Ajker Patrika

রোদে ত্বক পোড়ার অভিজ্ঞতা: শক্তি সংরক্ষণের নতুন প্রযুক্তি

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ১০: ২৬
রোদে ত্বক পোড়ার অভিজ্ঞতা: শক্তি সংরক্ষণের নতুন প্রযুক্তি

বোস্টন থেকে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণে গিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা বারবারার রসায়নবিদ ও অধ্যাপক গ্রেস হান। তিনি সেখানে প্রচণ্ড রোদে ত্বকে অস্বস্তি অনুভব করেন। সেই অস্বস্তি থেকে তিনি ত্বকের ওপর রোদের প্রভাব নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। একসময় তিনি জানতে পারেন ‘ডিএনএ ফটোকেমিস্ট্রি’ সম্পর্কে। ভ্রমণের সেই অস্বস্তিকর অনুভূতির কথা বিবেচনায় রেখে অধ্যাপক গ্রেস হান শুরু করেন গবেষণা। একসময় ‘সানবার্ন’ বা রোদে ত্বক পোড়ার অভিজ্ঞতা থেকে গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব শক্তি সংরক্ষণের এক বৈপ্লবিক পথ খুঁজে পান গ্রেস এবং তাঁর দল। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ জন বিজ্ঞানী এই বিশেষ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। স্যাটেলাইট বা বিমানের তাপমাত্রা সংবেদনশীল অংশগুলোকে গরম রাখা থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কার্বনমুক্ত হিটিং ব্যবস্থার জন্য এটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

ডিএনএর আকৃতি বদল

গ্রেস হান লক্ষ করেন, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে মানুষের ত্বকের ডিএনএ অণুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুড়ে যাওয়ার সময় তাদের স্বাভাবিক সোজা আকৃতি বদলে সংকুচিত বা বেঁকে যায়। এই সংকুচিত অবস্থায় অণুগুলোর মধ্যে প্রচুর শক্তি আটকে বা জমা হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে এমন কিছু অণুর সন্ধান করছিলেন, যা সূর্যের আলোয় নিজের আকৃতি বদলে শক্তি জমা রাখতে পারবে। আবার পরে প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্দীপনা দিলে আগের আকৃতিতে ফিরে এসে সেই শক্তি বা তাপ মুক্ত করবে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মলিকুলার সোলার থারমাল এনার্জি স্টোরেজ। এটি অনেকটা ইঁদুর ধরার ফাঁদ পাতার মতো, যা সেট করার পরে প্রয়োজনমতো স্প্রিং মুক্ত করার কাজ করে।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে শক্তিশালী

গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে গ্রেস হান এবং তাঁর সহকর্মীরা এই প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের কথা জানিয়েছেন। বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা এমন অণু তৈরি করতে সক্ষম হন, যেগুলো প্রতি কেজিতে ১ দশমিক ৬৪ মেগাজুল শক্তি জমা রাখতে পারে। এটি আমাদের মোবাইল ফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে বেশি এনার্জি ডেনসিটি বা শক্তি ঘনত্বসমৃদ্ধ। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সময় এই অণুগুলো থেকে নির্গত তাপের তীব্রতায় টেস্টটিউবের ভেতরের পানি ফুটতে শুরু করেছিল।

এই প্রযুক্তির প্রধান সুবিধাসমূহ

  • কার্বনমুক্ত তাপ উৎপাদন: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ঘরবাড়ি অথবা শিল্পকারখানা গরম রাখার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়। কিন্তু এই প্রযুক্তি কোনো কিছু না পুড়িয়েই সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে বছরের পর বছর তাপ ধরে রাখতে এবং সরবরাহ করতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সংরক্ষণ: সাধারণ ব্যাটারিতে শক্তি বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। কিন্তু এই আণবিক সিস্টেমে জমা থাকা শক্তি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কয়েক মাস, এমনকি কয়েক দশক বা ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
  • ভৌগোলিক স্বাধীনতা: জীবাশ্ম জ্বালানি বিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রায়ই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সূর্যের আলো পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায়। তাই এই প্রযুক্তি যেকোনো দেশে ব্যবহার করা সম্ভব।

বর্তমান সীমাবদ্ধতা ও বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য

বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন কাজ করছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি-নির্ভরতা: এই অণুগুলোর আকৃতি বদলাতে ৩০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গের তীব্র অতিবেগুনি আলোর প্রয়োজন হয়, যা সূর্যের আলোয় খুব সামান্য থাকে। বিজ্ঞানীরা এখন এটিকে সাধারণ সূর্যালোকের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন।
  • অ্যাসিডের ব্যবহার: জমা হওয়া শক্তি অবমুক্ত করার জন্য বর্তমানে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড নামক অত্যন্ত ক্ষয়কারী রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রেস হান আশা করছেন, ভবিষ্যতে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ছাড়াই শুধু আলো কিংবা অন্য কোনো সহজ উপায়ে এই শক্তি মুক্ত করা যাবে।
  • তরল বনাম কঠিন অবস্থা: তরল অবস্থায় এই শক্তি সংরক্ষণ করলে তা পাম্প করার জটিলতা থাকে। তাই বর্তমানে উইন্ডো কোটিং কিংবা জানালার কাচের ওপর স্বচ্ছ প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এর সলিড-স্টেট বা কঠিন সংস্করণ তৈরির গবেষণা চলছে।

সূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত