Ajker Patrika

নিরাপদ থাকতে যেভাবে হবেন সাইবার সচেতন

মোস্তাফিজ মিঠু, ঢাকা
আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫৩
নিরাপদ থাকতে যেভাবে হবেন সাইবার সচেতন

প্রযুক্তির দিক থেকে পৃথিবী একদিকে উন্নতি করছে, একই সঙ্গে বাড়ছে এ-সংক্রান্ত নিরাপত্তাঝুঁকি। বারবার একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—এই বিশাল প্রযুক্তির দুনিয়ায় আমরা কতটা নিরাপদ। মাস্টারকার্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারী গত বছর কমপক্ষে একবার কোনো না কোনো স্ক্যামের শিকার হয়েছে। অন্য জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান ব্যবহারকারীরা প্রায় প্রতিদিনই স্ক্যামের মুখোমুখি হচ্ছে। স্ক্যামের শিকার মানুষের গড় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ডলারের বেশি।

বিশ্বে অর্থনীতি ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার হুমকি। সেই সঙ্গে এর চরিত্র হয়ে উঠছে বহুমাত্রিক এবং জটিল। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং আর্থিক ক্ষতির মতো ঝুঁকির পাশাপাশি এখন বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানোও সাইবার সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবহারকারীদের অবশ্যই কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস মেনে চলতে হবে। এই অভ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে— প্রাইভেসি-ফার্স্ট ব্রাউজার ব্যবহার করা অনলাইনে নিরাপত্তা মানে শুধু বড় কোনো পাসওয়ার্ড নয়, আপনি কোন ব্রাউজার ব্যবহার করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা মতে, ব্রেভ ও অপেরা ব্রাউজার ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষায় অন্য ব্রাউজারের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

এগুলো আপনার অবস্থান, ব্রাউজিং হিস্ট্রি বা অনলাইন কার্যক্রম সংরক্ষণ করে না এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে না। এ ধরনের ব্রাউজারগুলোতে

বিল্ট-ইন অ্যাড ও ট্র্যাকার ব্লকার থাকে। এর ফলে বিরক্তিকর পপ-আপ দূর করে, আবার এবং ফিশিং বা স্ক্যামের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এ ছাড়া ব্রেভ-এর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ফিচার ব্যবহারকারীর প্রোফাইল ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

সব কুকি না নেওয়া ইন্টারনেটে কুকি মানে ছোট টেক্সট ফাইল, যা ওয়েবসাইট আপনার ব্রাউজারে সংরক্ষণ করে। এগুলো লগইন সহজ, কেনাকাটার তথ্য মনে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে তৃতীয় পক্ষের কুকি ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং কার্যক্রম ট্র্যাক করে এবং বিজ্ঞাপন দেখায়। কিছু ক্ষেত্রে এসব কুকি মারাত্মক ধরনের হতে পারে। অবিশ্বাস্য এবং অনিশ্চিত ওয়েবসাইটের কুকি ব্যবহারকারীর ই-মেইল, ব্যাংক কিংবা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য চুরি করতে পারে। তাই নিরাপত্তার জন্য এই ধরনের কুকি এড়িয়ে চলা উচিত। অনেক ব্রাউজারে ব্যবহারকারীদের তৃতীয় পক্ষের কুকি ব্লক অথবা সমস্ত কুকি মুছে ফেলার সুবিধা রয়েছে। পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ের ক্ষেত্রে ভিপিএন ব্যবহার করা বিমানবন্দর, ক্যাফে কিংবা লাইব্রেরিতে পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা যেমন সুবিধাজনক, তেমনি বিপজ্জনকও বটে। এতে হ্যাকাররা সহজে নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়তে পারে এবং আপনার তথ্য চুরি করে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ঝুঁকি হলো ‘ম্যান-ইন-দ্য-মিডল’ আক্রমণ, যেখানে হ্যাকার আপনার এবং রাউটারের মধ্যে অবস্থান করে ডেটা ধরে ফেলে। ভিপিএন ব্যবহার করলে আপনার নেটওয়ার্ক ট্রাফিক এনক্রিপ্ট হয়ে যায়। এতে হ্যাকাররা তথ্য ধরলেও তা পড়তে পারে না। তবে সব ভিপিএন সমান নিরাপদ নয়। অনলাইনে প্রকৃত প্রাইভেসি নিশ্চিত করতে ভালো মানের ভিপিএন বেছে নেওয়া উচিত।

সচেতন থাকা এবং নিয়মিত চেক করা নিরাপত্তা মানে শুধু প্রযুক্তি নয়। নিয়মিত অ্যাকাউন্ট চেক করা, টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং সন্দেহজনক লিঙ্ক এড়িয়ে চলা অপরিহার্য। সম্প্রতি দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা কখনো কখনো শুধু আকর্ষণীয় অফারের লোভে পড়ে অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে যাচ্ছেন। সচেতন ব্যবহারকারীরা এ ধরনের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে পারেন।

পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যক্তিগত সুরক্ষা শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সাইবার সচেতন করা, ভিপিএন এবং নিরাপদ ব্রাউজার ব্যবহার শেখানো জরুরি। এ ছাড়া কুকি এবং স্ক্যাম সম্পর্কে সচেতন করা উচিত।

সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি চলতি বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূ-রাজনীতি এবং ডিজিটাল প্রতারণা মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ আরও বড় হচ্ছে। তাই এমন পরিস্থিতিতে মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল, আমাজন এবং অন্য বড় টেক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করছে।

» এআই ঝুঁকি মোকাবিলা: জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁস বা সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তাই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কড়া নিরাপত্তা নীতি, রেগুলার অডিট এবং ডেটা এনক্রিপশন-ব্যবস্থা শক্তিশালী করে নিচ্ছে।

» ভূ-রাজনীতি ও হ্যাকিং-ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সম্ভাব্য রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে তাদের সার্ভার, ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার রক্ষায় জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে মাইক্রোসফট ও গুগল নিয়মিত থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ার করছে এবং তাদের গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠান নিরাপদ রাখার জন্য প্রাকৃতিক সতর্ক ব্যবস্থা চালু করছে।

» ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধ: ক্রেডিট কার্ড স্ক্যাম, ফিশিং ই-মেইল এবং সাইবার ফ্রডের বৃদ্ধি মোকাবিলা করার জন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত স্ক্যানিং ও ইউজার অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে ব্যবহারকারীরা সন্দেহজনক লিঙ্ক কিংবা ট্রানজেকশন সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক করা হয়।

» প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তারা ফিশিং, ম্যালওয়্যার বা অননুমোদিত অ্যাকসেস চিনতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বাড়িয়ে তোলার জন্য নিয়মিত ওয়ার্কশপ ও সিমুলেশন চালাচ্ছে।

প্রাইভেসি-ফার্স্ট ব্রাউজার ব্যবহার, কুকি নিয়ন্ত্রণ, পাবলিক ওয়াই-ফাইতে ভিপিএন ব্যবহার, সচেতনতা এবং পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা—এসব মিলিয়ে একটি সাইবার-নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ বছর থেকে বিষয়গুলোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠুন।

সূত্র: সাইবার সিকিউরিটি ডাইভ, টেক রাডার এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত