Ajker Patrika

ইরানে ট্রাম্পের ছক নিয়ে অন্ধকারে মধ্যপ্রাচ্য, জল্পনায় আগ্রাসনের মার্কিন কৌশল

আব্দুর রহমান 
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৫৫
ইরানে ট্রাম্পের ছক নিয়ে অন্ধকারে মধ্যপ্রাচ্য, জল্পনায় আগ্রাসনের মার্কিন কৌশল
বাস্তবিক অর্থে ইরানের জন্য এখন মর্যাদা নিয়ে অখণ্ডভাবে টিকে থাকার জন্য আগেভাগেই আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: দ্য ক্রেডলের সৌজন্যে

ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কূটনৈতিক ভাষ্য, ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর আচরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ ভাষ্যের আলোকে বোঝা যায়, ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ড্রপসাইট নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন প্রশাসনের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের নেতৃত্বকে মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে চলতি সপ্তাহান্তেই (গতকাল শনিবার) ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার অনুমোদন দিতে পারেন এবং সেই হামলা হতে পারে রোববারই (১ ফেব্রুয়ারি)।

এরই মধ্যে ট্রাম্পের ভাষায় ‘বিরাট আর্মাডা’ তথা মার্কিন নৌবহর ইরানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। কয়েক দিন আগেই মার্কিন সমরমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত।

ড্রপ সাইটকে সাবেক এক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নয়। এটা মূলত (ইরানে) সরকার পরিবর্তনের বিষয়।’ তিনি বর্তমানে আরব সরকারগুলোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও অন্যান্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে খামেনি সরকারের ‘মুন্ডচ্ছেদ’ করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি বর্তমানে ইরানের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখছে।

ওই সূত্র আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা—ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে সফল হামলার পর সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাত হবে। সাবেক ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘হামলার অপেক্ষা করছেন’ এবং তিনি ট্রাম্পকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি নতুন সরকার গঠনে ইসরায়েল সহায়তা করতে পারবে।

ড্রপ সাইট নিউজকে দুই জ্যেষ্ঠ আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা খবর পেয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘যেকোনো মুহূর্তে’ শুরু হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্কের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাতে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক—এই তিন দেশের মধ্যে একটি গোপন বৈঠকের রূপরেখা তৈরির চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখা। এরই মধ্যে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন হামলায় নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপে এই অবস্থান জানানো হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও গত সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক অভিযানে ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের আকাশসীমা বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউস ড্রপ সাইট নিউজের কাছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত শুক্রবার ওভাল অফিসে দেওয়া বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে। সেখানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের একটি বিশাল নৌবহর—সেটিই যাই বলুন—এই মুহূর্তে ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’ তবে ইরানকে যুদ্ধ এড়াতে কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

তবে এর উল্টো একটা দিকও আছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে গত শুক্রবার এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। বৈঠকে উপস্থিত চারটি সূত্রের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, প্রিন্স খালিদ সতর্ক করে বলেছেন—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া হুমকির বাস্তবায়ন না করেন, তবে দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাঁর এই বক্তব্য সৌদি আরবের প্রকাশ্য অবস্থানের বিপরীত। প্রিন্স খালিদ যুবরাজ মোহাম্মদের ছোট ভাই ও তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন।

সূত্রগুলো জানিয়েছে—খালিদ বিন সালমান বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে যদি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে সেটি ইরান সরকারকে আরও সাহসী করে তুলবে।’ বৈঠকে উপস্থিত দুজন জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসেও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের প্রকৃত কৌশল বা উদ্দেশ্য কী, সে বিষয়ে তিনি কোনো পরিষ্কার ধারণা নিয়ে বৈঠক থেকে বের হতে পারেননি।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই সৌদিরা ইরানে হামলা না করার জন্য প্রায় হাতে-পায়ে ধরছিল এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কার কথা বলছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে এই অবস্থানের পরিবর্তনের কারণ হতে পারে—রিয়াদ হয়তো বুঝতে পেরেছে ট্রাম্প হামলার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছেন। তাই তাঁরা এখন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কোনো বিবাদে জড়াতে চাচ্ছেন না।

বৈঠকে উপস্থিত তিনটি সূত্র জানায়, প্রিন্স খালিদ জোর দিয়ে বলেছেন—সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে না। সৌদি সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির যে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিও তিনি নাকচ করে দেন। বৈঠকে উপস্থিত একজন বলেন, ‘তিনি বারবারই এসব অভিযোগকে আজেবাজে কথা বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি যতবারই এটি বলছিলেন, ততবারই আস্থা রাখার মতো মনে হচ্ছিল না।’

এদিকে, তুরস্ক ইরানে মার্কিন হামলা ঠেকানোর কূটনৈতিক চেষ্টা চালালেও তারা ততোটা আত্মবিশ্বাসী না। শেষ পর্যন্ত হামলা ঠেকানো সম্ভব হবে না বলেই তাদের আশঙ্কা। আর এই আশঙ্কায় তেহরানে খামেনি সরকারের পতন ঘটার মতো চরম পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সীমান্তে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করছে তুরস্ক।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা পার্লামেন্টে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আইনপ্রণেতাদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা দুই সদস্যের বরাত দিয়ে এমইই জানায়, ইরান নিয়ে আঙ্কারা বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক সদস্য জানান, নতুন করে শরণার্থী ঢল ঠেকাতে আঙ্কারা প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে। এ প্রসঙ্গে তুর্কি কর্মকর্তারা ‘বাফার জোন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অবশ্য অন্য এক সদস্যের মতে, কর্মকর্তারা সরাসরি ‘বাফার জোন’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি, তবে তাঁরা প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। দ্বিতীয় ওই সূত্রের ভাষ্যমতে, ‘মূলত কর্মকর্তারা বলতে চেয়েছেন, সম্ভাব্য অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেন ইরানি ভূখণ্ডেই অবস্থান করেন, তা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার তার সবই করা হবে।’

চলতি মাসের শুরুর দিকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ইরানের সঙ্গে তাদের ৫৬০ কিলোমিটার সীমান্তে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ২০৩টি ইলেকট্রো-অপটিক্যাল টাওয়ার, ৪৩টি লিফট-সংবলিত টাওয়ার, ৩৮০ কিলোমিটার মডুলার কংক্রিট প্রাচীর এবং ৫৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পরিখা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ড্রোন ও বিমানসহ অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত এলাকা চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আবার মুখে মুখে আলোচনার কথাও শোনা যাচ্ছে। তেহরান নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই আলোচনার রূপরেখা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘কৃত্রিম গণমাধ্যম যুদ্ধের পরিবেশের বিপরীতে, আলোচনার জন্য একটি রূপরেখা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।’

তবে আলোচনার কথিত এই রূপরেখা সম্পর্কে লারিজানির পোস্টে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তিনি এমন এক সময় এই কথা জানালেন, যার কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে ইরান একটি চুক্তি করতে চায় বলে তিনি মনে করেন।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, আর আমরা দেখব কিছু করা যায় কি না; না হলে কী হয়, সেটাও দেখা যাবে...আমাদের একটি বড় নৌবহর সেখানে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা আলোচনা করছে।’ তবে এই ফক্স নিউজেরই আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ইরানের বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনার ব্যাপারে অন্ধকারে রেখেছেন।

ফলে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র যে ধোঁয়াটে পরিস্থিতি তৈরি করছে, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য একটাই হতে পারে—আকস্মিক হামলা। তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন বা হামলার ছক কষে, তখন তারা কেবল অস্ত্র বা সেনা মোতায়েনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সুনিপুণ এক মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। প্রথম ধাপেই তারা সেই দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জনমত গড়ে তোলার মিশনে নামে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এমনভাবে প্রচারণা চালানো হয় যাতে ওই শাসককে মানবজাতির জন্য এক বড় ‘দানব’ বা ‘হুমকি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

ইরানে সর্বশেষ বিক্ষোভ দমনের সময় হাতহতের সংখ্যা নিয়ে বরাবরই পশ্চিমা মিডিয়া উৎসাহী মনোভাব দেখিয়েছে। তারা কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই, ইরানে নিহতের সংখ্যা ৫–৬ হাজার বা তারও বেশি বলে উল্লেখ করেছে। ইরানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এমন একাধিক প্রতিবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পশ্চিমা প্রচেষ্টার ইতিহাস দীর্ঘ চার দশকের।

এই দানবীকরণ প্রক্রিয়ার সমান্তরালে শুরু হয় অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করার খেলা, যা ইরানের ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই চলমান। ব্যাংকিং চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ইরানের সর্বশেষ আন্দোলন শুরুই হয়েছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষের জায়গা থেকে।

বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ গ্রন্থে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের জন্য সাধারণ মানুষের সম্মতি আদায় করতে মিডিয়াকে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাঠপর্যায়ে হামলার চূড়ান্ত বাঁশি বাজার আগে শুরু হয় গোয়েন্দা ও সাইবার যুদ্ধ। একদিকে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে উসকে দেওয়া হয়, অন্যদিকে সাইবার হামলার মাধ্যমে ওই দেশের যোগাযোগ বা পারমাণবিক অবকাঠামো পঙ্গু করে দেওয়া হয়। মার্ক বাউডেন তাঁর ‘ওয়ার্ম: ফার্স্ট ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার’ বইয়ে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে ‘স্টাক্সনেট’ ম্যালওয়্যার ছড়ানোর ঘটনাটিকে ডিজিটাল যুদ্ধের এক ভয়াবহ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এরপর আসে তথাকথিত ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা টানার পালা। মার্কিন প্রশাসন এমন কিছু শর্ত চাপিয়ে দেয়, যা ভঙ্গ হওয়া মাত্রই তারা ‘আত্মরক্ষা’ বা ‘মানবাধিকার রক্ষার’ অজুহাতে সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন থিংক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিনরা একটা আরোপিত চূড়ান্ত রেখা টেনে দেয়। এই রেখা লঙ্ঘন হওয়া মাত্রই ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টি অবশ্যম্ভাবি হয়ে পড়ে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ কিংবা ২০১১ সালের লিবিয়া সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সরাসরি যুদ্ধের আগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সেই রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে পুরোপুরি দেউলিয়া করে দেওয়া মার্কিন রণকৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইরানের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয় মিলে যাচ্ছে। ফলে, কূটনীতির ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য কোনো অগ্রগতি না ঘটলে ইরানে মার্কিন হামলা অত্যাসন্ন বলেই ধারণা করা যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলে বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া অনন্য গাঙ্গুলীর মরদেহ উদ্ধার

ইরানে হামলা হতে পারে আজই, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছেন ট্রাম্প

বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ বাড়াল ভারত

‘সব খারিজ হবে, তুই খালি টাকা পাঠাবি’, ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত