
ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে ২১ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে সমস্ত জাহাজের যাতায়াত বন্ধ করে দেবে। অবশ্য পরবর্তী সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্টের কড়া হুমকির কিছুটা সংশোধন করে বলা হয়েছে, শুধু ইরানের উদ্দেশে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোই এই অবরোধের আওতায় পড়বে। অন্যান্য সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। এই অবরোধ আজ সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জলযানের ওপর নৌ অবরোধের এই ঘোষণা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একক বৃহত্তম ঝুঁকি। এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যবস্থায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
নৌ অবরোধের বলতে কী বোঝায়, এর বাস্তব প্রয়োগ
২০২২ সালের ‘ইউএস নেভি কমান্ডারস হ্যান্ডবুক অন নেভাল অপারেশনস ল’ অনুযায়ী, নৌ অবরোধ হলো একটি যুদ্ধকালীন অভিযান যার মাধ্যমে শত্রু রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট বন্দর, বিমানবন্দর বা উপকূলীয় অঞ্চলে শত্রু এবং নিরপেক্ষ—উভয় পক্ষের সকল প্রকার জলযান ও বিমানের প্রবেশ বা প্রস্থান রোধ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অবরোধকে ‘তৎক্ষণাৎ কার্যকর’ করার ঘোষণা দিলেও পরবর্তীকালে ফক্স নিউজকে জানান, এটি পুরোপুরি কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি এটিকে একটি ‘অল অর নোন’ নীতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা থেকে এই অবরোধ শুরু হবে এবং এটি পক্ষপাতহীনভাবে ইরানের আরব সাগর ও ওমান উপসাগরীয় সব বন্দরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে অ-ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর স্বাধীন চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলে তারা আশ্বস্ত করেছে।
অবরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জোটের ভূমিকা
ট্রাম্প দাবি করেছেন, অন্যান্য দেশও এই অবরোধে শামিল হবে। তিনি জানিয়েছেন, ন্যাটো এই জলপথ ‘পরিষ্কার’ করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষ করে মাইন অপসারণের জন্য যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশ জাহাজ পাঠাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যদিও ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ওই অঞ্চলে ইতিমধ্যেই তাদের মাইন-হান্টিং সিস্টেম মোতায়েন রয়েছে। তবে ব্রিটেন সরাসরি এই অবরোধের সামরিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না বলেই জানা গেছে। বর্তমানে ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি বৃহত্তর জোট গঠনের মাধ্যমে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে নৌ অবরোধের সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি
হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের ধমনি। প্রতিদিন প্রায় ২০-২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
অবরোধের ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০৩ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি মার্কিন নৌবাহিনী কার্যকরভাবে একটি জাহাজও আটক করে, তবে বাজার আতঙ্কিত হয়ে দাম ১২০ থেকে ১৩০ ডলারে উঠে যেতে পারে। এটি সরাসরি পরিবহন খরচ বৃদ্ধি করবে।
এ ছাড়া বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে আসে। ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ তুলবে।
বিশ্ব শেয়ারবাজার ও ফিউচার মার্কেটে ধস
ট্রাম্পের এই ‘অল অর নাথিং’ নীতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জাপানের ‘নিক্কেই ২২৫’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোস্পি’ সূচকের ১ শতাংশের বেশি পতন কেবল শুরু মাত্র। যেহেতু এই দেশগুলো খনিজ তেলের জন্য সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ তাদের শিল্পখাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
সোনা ও মার্কিন ডলারের মতো ‘সেফ হ্যাভেন’ (নিরাপদ বিনিয়োগ) সম্পদের চাহিদা বাড়ছে। ফলে উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রার মান কমতে শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
ওয়াল স্ট্রিটের এসএন্ডপি ৫০০ ফিউচার মার্কেটে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পতন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মার্কিন ঘরোয়া বাজারেও এই সিদ্ধান্তের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সামরিক কৌশল ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি
এই অবরোধ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ থামানোর জন্য ৭ এপ্রিল যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছিল, এই পদক্ষেপ সেটিকে আক্ষরিক অর্থেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। পাকিস্তানে আয়োজিত পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং ট্রাম্পের ‘নরকে নিক্ষেপের’ হুমকি সরাসরি সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে তেহরান সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও হরমুজ প্রণালিতে অত্যাধুনিক মাইন স্থাপন বা ড্রোন হামলার মাধ্যমে জলপথটি অনিরাপদ করে তুলতে পারে। ইতিমধ্যে দৈনিক ১৩৮টি জাহাজের স্থলে মাত্র ১৭-১৯টি জাহাজ চলাচল করা প্রমাণ করে যে বিমা কোম্পানিগুলো এই পথকে ‘হাই রিস্ক জোন’ (উচ্চ ঝুঁকির এলাকা) ঘোষণা করেছে।
অপর দিকে ট্রাম্প ন্যাটো ও যুক্তরাজ্যের সহায়তার পাওয়ার কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ব্রিটেন কেবল মাইন পরিষ্কারে সহায়তা করতে চাইলেও সরাসরি অবরোধে অংশ নিতে নারাজ। ফ্রান্স ও ইইউ এই পদক্ষেপকে বাড়াবাড়ি উসকানিমূলক বলে মনে করছে।
আইনি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই অবরোধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ট্রাম্পের এই আদেশ নিরপেক্ষ দেশগুলোর জাহাজের ওপরও প্রভাব ফেলবে, যা মেরিটাইম আইনের পরিপন্থী।
হরমুজে ইরানের অবস্থান নিয়েও বিতর্ক চলছে। তবে এই প্রাকৃতিক প্রণালিতে ইরানের শুল্ক আদায়কে ট্রাম্প ‘অবৈধ’ বললেও, আইনত এই জলপথের বড় অংশ ওমান ও ইরানের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে পড়ে। ফলে মার্কিন হস্তক্ষেপকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখানোর সুযোগ তেহরানের রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও বিকল্প শক্তির সন্ধান
যদি এই অবরোধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদলে যেতে পারে। চীন ও ভারত সম্ভবত রাশিয়ার পাইপলাইন বা মধ্য-এশীয় জ্বালানি উৎসের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে। এর ফলে মার্কিন ডলারের আধিপত্য (পেট্রোডলার) সংকটে পড়তে পারে।
ট্রাম্প ইরানের তেলের অর্থ প্রবাহ বন্ধ করতে চাইলেও, এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের অভাব দেখা দিলে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই পেট্রলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নৌ অবরোধ মূলত একটি ‘হাই-স্টেকস গ্যাম্বল’ বা বড় ধরনের জুয়া। এটি ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করার একটি মরিয়া চেষ্টা। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দশকের পুরোনো মন্দার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সামরিক শক্তির দাপট আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইনগতভাবে ট্রাম্প চাইলেই হুট করে ন্যাটো থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন না। এর জন্য মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা কংগ্রেসের বিশেষ আইনের প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প জোট না ছেড়েই ন্যাটোকে অকেজো করে দিতে পারেন।
১৬ ঘণ্টা আগে
কোনো চূড়ান্ত নির্ধারক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে ইসলামাবাদ আলোচনা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এরই মধ্যে ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন। ফলে আপাতত এই আলোচনা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে যুদ্ধ বন্ধই করতে চায়। এর বাইরে তাদের সামনে আসলে উপযুক্ত কোনো বিকল্প নেই।
১ দিন আগে
কোনো ধরনের ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনা। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় ‘কিছু বিষয়ে সমঝোতায়’ পৌঁছাতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এখনো বড় ২–৪টি বিষয়ে ব্যবধান রয়ে গেছে।
১ দিন আগে
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার একটি রুদ্ধশ্বাস কূটনৈতিক ম্যারাথন এবং নিবিড় আলোচনার পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই সমাপ্ত হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ইসলামাবাদ বৈঠক। তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের ‘অযৌক্তিক ও উচ্চাভিলাষী’ দাবিকে দায়ী করা হলেও...
১ দিন আগে