Ajker Patrika

বিপদ শনাক্তে ইলেকট্রনিক নাক

টি এইচ মাহির 
বিপদ শনাক্তে ইলেকট্রনিক নাক

আমরা এরই মধ্যে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, টাচ স্ক্রিন প্রযুক্তি পেয়ে গেছি। এগুলো দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি এবং অনুভবের প্রযুক্তিগত প্রয়োগ। তবে বিজ্ঞানীরা এখন কাজ করছেন ঘ্রাণশক্তি নিয়ে। সম্প্রতি গবেষকেরা তৈরি করেছেন ইলেকট্রিক নাক বা ই-নাক। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এই ই-নাক ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয় শক্তিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য তৈরি হয়েছে।

এটি এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যা একনিশ্বাসে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে, বিষাক্ত গ্যাস বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই দমকলকর্মীদের সতর্ক করতে পারে, নষ্ট খাবার চিহ্নিত করতে পারে, এমনকি বিমানবন্দরে বিস্ফোরকও শুঁকে বের করতে পারে। শুনতে এটি কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা এআই এবং সেন্সর প্রযুক্তির অগ্রগতির কল্যাণে, ইলেকট্রনিক নাক দ্রুত বাস্তবে পরিণত হচ্ছে।

ইলেকট্রনিক নাক হলো এমন একটি যন্ত্র, যা মানুষের ঘ্রাণশক্তি অনুকরণ করার জন্য তৈরি হয়েছে। মানুষের নাকের ভেতরের জৈবিক অংশ ব্যবহার করার পরিবর্তে এটি রাসায়নিক সেন্সরের একটি সারির ওপর নির্ভর করে, যা উদ্বায়ী জৈব যৌগ (ভিওসি) শনাক্ত করে। এই ভিওসি হলো খাদ্য, উদ্ভিদ, রাসায়নিক পদার্থ বা এমনকি মানবদেহ থেকে বাতাসে নির্গত হওয়া ক্ষুদ্র অণু। যখন এই অণুগুলো সেন্সরে গিয়ে পৌঁছায়, তখন প্রতিটি সেন্সর ভিন্নভাবে সাড়া দিয়ে একটি অনন্য ‘গন্ধের ছাপ’ তৈরি করে। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো এই ফিঙ্গারপ্রিন্টকে হাজার হাজার সংরক্ষিত গন্ধের প্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করে শনাক্ত করে—যন্ত্রটি কিসের গন্ধ পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে সম্প্রতি উদ্ভাবিত একটি নতুন ইলেকট্রনিক নাক মানুষের নাকের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পচা খাবারের গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। তবে এটি আখরোট ও চিনাবাদামের মতো সাধারণ খাদ্য অ্যালার্জেনের উপস্থিতিও শুঁকে বের করতে পারে, যেটি মানুষের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়তে পারে। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত নতুন একটি গবেষণায় এই নাকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। নতুন কৃত্রিম নাকটি ১৬টি ক্ষুদ্র গ্যাস সেন্সরের একটি বিন্যাস দিয়ে গঠিত, যার প্রতিটি গ্যাসীয় যৌগের সামান্য ভিন্ন ভিন্ন সংমিশ্রণের প্রতি সংবেদনশীল। গবেষকদের মতে, এই নাক ফ্রিজে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং তা স্মার্টফোনের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর ফলে ব্যবহারকারী আগে থেকে জানতে পারবেন, তাঁর ফ্রিজে থাকা কোনো খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কি না।

মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে নাকটিতে সাতটি ভিন্ন খাবারের স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, কলা, আখরোট, হ্যাজেলনাট, কাজু ও চিনাবাদামের সঙ্গে সম্পর্কিত সেন্সর প্রতিক্রিয়া প্রোফাইল শনাক্ত করার জন্য একটি মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এটিকে কাঁচা মুরগির মাংস, দুধ ও ডিমের গন্ধ শনাক্ত করার জন্যও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাজা এবং নষ্ট খাবারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নাকটি শূন্য দশমিক শূন্য ৫ গ্রাম আলাদা আখরোটের গন্ধ পাওয়ার মতো যথেষ্ট সংবেদনশীল।

ইলেকট্রনিক নাকের ধারণাটি আশির দশক থেকে প্রচলিত। তবে এই প্রযুক্তিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া বেশ কঠিন। বাড়ির কার্বন মনোক্সাইড ডিটেক্টরে ব্যবহৃত সেন্সরগুলোর মতো একক গ্যাস সেন্সর তৈরি করা তুলনামূলকভাবে খুব সহজ। কিন্তু একটিমাত্র চিপে বিভিন্ন সেন্সিং ফিল্মের একটি অ্যারে একত্র করা অনেক বেশি কঠিন। বিভিন্ন ধরনের গন্ধ একত্রে শনাক্ত করাও বেশ জটিল। এই জটিল কাজটি করার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।

গবেষকেরা আশা করছেন, ই-নাক সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দেবে। কৃষি খাতে ফসলের রোগ শনাক্ত করা, চিকিৎসা খাতে রোগনির্ণয়, শিল্প খাতে গ্যাস শনাক্ত করাসহ বিভিন্ন কাজে একে ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রবল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত