডাউন করার এটাই আপনার শেষ সুযোগ।’

এটি শুনতে বেশ সিদ্ধান্তমূলক, এমনকি অপরিবর্তনীয় মনে হলেও যারা বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্পের আলোচনার ধরন পর্যবেক্ষণ করেছেন, তারা একে সতর্কতার সঙ্গেই গ্রহণ করতে শিখেছেন। ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষে ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পেরে গতকাল রোববার ট্রাম্পের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই শব্দগুচ্ছ বা ‘শেষ প্রস্তাব’ ব্যবহার করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সংঘাত শুরু হয়নি এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে—অঞ্চলটি এখন সেই আশাতেই বুক বাঁধছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটি সামনে আসছে—ট্রাম্প বা তাঁর প্রশাসন যখন কোনো কিছুকে ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ হিসেবে তকমা দেয়, সেটি আসলে কতটা চূড়ান্ত?

সর্বশেষ এই ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তানে দীর্ঘ আলোচনার পর। ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগ করার সময় জানান, ওয়াশিংটন তেহরানকে একটি চুক্তির জন্য তাদের ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখান থেকে একটি অত্যন্ত সহজ প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি; সমঝোতার এমন এক পদ্ধতি যা আমাদের চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব। এখন দেখা যাক ইরানিরা এটি গ্রহণ করে কি না।’

শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া চলাকালীন ভ্যান্স ট্রাম্পকে প্রায় ডজনখানেকবার ফোন করেছিলেন। ট্রাম্প আলোচকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা ‘সৎ উদ্দেশ্যে সেখানে যায় এবং একটি চুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।’ একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয় যে, ট্রাম্প এই প্রস্তাব সমর্থন ও অনুমোদন করেছেন। তবে ট্রাম্পের নিজের কোনো সরাসরি উদ্ধৃতিতে ‘ফাইনাল অফার’ বা ‘বেস্ট অফার’ শব্দগুলো পাওয়া যায়নি। আলাদাভাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, একটি চুক্তি হওয়া না হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কোনো পার্থক্য তৈরি করে না’, কারণ ‘আমরা সেই দেশটিকে (ইরান) পুরোপুরি পরাজিত করেছি।’

দর–কষাকষির ক্ষেত্রে এ ধরনের ভাষার প্রয়োগ এবারই প্রথম নয়। উত্তর কোরিয়া, চীন এবং বারবার ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও তিনি ‘ফাইনাল অফার’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল প্যারিসে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের কাছে পেশ করা এক পৃষ্ঠার মার্কিন প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে নথির ভেতরেই সেটিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই নথিতে রাশিয়ার হাতে ক্রিমিয়া ও দনবাসের একাংশের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়াসহ ইউক্রেনকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ের কোনো উদ্ধৃতি বা প্রতিলিপিতে ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে এই শব্দগুচ্ছ বলতে শোনা যায়নি। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, প্রস্তাবটি গ্রহণ করা না হলে তারা আলোচনা থেকে সরে যেতে প্রস্তুত।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের রিপোর্টে ট্রাম্পের নিজের মুখ থেকে বলা একটি সরাসরি উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘আমি বলব এটি একটি চূড়ান্ত প্রস্তাব, তবে তারা যদি অন্য কোনো প্রস্তাব দেয় যা আমার পছন্দ হয়, তবে আমরা সেটি বিবেচনা করব।’ এখানে ইউক্রেনের জন্য ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ ছিল স্থায়ী শান্তির বিনিময়ে রাশিয়ার দখলদারিত্ব মেনে নেওয়া।

অনুরূপ ভাষা বাণিজ্য চুক্তির সময়সীমা সংক্রান্ত খবরেও দেখা গিয়েছিল, যেখানে মার্কিন প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর তাদের ‘সেরা প্রস্তাব’ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়া রোধে সিনেটে আলোচনার সময় মার্কিন কংগ্রেসের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ পক্ষের নেতা জন থুন রিপাবলিকান ও হোয়াইট হাউসের অবস্থানকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য ‘শেষ ও চূড়ান্ত’ প্রস্তাব হিসেবে বর্ণনা করেন।

ট্রাম্প জনসমক্ষে বলেছিলেন, অচলাবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন নিরাপত্তা বিভাগ বা টিএসএ কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য তিনি একটি জরুরি আদেশে স্বাক্ষর করবেন। তবে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ‘ফাইনাল অফার’ বা ‘বেস্ট অফার’ শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। আলোচনা যখন ‘শেষ ও চূড়ান্ত’ কাঠামোর ওপর কেন্দ্র করে চলছিল, তখন হোয়াইট হাউস জরুরি ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছিল।

এরপর, ২০১৭ সালে ওবামাকেয়ার বাতিল ও প্রতিস্থাপনের আলোচনার সময় হোয়াইট হাউস ‘হাউস ফ্রিডম ককাসের’ কাছে আমেরিকান হেলথ কেয়ার অ্যাক্টের সংশোধনী নিয়ে একটি ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ পেশ করেছিল। ট্রাম্প সেই দলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কিন্তু শব্দগুচ্ছটি এসেছিল হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে। এটিকে ‘হয় গ্রহণ করো, নয় বর্জন করো’ এমন একটি প্রস্তাব হিসেবে সাজানো হয়েছিল। তৎকালীন রিপোর্টগুলোতেও ট্রাম্প সরাসরি এই শব্দগুলো ব্যবহার করেননি।

এ ছাড়া, ২০২৫ সাল জুড়ে গাজা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলোতে ট্রাম্প কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাবকে—যার মধ্যে ৬০ দিনের একটি কাঠামো এবং হামাসের প্রতি পৃথক ১০০ শব্দের পাঁচ দফার আল্টিমেটাম অন্তর্ভুক্ত ছিল—তাঁর ‘শেষ সতর্কবার্তা’ বা কার্যকরী চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যেমন—‘এটিই আমার শেষ সতর্কবার্তা, আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না!’

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছিলেন, ইসরায়েল শর্তাবলিতে সম্মত হয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারীরা ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ পৌঁছে দিচ্ছে। গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা সেই প্রস্তাবের উপাদানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে হামাসের প্রত্যাশিত ‘সেরা প্রস্তাব’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ট্রাম্প নিজে সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফাইনাল অফার’ বা ‘বেস্ট অফার’ শব্দগুলো ব্যবহার করেননি।

ট্রাম্পের ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ ব্যবহারের ইতিহাস বলছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত সত্যিই চূড়ান্ত হয় না। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে নথিটিকে স্পষ্টভাবে তাঁর ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ বলা হয়েছিল, নভেম্বর মাসে তিনি নিজেই সাংবাদিকদের সামনে সেটি ফিরিয়ে নেন। তখন তিনি জানান—এটি ‘আমার চূড়ান্ত প্রস্তাব ছিল না।’

হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ২৮ দফার মার্কিন শান্তি প্রস্তাবটিই কি তার চূড়ান্ত প্রস্তাব ছিল কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এটি আমার চূড়ান্ত প্রস্তাব নয়।’ তিনি যোগ করেন, শান্তি ‘অনেক আগেই’ হওয়া উচিত ছিল এবং ‘যেভাবেই হোক, আমাদের এটি শেষ করতে হবে।’

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত