Ajker Patrika

স্মার্টফোন আসক্তিকে বিদায়, বাটন ফোনের যুগে ফিরতে চায় জেন-জি

পল্লব শাহরিয়ার
স্মার্টফোন আসক্তিকে বিদায়, বাটন ফোনের যুগে ফিরতে চায় জেন-জি
ছবি: সংগৃহীত

সকালবেলা অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে চোখ মেলা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে শেষ স্ক্রল! এ যুগের মানুষের ২৪ ঘণ্টার রুটিন এখন বন্দী হয়ে গেছে পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চির একটি কাচের স্ক্রিনে। ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ইনস্টাগ্রামের রিলস আর ইউটিউব শর্টসের অন্তহীন গোলকধাঁধায় প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মনোযোগ, ঘুম আর মানসিক শান্তি। ঠিক এই দম বন্ধ করা প্রযুক্তি নির্ভরতা থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে এখন শুরু হয়েছে এক নীরব প্রত্যাবর্তনের গল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর হাইটেক গ্যাজেটের দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তরুণ প্রজন্ম এখন ঝুঁকছে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর দিকে। আর এই অবাধ্যতার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সেই পুরোনো, সাধারণ বোতামওয়ালা মোবাইল ফোন, যা এখন বিশ্ববাজারে পরিচিতি পেয়েছে ডাম্বফোন নামে।

উল্টো স্রোতে জেন-জি

যে প্রজন্মের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইন্টারনেটের গতি আর স্মার্টফোনের মহাসড়কে, তারাই এখন বেশি হাঁপিয়ে উঠেছে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্টার পয়েন্ট রিসার্চের সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত দুই বছরে আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে নকিয়া বা মটোরোলার মতো ক্ল্যাসিক ফিচার ফোনের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।

কেন এই উল্টো যাত্রা? মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন গড়পড়তা তরুণ দিনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটাচ্ছেন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। এই অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’ মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত করছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে। বাড়ছে বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং তীব্র একাকিত্ব। এই মানসিক ক্লান্তি বা ডিজিটাল বার্ন আউট থেকে বাঁচতে তরুণেরা এখন স্মার্টফোনকে ড্রয়ারে বন্দী করছেন। তাঁরা এমন মোবাইল ফোন বেছে নিচ্ছেন, যা দিয়ে শুধু জরুরি কথা বলা যাবে আর টেক্সট মেসেজ পাঠানো যাবে।

ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বনাম চেনা রিয়েলিটি

নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একদল শিক্ষার্থী সম্প্রতি গড়ে তুলেছেন ‘দ্য লোডাইট ক্লাব’। এই ক্লাবের সদস্যরা প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে কোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করবেন না। তাঁরা সবাই ফ্লিপ ফোন বা বোতামওয়ালা ডাম্বফোনে ফিরে গেছেন। তরুণদের কাছে এটি এখন শুধু মানসিক শান্তির উপায় নয়, বরং একটি ‘কুল ফ্যাশন স্টেটমেন্ট’ বা ভিন্নধর্মী লাইফস্টাইল।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আবদুল্লাহ আল ইমরান (২২) তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘মাস তিনেক আগে লক্ষ করলাম, স্ক্রল করতে করতে কখন রাত ৩টা বেজে যাচ্ছে, আমি নিজেও জানি না। সকালে মাথাধরা আর

ক্লান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙত। এরপর একটা সাধারণ বোতামওয়ালা ফোন কিনি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি কমায় কাজে মন দিতে পারছি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের চেয়ে সরাসরি গল্প করাটা বেশি উপভোগ করছি।’

ফিচার ফোনের সুফল: যা দেখা যাচ্ছে গবেষণায়

চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, স্মার্টফোন সরিয়ে ফিচার ফোন বা ডাম্বফোন ব্যবহারের

ফলে মানুষের জীবনে তিনটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে—

» মনোযোগের পুনরুদ্ধার: স্মার্টফোনের প্রতিটি নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দের হরমোন ডোপামিন নিঃসরণ করে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, স্মার্টফোনের কারণে একবার মনোযোগ নষ্ট হলে পুনরায় সেই কাজে মগ্ন হতে মানুষের গড়ে প্রায় ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিং মানুষের মস্তিষ্ককে ‘শর্ট অ্যাটেনশন স্প্যান’ বা স্বল্পস্থায়ী মনোযোগে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে দীর্ঘ বই পড়া কিংবা জটিল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাজে একাগ্রতা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ডাম্বফোন বা বোতামওয়ালা ফোন ব্যবহারের বড় ম্যাজিক এখানেই।

এতে কোনো পুশ-নোটিফিকেশন বা চটকদার অ্যালগরিদম না থাকায় এটি মস্তিষ্ককে একধরনের স্থিরতা দেয়। যখন কোনো তরুণ স্মার্টফোন ছেড়ে ফিচার ফোনে চলে যান, তখন তাঁর অবচেতন মন প্রতি মিনিটে স্ক্রিন চেক করার ছটফটানি থেকে মুক্তি পায়। ফলে খুব সহজে ডিপ ওয়ার্ক বা গভীর মনোযোগের স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়, যা মানুষের হারিয়ে যাওয়া সৃজনশীলতা ও কাজের দক্ষতা ফিরিয়ে আনে।

» প্রকৃত সামাজিকতা: স্মার্টফোনের দুনিয়ায় আমাদের হাজারখানেক ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ থাকলেও, বাস্তবে একাকিত্ব যেন আরও জেঁকে বসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম লাইক, কমেন্ট আর রি-অ্যাকশনের ভিড়ে মানুষ দিন দিন হারিয়ে ফেলছে সরাসরি যোগাযোগের স্বাভাবিক দক্ষতা। একই টেবিলে বসে আড্ডা দেওয়ার সময়ও সবার চোখ আটকে থাকে নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। ডাম্বফোন এই যান্ত্রিক দেয়ালটি ভেঙে দেয়। নোটিফিকেশনের তাড়া না থাকায় মানুষ আবার আড্ডায় একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এটি মানুষের ভেতরের ‘এমপ্যাথি’ বা সহানুভূতিশীল আচরণ ফিরিয়ে আনে।

» উদ্বেগমুক্ত ঘুম: চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, রাতের ঘুম নষ্ট করার পেছনে বড় ভিলেন হলো স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো। এই কৃত্রিম আলো আমাদের মস্তিষ্কে ঘুম আনার হরমোন মেলাটোনিন উৎপাদনে তীব্র বাধা সৃষ্টি করে। ফলে বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার পর যখন মোবাইল ফোনটি আমরা রেখে দিই, তখন চাইলেও চট করে গভীর ঘুম আসে না। এই অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে ইনসমনিয়া ও মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ডাম্বফোন ব্যবহারে এই চক্র ভেঙে যায়। শোয়ার ঘর থেকে স্মার্টফোন বিদায় নিলে রাতের বেলায় অবচেতন মনে বারবার নোটিফিকেশন চেক করার মানসিক উদ্বেগ থাকে না। সাধারণ ফিচার ফোনে স্ক্রিনের আলো অত্যন্ত সীমিত এবং এতে কোনো আসক্তি জাগানো অ্যাপ নেই। ফলে বিছানায় যাওয়ার পর মস্তিষ্ক দ্রুত শান্ত ও শিথিল হয়ে পড়ে মানুষকে প্রাকৃতিক উপায়ে গভীর ও উদ্বেগমুক্ত ঘুমে নিমজ্জিত হতে সাহায্য করে।

ভারসাম্য রক্ষার উপায়

বর্তমান যুগে ব্যাংকিং, রাইড শেয়ারিং বা অফিসের যোগাযোগের জন্য স্মার্টফোন পুরোপুরি বর্জন করা হয়তো অসম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ বর্জনের চেয়ে একটি সুষম ভারসাম্যের পরামর্শ দিচ্ছেন, যাকে বলা হচ্ছে হাইব্রিড ডিটক্স।

সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলো স্মার্টফোনে কাটলেও, ছুটির দিনগুলোতে ডাম্বফোন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে দিনগুলো কাটবে সম্পূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়ামুক্ত নিজের মতো করে। স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো অ্যাপগুলোর দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটে বেঁধে নিলে ফলাফল আরও ভালো হবে।

প্রযুক্তি এসেছিল মানুষের জীবন সহজ করতে, বন্দী করতে নয়। বিশ্বজুড়ে চলমান এই ‘ডাম্বফোন ট্রেন্ড’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে স্ক্রিনের বাইরের পৃথিবীতে—কোনো মেঠো পথের ঘ্রাণে, প্রিয় মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি দীর্ঘ আড্ডায় কিংবা কোনো এক অলস দুপুরে বইয়ের পাতায়। নিজেকে এবং নিজের চিন্তাশক্তিকে ফিরে পেতে মাঝেমধ্যে একটু ‘অফলাইন’ হওয়া তাই আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকার একমাত্র ওষুধ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত