Ajker Patrika

আর্জেন্টিনার ফুটবলে সাফল্যের নেপথ্য কারিগর এক ভিডিও অ্যানালিস্ট

ফিচার ডেস্ক
আর্জেন্টিনার ফুটবলে সাফল্যের নেপথ্য কারিগর 
এক ভিডিও অ্যানালিস্ট

ফুটবল শুধু ২২ জনের শারীরিক কসরত নয়, এটি আসলে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা বোঝাপড়ার জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা। বিশ্ব ফুটবলে যুগে যুগে কত কৌশল, তত্ত্ব ও ট্যাকটিক্যাল সিস্টেমের যে জন্ম হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী আর্জেন্টিনা দল প্রথাগত রীতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক দর্শন বেছে নিয়েছে, যার নেপথ্যে নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন দলটির ভিডিও অ্যানালিস্ট মাতিয়াস মান্না। কোচ লিওনেল স্কালোনির এই সৈনিক আড়ালে থেকে এমন এক দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে ফুটবলাররা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় রেখে দলগত কাঠামোর সঙ্গে দারুণভাবে মিশে যেতে পারেন।

পেশাদার ফুটবলের আঙিনায় মাতিয়াস মান্না কখনো পা রাখেননি। তবে ফুটবলকে একটি জীবন্ত ও স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখার অসাধারণ দূরদৃষ্টি ছিল তাঁর। ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তিনি ‘প্যারাডিগমা গার্দিওলা’ নামের একটি ব্লগ লেখা শুরু করেন, যেখানে তিনি শারীরিক শক্তির ফুটবলের চেয়ে বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার ফুটবলকে এগিয়ে রেখেছিলেন। ২০০৬ সালে রাজধানী বুয়েনস এইরেসে পেপ গার্দিওলার সঙ্গে তাঁর এক কফি আড্ডায় দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ফুটবল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালে গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার সময় মান্নাকে তাঁর সহকারী হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও দেশের হয়ে কাজ করার স্বপ্ন থেকে মান্না তা ফিরিয়ে দেন।২০১৮ সালে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে আর্জেন্টিনা দলে যোগ দেওয়ার পর সাম্পাওলি বিদায় নিলেও লিওনেল স্কালোনি মান্নাকে রেখে দেন।

তবে মাতিয়াস মান্না বিশ্বাস করেন, একটি দল জোড়াতালির মধ্য দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মে কোনোভাবেই চলতে পারে না। খেলোয়াড়দের নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে দলের একটি আইডেনটিটি বা স্বকীয় পরিচয় তৈরি হতে দেওয়াটাই কোচের আসল শিল্প। যদিও এই দর্শনকে তাত্ত্বিক ভাষায় ‘অটোপোয়েসিস’ বলা হয়। গ্রিক শব্দ ‘অ্যাটো’ (যার অর্থ স্বয়ং বা নিজ) এবং ‘পোয়েসিস’ (যার অর্থ সৃষ্টি বা উৎপাদন) মিলে অটোপোয়েসিস শব্দটি গঠন করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে চিলির বিজ্ঞানী উমবার্তো মাতুরানা ও ফ্রান্সিসকো ভ্যারেলা কোষের স্ব-সৃষ্টি এবং টিকে থাকার ক্ষমতা বোঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

স্কালোনি ও মান্না এই তত্ত্ব আর্জেন্টিনা দলে প্রয়োগ করেন, যেখানে প্রতিপক্ষকে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করে খেলোয়াড়দের রোবট বানানোর চেয়ে নিজেদের শক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের কোপার পর লিওনেল স্কালোনি বুঝতে পেরেছিলেন, লিওনেল মেসিকে এমন এক দল দিতে হবে, যারা একই সঙ্গে আক্রমণ এবং রক্ষণ সামলাবে; যাতে মেসি নিজের সহজাত খেলাটা খেলতে পারেন এবং এই দল তাঁর নিজস্ব গতিতে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী মানিয়ে নিতে পারেন।

খেলোয়াড়দের ট্যাকটিকস বোঝানোর জন্য মান্না ‘স্যান্ডবল’ নামক ভিডিও গেমের মতো একটি সিমুলেটরও তৈরি করেছেন, যা মেসিদের ক্লান্তি দূর করে খেলার ছলে রণকৌশল শিখতে সহায়ক।

আর্জেন্টিনার এই ফুটবলীয় দর্শনের সঙ্গে যুব দলের খেলোয়াড়েরাও মানিয়ে নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে পরম মমতায় গড়ে তুলছেন আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ ও মেসির শৈশবের আইডল পাবলো আইমার। আইমার মনে করেন, কিশোর বয়সের ফুটবল হওয়া উচিত একদম বুনো ও মুক্ত, যেখানে পাস

কিংবা টাচের কোনো সীমা থাকবে না। আজকের দিনে শিশুরা কেবল ক্লাবের বাঁধাধরা নিয়মে খেলে। ফলে ৩০ বছর আগের সেই স্ট্রিট ফুটবলের সহজাত সৃজনশীলতা ও আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। আইমার তাঁর একাডেমির ছেলেদের ভুল করার, গোল খাওয়ার এবং নিজের ভুল থেকে নিজে শেখার স্বাধীনতা দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ভুল না করলে ফুটবলাররা কখনো নিজেদের পরিমাপ করতে শিখবেন না। কৌশল বা ট্যাকটিকস শেখার আগে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং খেলার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থাকাটা জরুরি।

তবে এই অটোপোয়েসিস কিংবা স্ব-সংগঠিত দলের তত্ত্ব বাস্তবায়নে অবশ্য প্রচুর সময় এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান ফুটবলারদের প্রয়োজন হয়, যা অনেক সময় তাৎক্ষণিক ফলাফলের অভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই তত্ত্ব আর্জেন্টিনাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত