
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদ্যাপনের মাত্র কয়েক দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দেশটির শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করার লক্ষ্যে হামলা চালায়। একসময় দুর্ভেদ্য বলে মনে হওয়া শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল অবস্থায় নামিয়ে আনে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হওয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, এই বিমান হামলাই হয়তো ইরানে গণ-অভ্যুত্থানের পথ খুলে দেবে। তিনি ইরানিদের নিজেদের সরকার ‘দখলে নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু কঠোর বাস্তবতা হলো, শাসনব্যবস্থা এখনো সুসজ্জিত ও সুসংগঠিত। বছরের পর বছর তারা আজকের মতো একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। দশকের পর দশক দমনপীড়নের পরও ইরানিরা বর্তমান রেজিমের বিরুদ্ধে কার্যকর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। ইরানে আগ্রাসনকারীদের বোমার আওয়াজ থেমে গেলে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হবে—১৯৭৯ সালের পর থেকে প্রায় যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত ও দুর্বল ইরানি বিপ্লবী রেজিম টিকে থাকবে।
তবু দীর্ঘ মেয়াদে ইরানে গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা পুরোপুরি নিভে যায়নি। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে বিমান অভিযান চালাচ্ছে, তা দিয়ে সে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যুদ্ধ শেষ হলেই ইরান প্রবেশ করবে এক উত্তেজনাপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অন্তর্বর্তী পর্বে। সে সময় ওয়াশিংটনকে ইরানের ভেতরের শক্তিশালী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগে জড়াতে হতে পারে। পরাজিত ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়া একটি ব্যবস্থার প্রতিনিধিরা যেন সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ-পরবর্তী সংলাপ ছিনিয়ে নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি।
তাই লড়াই শেষ হওয়ার পরের দিনের জন্য এখন থেকেই একটি রূপরেখা নির্ধারণ করা এবং গ্রহণযোগ্য সংলাপ-সঙ্গী খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো গুরুতর পরিকল্পনার প্রমাণ এখনো দেখা যায়নি। ওয়াশিংটন শাসনব্যবস্থার হঠাৎ পতনের ওপর কিংবা ইরানিদের সফল অভ্যুত্থানের ওপর ভরসা করতে পারে না। সামরিক শক্তি ও কূটনীতির সমন্বয়ে কীভাবে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গ্রহণে প্রভাবিত করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রকে সেই দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।
সাম্প্রতিক হামলার আগেই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আরব বিশ্বজুড়ে তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্ক দুই বছরের লড়াইয়ে ইসরায়েলের হাতে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কার্যত থমকে দেয়। ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানি মুদ্রা দ্রুত অবমূল্যায়নের মুখে পড়ে, পানি ও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেয়, আর জনগণ ১৯৭৯ সালে শাহর পতনের পর এই প্রথম এত বড় পরিসরে সরকারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হয়। জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে শাসনব্যবস্থার কঠোর অবস্থান তাদের ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টার প্রমাণ। মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাত হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
এখন তেহরানের বিপ্লবী নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার লক্ষ্য স্পষ্টতই শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা। বোমাবর্ষণে ইতিমধ্যে ইরানের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে—রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি পূর্ণ স্তর নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং শাসন কাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তেহরান নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা ইসরায়েল এবং আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর হোটেল, বিমানবন্দর ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
এত ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও স্বল্প মেয়াদে তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে তা স্থায়িত্ব ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে। বহু বছর ধরে তারা এই দিনের জন্য প্রস্তুত ছিল। অবশিষ্ট অভিজাতরা এখন আত্মরক্ষায় মনোযোগী। জটিল ধর্মীয় ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং অর্থবহ প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়। গত জুনের হামলার পর খামেনি সম্ভাব্য প্রয়ানের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নেতৃত্বের পদে থাকা কর্মকর্তাদের চারজন সম্ভাব্য উত্তরসূরির নাম নির্ধারণের নির্দেশ দেন। এমনও মনে হচ্ছে, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবনতি হলেও ইরান যেন প্রতিশোধ নিতে পারে, সে জন্য নিম্নস্তরের কমান্ডারদের কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল।
শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞ আমলারা ক্ষমতা সংহত করতে অভ্যস্ত। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর নতুন শাসনব্যবস্থা বিদ্রোহ, জাতিগত সহিংসতা ও ইরাকের আগ্রাসনের মুখে পড়লেও টিকে ছিল। আবার ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মারা গেলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময়ও তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়। অতীতে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই তারা বিশ্বাস করে, ট্রাম্পের মনোযোগের চেয়ে তাদের স্থায়িত্ব বেশি দীর্ঘ হবে। শাসনব্যবস্থা ক্ষতবিক্ষত হলেও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এখনো তারা শক্তিশালী অবস্থানে।
যে ইরানিরা সরকারকে উৎখাত করতে চাইবে, তাদের সামনে থাকবে ভয়ংকর বাধা। শাসনব্যবস্থা দশকের পর দশক ধরে বিরোধীদের দুর্বল করেছে বা হত্যা করেছে। বিরোধীরা বিভক্ত, নিরস্ত্র এবং সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে অক্ষম। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি হয়তো ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু বিক্ষোভকারী বা অভ্যুত্থানকারীদের হত্যা করার মতো অস্ত্র এখনো তাদের হাতে আছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার দিনটিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট অংশই সম্ভবত প্রাধান্য ধরে রাখবে।
এই দফার লড়াইয়ে তেহরানের শাসনব্যবস্থা হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়। এক বিধ্বংসী সামরিক আগ্রাসনের পর অবশিষ্ট নেতৃত্বকে নতুন নেতা বেছে নিতে হবে। ৩৬ বছর ধরে দেশটি কোনো সর্বোচ্চ নেতা পরিবর্তন করেনি। খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের, যাদের অধিকাংশই এখন মৃত, পর্দার আড়ালের আলোচনায় পরবর্তী নেতাকে বেছে নেওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধের আগেই খামেনির উত্তরাধিকার নির্ধারণ জটিল হয়ে উঠেছিল। শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় আকস্মিকভাবে মারা যান। বিপ্লবের প্রজন্মের অধিকাংশই ইতিমধ্যে প্রয়াত বা কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য অতিবৃদ্ধ।
এই অবস্থায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অনিবার্য। দীর্ঘদিনের আমলারা—যেমন জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ—সতর্ক সহযোগিতার মাধ্যমে বিপ্লব-পরবর্তী প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাঁদের সামনে থাকবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক এবং দেশ পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব। ধর্মতান্ত্রিক শাসনের আগের মতো শক্ত অবস্থান আর পুরোপুরি ফিরবে না। তাদের স্বাক্ষর প্রকল্প, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বিমান হামলা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে না, কিন্তু কূটনীতির মাধ্যমে ইরানের পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো প্রভাবিত করার একটি বিরল সুযোগ এখন রয়েছে। ট্রাম্প যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে টিকে থাকা নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করতে আগ্রহী হতে পারেন, কিন্তু এমন কোনো চুক্তি এড়িয়ে চলতে হবে, যা বর্তমান অভিজাতদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। ইতিমধ্যে খবর এসেছে, লারিজানির মতো তুলনামূলক বাস্তববাদী কিছু কর্মকর্তা ওমানের মধ্যস্থতায় পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা করেছেন। একটি বাজে চুক্তি বিপ্লবী এই রাষ্ট্রের জন্য জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের কিছু ভয়ংকর নেতা সরিয়ে যাওয়ার পর এখন ওয়াশিংটন ও তার অংশীদারদের উচিত, কার সঙ্গে আলোচনা করবে সে বিষয়ে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা।
শাসনব্যবস্থার উত্তরসূরিদের সঙ্গে যেকোনো কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এমন এক স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে, যা ইরানের ভেতরে অর্থবহ ও স্থায়ী পরিবর্তন এগিয়ে নিতে সক্ষম। যুদ্ধ ইরানের প্রচলিত হুমকি, পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক দুর্বল করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সুযোগ আছে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এত দিন যে বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল, সেই দিকটিতে মনোযোগ দেওয়ার—ইরানিদের প্রাপ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সহায়তা করার সুযোগ।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা বর্তমান সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিশাল...
৪ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা। অত্যন্ত গোপনীয় এই আলোচনায় খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে তিন ইরানি কর্মকর্তা....
৫ ঘণ্টা আগে
ইরানে চলমান বিমান হামলার ধরন শিগগিরই বদলে যেতে পারে—এমনটাই বলছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাজ্য সিদ্ধান্ত বদলে মার্কিন ভারী বোমারু বিমানকে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর (ইউএসএএফ) আঘাত হানার সক্ষমতা প্রায় চার গুণ বাড়তে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন সময়ের সঙ্গে এক দৌড়ে নেমেছে। আকাশযুদ্ধে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে এই লড়াই কত দ্রুত শেষ করা যাবে—সেই প্রশ্নই এখন মূল আলোচ্য বিষয়।
১৫ ঘণ্টা আগে