Ajker Patrika

সূর্য মরে গেলেও পৃথিবীতে টিকে থাকার কৌশল বাতলে দিলেন বিজ্ঞানী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ০৭
সূর্য মরে গেলেও পৃথিবীতে টিকে থাকার কৌশল বাতলে দিলেন বিজ্ঞানী
একশ ট্রিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের সবকিছু অন্ধকারে ডুবে যাবে। ছবি: শিল্পীর কল্পিত

আজ থেকে ১০০ কোটি বছর পর আমাদের সৌরজগতের শক্তির অন্যতম উৎস সূর্যের জ্বালানি ফুরিয়ে আসতে শুরু করবে এবং এটি প্রসারিত হয়ে এক লোহিত দানবে পরিণত হবে। আর তখন পৃথিবীর মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল পুড়ে বিলীন হয়ে যাবে এবং একটা পর্যায়ে সূর্য পুরো পৃথিবীকেই গ্রাস করে ফেলতে পারে।

এরপর সূর্য ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এক ম্লান শ্বেত বামনে পরিণত হবে এবং সৌরজগতের সর্বত্র আলো ও উষ্ণতা ক্রমশ কমে যাবে। তবে একশ ট্রিলিয়ন বা ১০০ লাখ কোটি বছর পর গ্যালাক্সির নক্ষত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং সবকিছু অন্ধকারে ডুবে যাবে।

জার্নাল অব ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটিতে প্রকাশের জন্য গৃহীত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, তবে এই পরিণতি থেকে প্রাণের পালিয়ে বাঁচার একটি উপায় আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর জন্য আমাদের পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে না। আমাদের শুধু কিছু সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আর তাত্ত্বিকভাবে সেই সুরক্ষাব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন গ্যাব্রিয়েল হ্যারি নামে এক গবেষক।

তাঁর প্রস্তাব অনুসারে, প্রথম সমস্যা হলো সূর্য। এটিকে আড়াল করতে আমরা সূর্য ও পৃথিবীর মাঝামাঝি মহাকর্ষীয় ভারসাম্যের একটি স্থান, অর্থাৎ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ একটি বিশাল আবরণ বা সানশেড স্থাপন করতে পারি। লোহিত দানবে পরিণত হওয়া সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করতে পৃথিবীর ওপর আকাশের প্রায় ৭০ ডিগ্রি এলাকা ঢেকে দিতে হবে।

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট-১ (এল-১) হলো মহাকাশের একটি স্থান, যা সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী সরলরেখায় অবস্থিত। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন কিলোমিটার (৯৩২,০০০ মাইল) দূরে সূর্যের দিকে অবস্থিত। এল-১-এ সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তি ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। এর ফলে একটি মহাকাশযান সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় পৃথিবীর সঙ্গে একই সরলরেখায় থাকতে পারে।

গ্যাব্রিয়েল হ্যারির প্রস্তাব হলো, সানশেডের প্রয়োজনীয় আকার কমাতে আমরা ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ একটি ভারী বস্তু স্থাপন করতে পারি, তার সঙ্গে একটি দীর্ঘ কেবল যুক্ত করে সানশেডটিকে পৃথিবীর কাছাকাছি, চাঁদের কক্ষপথের ঠিক বাইরে স্থাপন করতে পারি। এ জন্য বামন গ্রহ সেরেসের প্রায় ৪০ শতাংশ খনন করে ২০ লাখ কিলোমিটার (১২ লাখ মাইল) দীর্ঘ একটি কার্বন টেথার বা সংযোগ-তার তৈরি করা যেতে পারে। আর চাঁদের মাত্র দশমিক ০১ শতাংশ বস্তু ব্যবহার করে ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার (২ লাখ ১৭ হাজার মাইল) ব্যাসার্ধের একটি অ্যালুমিনিয়াম সানশেড তৈরি করা সম্ভব।

সেরেস হলো মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানে অবস্থিত প্রধান গ্রহাণু বলয়ের বৃহত্তম বস্তু এবং সৌরজগতের ভেতরে একমাত্র বামন গ্রহ। ১৮০১ সালে আবিষ্কৃত এই বস্তুটি প্রায় ৯৪০ কিলোমিটার (৫৮৫ মাইল) জুড়ে বিস্তৃত। এটি গ্রহাণু বলয়ের মোট ভরের প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ গঠন করে।

গ্যাব্রিয়েল হ্যারি বলেন, সূর্যের আলো আটকে দেওয়ার পর আমাদের একটি বিকল্প আলোর উৎস তৈরি করতে হবে। সৌভাগ্যক্রমে, সৌরজগতের বিশাল গ্যাস জায়ান্টগুলোতে (মঙ্গল ও বৃহস্পতির মতো গ্যাস সমৃদ্ধ গ্রহ) রয়েছে বিপুল পরিমাণ ফিউশন জ্বালানি। এগুলোতে এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রয়েছে যে এগুলো ব্যবহার করে পৃথিবীতে ৯ দশমিক ১ কোয়াড্রিলিয়ন বা ১০ লাখ কোটি বছর ধরে সূর্যালোকের সমপরিমাণ আলো ও তাপ সরবরাহ করা সম্ভব।

ফিউশন প্রযুক্তির অন্যতম বড় বাধা হলো, কোনো পরিচিত পদার্থ দিয়েই এমন একটি রিঅ্যাক্টর তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ ফিউশন ঘটাতে হলে জ্বালানিকে এত ঘনভাবে সংকুচিত করতে হবে যাতে তা শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। কিন্তু এমনকি তাত্ত্বিকভাবে বিদ্যমান সবচেয়ে শক্তিশালী পদার্থও সেই চাপ সহ্য করতে পারবে না। তবে সৌরজগতের গ্যাস জায়ান্টগুলো এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিলোমিটার গভীরে ভাসমান ফিউশন রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা যেতে পারে। এসব রিঅ্যাক্টর হিলিয়াম-৪ ও হাইড্রোজেন গ্রহণ করে শক্তি উৎপন্ন করবে। সেই শক্তি বৃহস্পতির ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ বিম করে পাঠানো হবে। এরপর একটি শক্তিশালী লেজার ডিভাইস সেটিকে একটি ল্যাগ্রাঞ্জ রিলেতে পাঠাবে এবং সেখান থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠে আলো ও তাপ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

এরপরের সমস্যা হলো পৃথিবী। আমরা যদি পৃথিবীকে তার বর্তমান কক্ষপথ থেকে সরিয়ে না নিই, তাহলে লোহিত দানবে রূপ নেওয়া সূর্য শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে গ্রাস করবে। এটি ঠেকানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হবে একটি গ্রহাণুকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে প্রায় ১০ লাখ বার উড়িয়ে নেওয়া। এর মাধ্যমে মহাকর্ষীয় স্লিংশট প্রভাব কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর কক্ষপথের শক্তি বাড়ানো যাবে এবং পৃথিবীকে সূর্য থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে এত বড় একটি গ্রহাণুর বারবার পৃথিবীর পাশ দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এর পরিবর্তে আমরা বৃহস্পতি থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে কণার রশ্মি বা পার্টিকল বিম পৃথিবীর পাশ দিয়ে ছুড়ে দিতে পারি। এই বিমের মোট ভর হবে আমাজন নদীর বহমান পানির অর্ধেকের সমান। পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে এই বিমটি অবিরাম ছুড়তে থাকলে একই মহাকর্ষীয় স্লিংশট ভর আরও নিরাপদ উপায়ে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। যদি কোনো ভুলে বিমটি পৃথিবীর দিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবুও অক্সিজেন পরিবেশের জন্য নিরাপদ। আর এটি এত বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে যে বায়ুমণ্ডলে আঘাত করার সময় এর গতিশক্তি একটি বজ্রঝড়ের সমান হবে মাত্র।

একই সময়ে পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরীণ টেকটোনিক কার্যকলাপও ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে। এর সঙ্গে পর্বত গঠন এবং প্রাণের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানের পুনঃচক্রায়নও থেমে যাবে। এটি সচল রাখতে আমরা অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করতে পারি। সেটিকে একটি পাত্রে সংরক্ষণ করে পৃথিবীর ভূত্বকে একটি গর্ত করে তার মধ্যে গলিত লোহার সঙ্গে পাত্রটিও ঢুকিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

লোহার পিণ্ডটি প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে। এখানেই পাত্রটির জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে এবং এর ভেতরের অ্যান্টিম্যাটার পাত্রটির উপাদানের বিলয় ঘটাবে। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর কেন্দ্রে তাপ সরবরাহ করবে।

প্রতিদিন ২ কেজি অ্যান্টিম্যাটার উৎপাদন করে পৃথিবীর টেকটোনিক কার্যকলাপ বজায় রাখা সম্ভব হবে। আর যদি শক্তি উৎপাদনের দক্ষতা হবে ১০ শতাংশ, যা ভারতের মোট সৌর প্যানেলের উৎপাদিত শক্তির সমান।

গ্যালাক্সির সংঘর্ষের ঝুঁকি

আরও দীর্ঘ সময়ের কথা ভাবলে আমাদের গ্যালাক্সির মধ্যকার সংঘর্ষের দিকেও নজর রাখতে হবে। এসব সংঘর্ষের সময় গ্যালাক্সির বৃহৎ বস্তুগুলো সৌরজগতের খুব কাছ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলে আসতে পারে। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর পর অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একীভবনের সময় এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এটি মোকাবিলায় বৃহস্পতির ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ স্থাপিত আমাদের লঞ্চার ব্যবহার করে সূর্যের উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর ঠিক ওপর দিয়ে কিংবা নিচ দিয়ে একটি হাইড্রোজেন বিম ছুড়ে দেওয়া যেতে পারে। মহাকর্ষীয় স্লিংশট প্রভাব ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে সৌরজগতের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংঘর্ষের পথ থেকে সৌরজগতকে সরিয়ে নেওয়া যায়।

কেন সৌরজগতেই থেকে যাওয়া?

এখন প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের কোনো সভ্যতা কেন এসব সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে সৌরজগতেই থেকে যাবে, যখন তারা চাইলে অন্য কোনো নক্ষত্রজগতে চলে যেতে পারে? কারণ, মানুষকে দীর্ঘ সময় মহাকাশে জীবিত রাখা এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক দূরত্ব অতিক্রম করা দুটিই অত্যন্ত কঠিন। বিপরীতে, এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর কোনোটির জন্যই আমাদের সৌরজগত ছেড়ে যেতে হবে না।

এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আন্তঃনাক্ষত্রিক অভিবাসনের তুলনায় এক হাজার থেকে এক মিলিয়ন গুণ কম জ্বালানিনির্ভর। একটি নতুন গ্রহে অভিবাসনের জন্য সেখানে আগে থেকেই টেরাফর্মিংয়ের (অন্য একটি গ্রহকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তোলাই টেরাফর্মিং) সরঞ্জাম পাঠাতে হবে। এতে শত শত বছর ধরে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। বিপরীতে, প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো মহাকাশে খনিজ আহরণের অবকাঠামোকে নতুন কাজে ব্যবহার করতে পারবে এবং সেই অবকাঠামো থেকেই তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে।

গ্যালাক্সিজুড়ে ছড়িয়ে পড়াও একটি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন উপনিবেশ এমন পৃথক সভ্যতায় পরিণত হতে পারে, যাদের সঙ্গে মূল সভ্যতার আর কোনো মিল থাকবে না। যথেষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে তারা কার্যত ভিনগ্রহবাসীর মতো হয়ে উঠবে। আর এই ‘ভিনগ্রহবাসীরা’ জানবে আমরা কোথায় আছি এবং আমাদের গ্রহটি কতটা মূল্যবান। তখন নিজেদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, একই সৌরজগতে থেকে এসব সুরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে সমাজকে একত্রে নিরাপদে রাখা সম্ভব হবে। এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ৯১ লাখ বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর প্রাণীরা আরামদায়ক ভূতত্ত্ব, নিরাপত্তা, ঋতু, দিন এবং তারাভরা রাত উপভোগ করতে পারবে। এরপর একশ ট্রিলিয়ন বছর পর যখন শেষ নক্ষত্রটির আলোও নিভে যাবে এবং রাতের আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে উঠবে, তখনও পৃথিবীতে পরদিন সূর্য উঠবে।

তবে সেই সূর্য হবে কৃত্রিম। আর পৃথিবীর জন্য তখনও ৯০ লাখ বিলিয়ন বছর কৃত্রিম সূর্যালোক অবশিষ্ট থাকবে।

তথ্যসূত্র: ফিজিক্স ডট অর্গ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত