Ajker Patrika

আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী দুই পক্ষই, নজর ট্রাম্পের দিকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৩
আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী দুই পক্ষই, নজর ট্রাম্পের দিকে
আলোচনার টেবিলে ইরানই আপাতত এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

কোনো চূড়ান্ত নির্ধারক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে ইসলামাবাদ আলোচনা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এরই মধ্যে ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন। ফলে আপাতত এই আলোচনা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে যুদ্ধ বন্ধই করতে চায়। এর বাইরে তাদের সামনে আসলে উপযুক্ত কোনো বিকল্প নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আমেরিকা সামরিকভাবে বিজয়ী হয়েছে এবং এ নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে এ কথা অনেকটা আস্ফালনের মতো শোনায়। বর্তমান যুদ্ধটি মার্কিনিদের মধ্যে চরম অজনপ্রিয়। এক-তৃতীয়াংশেরও কম মার্কিন নাগরিক এটি সমর্থন করছেন। শেয়ারবাজারে ধস এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার গ্রাফ দ্রুত নিচের দিকে নামছে।

কিন্তু ট্রাম্পের সামনে যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি, যার নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। ফলে ট্রাম্প চাইছেন এই পরিস্থিতির অবসান ঘটুক। তিনি জেডি ভ্যান্সকে পাঠিয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আমেরিকা এই আলোচনা নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার জন হেনড্রেন জানাচ্ছেন, ভ্যান্স ফিরে আসার অর্থ এই নয় যে আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দর-কষাকষি চলছে এবং সেই প্রক্রিয়া দূর থেকেও অব্যাহত রাখা সম্ভব। আলোচনা ছেড়ে চলে আসাটা কেবল শক্ত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে।

আমেরিকা কেবল এটাই দাবি করছে না যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না, বরং তারা চাইছে ইরান যেন সেই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টাও না করার অঙ্গীকার করে। এ ধরনের জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এর আগে ২০১৫ সালের চুক্তিতে পৌঁছাতে বারাক ওবামার প্রায় দুই বছর লেগেছিল, যা ট্রাম্প পরে বাতিল করে দেন।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রস হ্যারিসন সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকা প্রকাশ্যে ইরানকে যে চরমপত্র দিয়েছে, যদি পর্দার আড়ালের সুরও একই রকম হয়, তবে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তিনি বলেন, ‘এমনটি হলে ইরানিরা নিশ্চিত হবে যে যুদ্ধের আগের তুলনায় তারা এখন খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।’

হ্যারিসন আরও মনে করেন, এই যুদ্ধে ইরানই মূলত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিক সক্ষমতা বা প্রভাবের দিক থেকে নয়, বরং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হিসেবে। ইরানের সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধের মাশুল দিয়েছে, তাই তারা যুদ্ধের আগের অবস্থায় সহজে ফিরে যাবে না। তিনি বলেন, ‘যদি প্রকাশ্য আস্ফালনই শেষ কথা হয়, তবে সামনের পথ খুব সংকীর্ণ। তবে আশা করা যায় এসব কেবলই লোকদেখানো চাল এবং পর্দার আড়ালে প্রকৃত অগ্রগতি হয়েছে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিষ্কার হবে।’

অনেক দিক থেকেই এই আলোচনার অবসান বিস্ময়কর। কারণ, ইরানি ও মার্কিনিদের মুখোমুখি বসাতে প্রচুর কূটনৈতিক শ্রম ও চেষ্টার প্রয়োজন হয়েছিল। তবে এক প্রবীণ কূটনীতিক জানিয়েছেন, যোগাযোগের পথ এখনো একেবারে বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় এই সংঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে একই টেবিলে বসানোর একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান চায় এই আলোচনার সূত্রটি বজায় থাকুক।

দ্বিতীয়ত, আলোচনা শুরুর সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছিলেন, লেবাননসহ ইরানপন্থী হুতি এবং ইরাকি সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। কিন্তু পাকিস্তানি কূটনীতিকদের মতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে এই নাজুক আলোচনা নস্যাৎ করে দিয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে।

বর্তমানে মার্কিন বিমান মাঝ-আকাশে এবং দেশের পথে। প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত কী বলবেন তা এখনো অজানা। তবে তিনি বারবার বলছেন, ইরান একমত হলো কি হলো না, তাতে তাঁর কিছু যায়-আসে না। দুই পক্ষই আলোচনার খুঁটিনাটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিতর্কের মূল জায়গা বা কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকেও তেমন কিছু জানানো হয়নি। আগে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরমাণু কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। কিন্তু এবার আলোচনার পরিধি অনেক বড়। ফলে বিবাদও বেশি।

প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালির বিষয়টি বড় ইস্যু হিসেবে আলোচনায় এসেছে। কারণ, ইরান সেখানে নতুন নিয়ম চালু করেছে। তারা বলছে, শত্রুপক্ষ বা বিরোধীদের জন্য এই পথ বন্ধ থাকবে। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

আরেকটি বড় বিতর্ক হলো সব যুদ্ধক্ষেত্রে একযোগে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির দাবি তুলেছে ইরান। আমেরিকা বা ইসরায়েল এতে মোটেও খুশি নয়। ইরানের ১০ দফা এবং আমেরিকার ১৫ দফা দাবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিবাদ কেবল তিনটি ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও সেখানে রয়েছে।

উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে আলোচনায় আসায় সমঝোতা শুরু থেকেই কঠিন ছিল, যা শেষ পর্যন্ত অসম্ভব বলেই প্রমাণিত হয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করে আলোচনা ত্যাগ করেছে।

ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্যমতে, কূটনীতি কি তবে শেষ হয়ে গেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘কূটনীতি কখনোই শেষ হয় না।’ তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক কাঠামো হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও তা নিশ্চিত করার একটি বড় হাতিয়ার।’ সবশেষে তিনি বলেন, ‘ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে এবং আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’

এখন বড় প্রশ্ন হলো—এরপর কী? গত বুধবার যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ চরম হুমকির পর। ইরানে পুনরায় হামলা শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে হামলার আশঙ্কা প্রবলভাবে বেড়ে গেছে।

হরমুজ প্রণালি, যা ইরান কার্যকরভাবে বন্ধ করে রেখেছে, তা আলোচনার মাধ্যমে খুলে দেওয়ার পথ আর নেই বললে চলে। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমেরিকা ভিন্ন কোনো পথে হাঁটার কথা ভাবছে।

আমেরিকা দাবি করেছে, ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আলোচনা ভেস্তে গেছে। ইরান বরাবরই পরমাণু অস্ত্রের আকাঙ্ক্ষার কথা অস্বীকার করে এসেছে, কিন্তু এক বছরে দুটি যুদ্ধ তাদের পরমাণু অস্ত্রপন্থীদের আরও উৎসাহিত করবে। আমেরিকা ও ইরানের এই মুখোমুখি আলোচনা ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি যদি কোনো ফল প্রসবে ব্যর্থ হয়, তাহলে সম্ভবত কূটনীতির একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।

অবশ্য পাকিস্তান জানিয়েছে, যোগাযোগের পথ খোলা রাখা জরুরি এবং তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে। তবে এখন সবকিছু নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের ওপর। আলোচনার ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে নজর থাকবে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলেন তার দিকে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত