Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে আমিরাতের মোড়লিপনার বাসনায় চপেটাঘাত, সৌদির উত্থান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মধ্যপ্রাচ্যে আমিরাতের মোড়লিপনার বাসনায় চপেটাঘাত, সৌদির উত্থান
এমবিএসের নেতৃত্বে সৌদি আরব এমবিজেডের আরব আমিরাতকে দমিয়ে নিজেই আঞ্চলিক নেতা হয়ে উঠার চেষ্টা করছে। ছবি: দ্য ক্রেডলের সৌজন্যে

২০১৬ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন উপ-যুবরাজ (বর্তমানে যুবরাজ ও দেশটির ডি–ফ্যাক্টো শাসক) মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) একসঙ্গে মরু ভ্রমণে যান। এই ঘটনাকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতার মধ্যে রাজনৈতিক জোটের সূচনা হিসেবে দেখা হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁরা এক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন—জনবিদ্রোহ দমন, আঞ্চলিক জোটগুলো নতুন করে সাজানো এবং আরব বসন্ত–পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু আজ সেই জোট প্রায় ভেঙে পড়ার পথে। ইয়েমেন থেকে শুরু করে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে দুই যুবরাজ এখন এক ব্যাপক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

২০২২ সালের ডিসেম্বরেই টানাপোড়েনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় এমবিএস সৌদি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, আমিরাত সৌদি আরবকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে এবং এর জবাব হবে ভয়াবহ। ২০১৭ সালে কাতারের ওপর আরোপিত আকাশ, স্থল ও সমুদ্র অবরোধের কথা উল্লেখ করে এমবিএস বলেন, ‘কাতারের সঙ্গে আমি যা করেছিলাম, তার চেয়েও খারাপ হবে।’

সবশেষ চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ‘ইয়েমেনের বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইয়েমেন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ এই বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের শর্ত হিসেবে দেখা হয়। বলা যায়, এক ধরনের প্রকাশ্য আল্টিমেটাম।

এরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে রিয়াদের গণমাধ্যম যন্ত্র। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন প্রতিবেদনে আমিরাতকে বিশ্বাসঘাতকতা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এবং ইসরায়েলের ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ তোলা হয়। সৌদি আরবের প্রভাবশালী বিশ্লেষক ও ভাষ্যকাররা আবুধাবির আঞ্চলিক কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেন। রাজদরবার–ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। একই সঙ্গে ফাঁস হওয়া নথিতে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনে আমিরাতের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসে।

অর্থাৎ, আর কোনো রাখঢাক নেই—সংঘাত প্রকাশ্য।

দীর্ঘ সময় এমবিএস, এমবিজেডের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছেন। সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ রূপরেখার জন্য আমিরাত ছিল এক ধরনের মডেল। কিন্তু ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর এমবিএস আর ‘শিক্ষানবিশ’ থাকতে চাননি। ২০১৯ সালে ইয়েমেন থেকে আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। ইরান ও তুরস্ক বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈশ্বিক পুঁজি টানার প্রতিযোগিতা সেই ফাটল আরও গভীর করে। ২০২১ সালে ওপেক প্লাস নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ সেই বিভাজন স্পষ্ট করে দেয়। আর ২০২৪ সালে এসে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামরিক রূপ নেয়।

ইয়েমেনে আমিরাতঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর ওপর সৌদি হামলা বাড়তে থাকে। সোমালিয়া, সুদান ও লিবিয়ায় আবুধাবির প্রভাব খর্ব করতে কৌশল নেয় রিয়াদ। একে একে আমিরাতের রাজনৈতিক ও সামরিক অর্জন ভেঙে দিয়ে সৌদি আরব নিজেকে আবারও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

মিডিয়া যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন সৌদি প্রচারণা আমিরাতের ভেতরে বিভাজন তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। সৌদি ঘনিষ্ঠ ভাষ্যকাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বার্তা ছড়াতে শুরু করেন, যেখানে আবুধাবির নীতির বিপরীতে শারজাহর তুলনামূলক রক্ষণশীল অবস্থান তুলে ধরা হয়। এক প্রভাবশালী সৌদি ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে শারজাহর শাসক সুলতান আল-কাসিমির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শারজাহ আরব-ইসলামি মূলনীতির সঙ্গে অটল থেকেছে এবং পাশ্চাত্যকরণের বিরোধিতা করেছে। এই বক্তব্যকে এমবিজেডের পথের প্রতি পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখা হয়।

সৌদি দৈনিক আল-জাজিরাহের ওয়েবসাইটে এমবিএস ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক তুয়াইজরির লেখা ‘আমাদের হৃদয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত’—শীর্ষক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি আমিরাতের জনগণের প্রতি ভালোবাসার কথা বললেও আবুধাবির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালান। লেখাটিতে আবুধাবিকে ইসরায়েলি উচ্চাকাঙ্ক্ষার ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

তিনি লেখেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে সৌদি আরবের সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কোনো সমস্যা নেই। একমাত্র সমস্যা আবুধাবির সঙ্গে—বিশেষ করে তাদের সঙ্গে, যাদের ঘৃণা, ঈর্ষা ও হিংসা তাদের অন্ধ করে দিয়েছে এবং যারা স্বেচ্ছায় আরব জাতির বুকে ছুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, জায়নবাদের বাহন হয়ে এই অঞ্চল ও বৃহত্তর আরব বিশ্বে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করছে।’

নিবন্ধে সুদান থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে আবুধাবির কথিত ষড়যন্ত্রের তালিকা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিবেদন ও ফাঁস হওয়া নথির উল্লেখ করে দাবি করা হয়, গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে সহায়তার জন্য আমিরাতের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। জবাবে আমিরাতি ভাষ্যকার জাসিম আল-জুরাইদ ‘যখন ইখওয়ান (মুসলিম ব্রাদারহুড) দেশপ্রেমের নামে কান্নাকাটি করে’—শিরোনামে পাল্টা নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি তুয়াইজরির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইসলামের স্লোগান পুনরুজ্জীবিত করার অভিযোগ তোলেন এবং বলেন, আদর্শিক নস্টালজিয়াকে জাতীয় স্বার্থের মোড়কে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

জুরাইদ লেখেন, ‘এই লেখা সৌদি আরবের প্রতি ঈর্ষা থেকে নয়, বরং রাজনৈতিক ইসলামের সেই প্রকল্পের জন্য এক ধরনের বিলাপ, যাকে নতুন আমিরাতি-সৌদি আধুনিকায়নের ট্রেন পিষে ফেলেছে।’ তিনি সামরিক ঘাঁটির অভিযোগকে ‘ঘোষিত ও স্পষ্ট কৌশলগত জোটকে কলঙ্কিত করার করুণ চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, আমিরাত ‘সাহসের সঙ্গে, প্রকাশ্যেই কাজ করছে।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের আরবি ভার্সন ইন্ডিপেনডেন্ট আরাবিয়ার সম্পাদক-ইন-চিফ আদওয়ান আল-আহমারি লেখেন, ‘গত কয়েক বছরে সৌদি আরব আবুধাবির রাজনৈতিক ও মিডিয়া ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করেছে, এই বিশ্বাসে যে তারা একজন সৎ অংশীদারের সঙ্গে এগোচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু ২০১৮ সালের পর স্পষ্ট হয়ে যায়, আবুধাবি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। রিয়াদ অপেক্ষা করেছিল, ভেবেছিল প্রকাশ্য অঙ্গীকার গোপন নীতির সঙ্গে মিলবে। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সৌদি আরব আবরণ সরিয়ে নেয়—আর নিচে যা পাওয়া যায়, তা দুর্বল, উন্মোচিত ও দুর্বল।’

সৌদি আরবের একটি পত্রিকার সাবেক এডিটর-ইন-চিফ সুলায়মান আল-আকিলি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং সৌদি কৌশলগত পরিসরে সংকট সৃষ্টিকারীতে পরিণত হয়েছে।’ রাজনৈতিক গবেষক মুনিফ আল-হারবি আবুধাবির আচরণকে আখ্যা দেন ‘একটি ইসরায়েলি প্রকল্প, যার গায়ে শকুনের ছদ্মবেশ।’

সৌদির নিওম প্রকল্পের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য আলি আল-শেহাবি বলেন, ‘আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি।’ তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি আরব ভৌগোলিকভাবে আমিরাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যবর্তী একটি দেয়াল।

ফাঁস হওয়া তথ্যে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় চাপের মুখে এমবিজেডকে ক্ষমতা ছাড়তে বলা হয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ বিন রাশিদকে পুনর্বহালের প্রস্তাবও এসেছে। আপাতত সৌদি আরব এটিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে—তবে এটি এখনো কৌশল নয়, বরং হুমকি।

রাজনীতি বিশ্লেষক দ্য ক্রেডলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. ফুয়াদ ইব্রাহিম বলেন, আমিরাতের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগানোর ঝুঁকি সৌদি আরব বোঝে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক তাস, কারণ এতে সংকট আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে এবং পুরো উপসাগরীয় ব্যবস্থাকে, সৌদি আরবসহ, অস্থিতিশীলতার মুখে ফেলতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিন জায়েদকে উৎখাতের বিষয়টি বিশ্লেষণী অতিরঞ্জন। এমবিএস তাঁর শাসন উল্টে দিতে চান না। তিনি চান তাঁর আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে তাঁকে নেতৃত্বস্থানীয় অংশীদার থেকে দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়ের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে, যাতে উপসাগরে ক্ষমতার ভারসাম্য রিয়াদের পক্ষে পুনর্গঠন করা যায়।’

কাতার অবরোধের সময়ের মতোই, এবারও রিয়াদ একের পর এক ফাঁস করা তথ্য প্রকাশ করছে, যার উদ্দেশ্য আমিরাতের অবস্থানকে অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ করা। একটি প্রধান অভিযোগ হলো—আবুধাবি উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ায় ঘাঁটি দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি এবং নজরদারিতে সহায়তার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফাঁস হওয়া নথিতে দাবি করা হয়, আমিরাতি কর্তৃপক্ষ শিন বেতের (ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা) সদস্যদের নাগরিকত্ব দিয়েছে এবং যৌথ সামরিক স্থাপনায় নাশকতা চালিয়েছে।

সৌদি সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের বিমান সক্ষমতা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে আমিরাত। দাবি করা হয়, আবুধাবি আল-আনাদ ঘাঁটিতে রুশ সুখোই যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ করে দেয় এবং অধিকাংশ বিমান অচল করে ফেলে। তাদের মতে, এটি ছিল নিয়ন্ত্রণ ও নাশকতার একটি কৌশল। একই সময়ে গোপন আমিরাত-পরিচালিত কারাগারের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পাওয়ায় এসব অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

হস্তক্ষেপ এখানেই থেমে থাকেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে পরিচালিত এবং সোমালিয়ার বারবেরা ঘাঁটি-সংযুক্ত ইসরায়েলি সিস্টেমগুলো সোকোত্রা দ্বীপে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছিল সাবমার্সিবল সেন্সর, যা চলাচলরত জাহাজের অ্যাকুস্টিক সিগনেচার পর্যবেক্ষণ করে; এবং নজরদারি সরঞ্জাম যা জাবাল মুমি ও রাস কাতিনানের চূড়ায় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের ছদ্মবেশে স্থাপন করা হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীনের নৌ-চলাচলসহ আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নৌ তৎপরতা নজরদারি করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে।

আরেকটি ধারাবাহিক বর্ণনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইসলামবিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ, তারা মসজিদ বন্ধে অর্থায়ন করেছে, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী লবিগুলোকে সমর্থন দিয়েছে এবং ইসলামবিদ্বেষী কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে। একই সঙ্গে আমিরাতি মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে মুসলিমবিরোধী কনটেন্ট তৈরি এবং ইসরায়েলি বর্ণনা ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

সৌদি আরবের আঞ্চলিক পাল্টা অভিযান সমন্বিত ও ব্যাপক। ইয়েমেনে তারা সৌদি নেতৃত্বে মিত্র বাহিনীগুলোকে একীভূত করেছে এবং আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে কোণঠাসা করেছে। এই পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে রিয়াদের উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সৌদি আরব ইয়েমেন ফাইলকে সামরিক অগ্রাধিকারে উন্নীত করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ একীভূত করতে এবং সব মিত্র স্থানীয় গঠনকে সৌদি কমান্ডের অধীনে আনতে একটি সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি গঠন করা হয়।

এর পাশাপাশি রিয়াদ একটি ‘দক্ষিণ–দক্ষিণ’ রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করে। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়, রাষ্ট্রের ঐক্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা হবে না। বাস্তবে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আবু ধাবির সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্বের অবসান ঘটে। আফ্রিকায় সৌদি আরব মিসর ও সোমালিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলে আমিরাতি প্রতিরক্ষা চুক্তি ভাঙতে, সামরিক চালান আটকে দিতে এবং আঞ্চলিক জোট পুনর্গঠনে কাজ করছে।

এমনকি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) নিজেই এখন সংঘাতের ময়দান। রিয়াদ কূটনৈতিকভাবে আমিরাতকে একঘরে করতে নিজের প্রভাব কাজে লাগাচ্ছে। ইয়েমেনের দক্ষিণ নিয়ে রিয়াদে সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের চাপে বাতিল করা হয়, যাতে আমিরাতের ভূমিকা অক্ষুণ্ন থাকে। তবে সৌদি আরব স্থানীয় আনুগত্য কেনা এবং নিজের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বিকল্প পথ খুঁজে নেয়।

ইয়েমেনি রাজনৈতিক সূত্রগুলো দ্য ক্রেডলকে জানিয়েছে, উপসাগর থেকে আবু ধাবিকে আলাদা করতে রিয়াদ বাস্তব পদক্ষেপ শুরু করেছে। এর প্রতিফলন দেখা যায়—জিসিসির সহকারী মহাসচিবের পক্ষ থেকে ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ায় আমিরাতের নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আক্রমণে, এবং একই সঙ্গে বাহরাইন ও কুয়েতে মোহাম্মদ বিন জায়েদের সরকারি সফর বাতিল হওয়ায়। সূত্রগুলো বলছে, এই প্রকাশ্য আক্রমণটি আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে জোটের ভেতরে ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিফলন। এতে বোঝা যায়, রিয়াদ ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ফাইলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং আমিরাতের সামরিক উপস্থিতি কমাতে চাচ্ছে—যদিও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়াতে নিয়মিত সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছে।

ইয়েমেনের এডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক এবং সাউদার্ন রেভল্যুশনারি মুভমেন্টের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-নুমানি বলেন, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিগুলো আমিরাতের ওপর চাপ বাড়ানোর ধীর গতির প্রক্রিয়ার প্রতিফলন। তাঁর মতে, ইয়েমেনের দক্ষিণ প্রদেশ ও দ্বীপগুলোতে আমিরাতের প্রভাব শেষ করাই রিয়াদের লক্ষ্য, যেখানে আবু ধাবি এখনো সরাসরি সামরিক মোতায়েন ও অনুগত স্থানীয় বাহিনীর মাধ্যমে উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

নুমানি ব্যাখ্যা করেন, সৌদি আরব দক্ষিণে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ চাপিয়ে দিতে চাইছে, যাতে তারা পূর্বে ব্যর্থ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারে। এতে দক্ষিণের বিষয়গুলো এডেনের বদলে রিয়াদ থেকে পরিচালনা করা এবং নিজেকে শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল রয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি-সমর্থিত ‘দক্ষিণ–দক্ষিণ’ সংলাপে মূল উদ্দেশ্য ছিল আমিরাতের প্রভাব দূর করা। পরে রিয়াদ সম্মেলন স্থগিত করে এবং পাকিস্তানি, আমেরিকান বা রুশ মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান করে, যা দক্ষিণে আমিরাতের ভূমিকা বজায় রাখতে পারত। এতে দক্ষিণ ইয়েমেনে সৌদি–আমিরাত সংঘাতের নতুন পর্যায় শুরু হয়, যেখানে গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ড ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ড. ফুয়াদ ইব্রাহিমের মতে, মোহাম্মদ বিন সালমানের আবু ধাবি থেকে সরে আসা কোনো আবেগী প্রতিক্রিয়া নয়। এটি উপসাগরের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সৌদি আরবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি হিসাবি কৌশল। রিয়াদ চারটি সমান্তরাল পথে কাজ করছে। অর্থনৈতিকভাবে, দুবাই থেকে পুঁজি ও বিনিয়োগ প্রবাহ সরিয়ে সৌদি রাজধানীতে নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে, জিসিসিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে এবং ওমান ও কুয়েতকে পাশে টেনে আমিরাতের প্রভাব কমানো হচ্ছে। সামরিকভাবে, ইরান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুতি)-নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ খোলা হচ্ছে, আমিরাত-সংযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের পাশ কাটিয়ে। প্রতীকী স্তরে, সৌদি আরব নিজেকে ‘বড় রাষ্ট্র’ ও নেতা হিসেবে তুলে ধরছে, আর আবু ধাবির ‘ছোট কার্যকর রাষ্ট্র’ মডেলের বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে।

যেখানে সামরিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেশির ভাগই গোপন, সেখানে অর্থনৈতিক যুদ্ধ প্রকাশ্য। সৌদি আরব নীরবে কিন্তু মারাত্মকভাবে আমিরাত থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু করেছে। ২৬.৬ বিলিয়ন ডলার তুলে নেওয়া হয়েছে, যা আমিরাতের বৈদেশিক বিনিয়োগের বড় অংশ। সৌদি কোম্পানিগুলোকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে পর্যটন বয়কটের ডাক ছড়াচ্ছে। ২০২৪ সালে ১৯ লাখ সৌদি পর্যটক আমিরাতে গিয়েছিল, যা দেশটির পর্যটনের মূল ভিত্তি। এই সংখ্যা কমলে দুবাই ও আবু ধাবির ওপর সরাসরি আঘাত আসবে।

বাণিজ্য প্রবাহও ধীর হচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ঝুঁকি বিবেচনায় অবস্থান বদলাচ্ছে, কারণ তারা আশঙ্কা করছে রিয়াদ উপসাগরীয় বাণিজ্য থেকে আমিরাতকে চেপে বের করে দিতে পারে। সৌদি নীতির লক্ষ্য ভিশন–২০৩০ যুগে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পুঁজি রিয়াদে সরিয়ে নিয়ে দুবাইকে উপসাগরের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে স্থানচ্যুত করা এবং আমিরাতের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ছিনিয়ে নেওয়া।

আবু ধাবি রিয়াদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়তে পারে না। তাদের কৌশলগত গভীরতা সীমিত এবং অর্থনীতি ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের শক্তি বহিরাগত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা চেনা অস্ত্রের দিকেই ঝোঁকে—লবিং, মিডিয়া ও মামলা-মোকদ্দমা।

ফাঁস হওয়া তথ্যে জানা যায়, আমিরাতি কর্মকর্তারা পশ্চিমা আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছেন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিতে, যাতে কোম্পানিগুলো আমিরাত ছাড়তে নিরুৎসাহিত হয়। বিদেশে পিআর ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে ভিশন ২০৩০-এর ব্যর্থতা তুলে ধরতে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররা রিয়াদের চাপের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তবে যুদ্ধক্ষেত্র বদলে গেছে। ইসরায়েল, যা একসময় সৌদি সম্পর্ক গড়তে মনোযোগী ছিল, এখন আমিরাতের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণের নিরাপত্তায় আশ্রয় নিয়েছে। ওয়াশিংটন দুই পক্ষকে ভারসাম্যে রাখতে চায়, কিন্তু ক্রমশ সৌদি আরবকে অপরিহার্য শক্তি এবং আমিরাতকে শৃঙ্খলাবদ্ধ উপ-ঠিকাদার হিসেবে দেখছে।

নুমানি মনে করেন, ইয়েমেন ও সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে আমিরাত–ইসরায়েলি কার্যক্রম আরও বাড়বে। তাঁর মতে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হিসেবে আবু ধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে জোট পুনরুজ্জীবিত করেছে, যার প্রমাণ ইয়েমেনি দ্বীপগুলোতে উপস্থিতি ও কৌশলগত সামুদ্রিক রুটে সমন্বয়। তিনি বলেন, এর জবাবে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইহুদি কেন্দ্র ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, যাতে ইহুদি লবিতে আমিরাতের প্রভাব কমানো যায়। নুমানি উপসংহারে বলেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে। কারণ এটি কোনো সাময়িক কৌশলগত বিরোধ নয়, বরং দক্ষিণ ইয়েমেন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আর কৌশলগত অংশীদার নয়। তারা এখন সামরিক, অর্থনৈতিক, মিডিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব ফ্রন্টে সমান্তরাল যুদ্ধ চালানো প্রতিদ্বন্দ্বী। রিয়াদ পরিকল্পিত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় উপসাগরীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই ফাটল ধরাচ্ছে এবং জোট ও ক্ষমতার কাঠামো নতুন করে সাজাচ্ছে।

মোহাম্মদ বিন সালমান বাজি ধরেছেন—আবু ধাবির মতো কোনো জুনিয়র অংশীদার ছাড়াই রিয়াদ এককভাবে অঞ্চল শাসন করতে পারবে। সেই বাজি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে তিনি কত দূর যেতে প্রস্তুত এবং মোহাম্মদ বিন জায়েদ তার দরজায় জমে ওঠা ঝড় টিকে থাকতে পারবেন কি না।

দ্য ক্রেডল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলে বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া অনন্য গাঙ্গুলীর মরদেহ উদ্ধার

ইরানে হামলা হতে পারে আজই, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছেন ট্রাম্প

‘সব খারিজ হবে, তুই খালি টাকা পাঠাবি’, ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল

বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ বাড়াল ভারত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত