Ajker Patrika

বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আজ, বাংলাদেশে কি দেখা যাবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ৫৫
বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আজ, বাংলাদেশে কি দেখা যাবে
নাসার তোলা ছবিতে সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। ছবি: নাসা

পশ্চিম ইউরোপের আকাশে আজ বুধবার (১২ আগস্ট) দেখা যাবে বছরের অন্যতম আলোচিত মহাজাগতিক দৃশ্য। চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিলে দিনের আলো কয়েক মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে যাবে, আকাশে ফুটে উঠবে সূর্যের আবছা করোনা। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সরু পথটি গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর স্পেন এবং উত্তর-পূর্ব পর্তুগালের একটি ছোট অংশ অতিক্রম করবে। ইউরোপের অন্য বহু অঞ্চল থেকে দেখা যাবে গভীর আংশিক গ্রহণ।

হিসাব বলছে, ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম মূল ভূখণ্ড ইউরোপে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। মহাজাগতিক এই দৃশ্য ঘিরে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা অবশ্য স্পেনে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির উত্তরাঞ্চল থেকে বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত গ্রহণের সরু পথে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ জড়ো হতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক স্পেনে পৌঁছেছেন বা পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন।

স্পেনের জন্য ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির আকাশে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর দেখা যাচ্ছে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য স্পেনের প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অঞ্চল থেকে গ্রহণটি সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে।

চাঁদের ছায়ায় অন্ধকার হবে দিনের আকাশ

সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে এবং পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি ঢেকে যায়। চাঁদের ছায়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। বাইরের অপেক্ষাকৃত হালকা অংশকে বলা হয় উপচ্ছায়া বা পেনাম্ব্রা, আর কেন্দ্রের গাঢ় অংশকে বলা হয় প্রচ্ছায়া বা অ্যামব্রা। পৃথিবীর যে সরু অঞ্চলের ওপর আমব্রা পড়ে, সেখান থেকেই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।

আজকের গ্রহণে পূর্ণগ্রাসের পথ উত্তর রাশিয়ার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড পেরিয়ে উত্তর স্পেন এবং পর্তুগালের ছোট একটি অংশে পৌঁছাবে। এরপর গ্রহণটি স্পেনের পূর্বদিকে এগিয়ে বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাবে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মানচিত্র অনুযায়ী, ইউরোপ, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অংশে আংশিক গ্রহণ দৃশ্যমান হবে।

আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিকে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে এবং প্রায় এক মিনিট স্থায়ী হবে। নাসার হিসাব অনুযায়ী, স্পেনের লেওনে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়ে প্রায় দুই মিনিট স্থায়ী হবে। ভ্যালেন্সিয়ায় পূর্ণগ্রাস শুরু হবে রাত ৮টা ৩২ মিনিটে।

স্পেনের ক্ষেত্রে দৃশ্যটি আরও নাটকীয় হওয়ার কারণ, সূর্য তখন দিগন্তের খুব কাছে থাকবে। ফলে অনেক জায়গায় সূর্যাস্তের ঠিক আগে অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের মধ্যে গ্রহণটি দেখা যাবে। নাসা জানিয়েছে, স্পেন ও উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের কিছু এলাকায় সূর্য পুরোপুরি ঢাকার সময়টি হবে সন্ধ্যার শেষভাগে।

পূর্ণগ্রাসের কয়েক মিনিট, যখন দেখা যায় সূর্যের করোনা

চাঁদ যখন পৃথিবীর তুলনামূলক কাছে থাকে, আকাশে তার আপাত আকারও বড় দেখায়। তখন সেটি সূর্যের চাকতিকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে। পূর্ণগ্রাসের সময় দিনের আলো দ্রুত ম্লান হয়ে আসে, তাপমাত্রা কমে যেতে পারে এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দেখা যায় সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা।

এই কয়েক মিনিটই পূর্ণগ্রাসের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। নাসার বিজ্ঞানীরা এই সুযোগে সূর্যের করোনা এবং সূর্য থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রভাব নিয়ে গবেষণা করবেন। নাসার অর্থায়নে বিজ্ঞানীরা উচ্চ-উড্ডয়নকারী বিমান ও বৈজ্ঞানিক বেলুন ব্যবহার করে গ্রহণের সময় সূর্য ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করবেন। তবে পূর্ণগ্রাসের সেই অতি সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানো নিরাপদ নয়। আংশিক গ্রহণের সময় অবশ্যই অনুমোদিত সোলার বা এক্লিপ্স গ্লাস ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সানগ্লাস দিয়ে সূর্য দেখা নিরাপদ নয়।

ইউরোপের বাকি অংশে কী দেখা যাবে

পূর্ণগ্রাসের সরু পথের বাইরে ইউরোপের বিশাল অংশে দেখা যাবে আংশিক সূর্যগ্রহণ। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং ইতালির উত্তরাঞ্চলসহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় সূর্যের বড় একটি অংশ চাঁদের আড়ালে চলে যাবে। যুক্তরাজ্যে সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঢাকা পড়তে পারে। লন্ডনে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে গ্রহণ শুরু হয়ে প্রায় ৭টা ১৩ মিনিটে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা।

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার কিছু এলাকাতেও গভীর আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে। উত্তর আমেরিকায় কানাডার বিস্তীর্ণ অংশ, আলাস্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের কিছু অঞ্চল থেকে আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে। যুক্তরাজ্যের আকাশে গ্রহণ শেষ হওয়ার পর অবশ্য আরেকটি আকাশ-উৎসব অপেক্ষা করবে। একই রাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে পারসেইড উল্কাবৃষ্টি। অমাবস্যার কাছাকাছি সময় হওয়ায় আকাশ তুলনামূলক অন্ধকার থাকবে, ফলে উল্কাবৃষ্টিও দেখার সুযোগ ভালো হবে।

‘রিং অব ফায়ার’ কেন আলাদা

পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের মূল পার্থক্য চাঁদের আপাত আকারে। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে সামান্য উপবৃত্তাকার কক্ষপথে। ফলে কখনো এটি পৃথিবীর কাছে, কখনো দূরে থাকে। চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকে, তখন আকাশে তার আপাত আকার সূর্যের চেয়ে সামান্য ছোট দেখাতে পারে। ফলে সূর্যের সামনে দিয়ে গেলেও চাঁদ পুরো সৌরচাকতি ঢাকতে পারে না। চারপাশে সূর্যের উজ্জ্বল প্রান্ত একটি আগুনের আংটির মতো দেখা যায়। একেই বলা হয় ‘রিং অব ফায়ার’ অর্থাৎ বলয়গ্রাস বা অ্যানুলার সূর্যগ্রহণ। পূর্ণগ্রাসে দিনের আকাশ সাময়িকভাবে গভীর অন্ধকারে ঢেকে যেতে পারে; বলয়গ্রাসে সাধারণত এমন সম্পূর্ণ অন্ধকার নামে না।

স্পেনের আকাশে টানা তিন বছরের মহাজাগতিক আয়োজন

১২ আগস্টের গ্রহণটি স্পেনের জন্য একক কোনো ঘটনা নয়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ইউরোপে পরপর তিনটি উল্লেখযোগ্য সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। প্রথমটি আজকের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ। দ্বিতীয়টি ২০২৭ সালের ২ আগস্ট, যখন দক্ষিণ স্পেন থেকে আবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এর পূর্ণগ্রাসের পথ উত্তর আফ্রিকার মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মিসর হয়ে সৌদি আরব এবং ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

এর পর ২০২৮ সালের ২৬ জানুয়ারি স্পেন ও পর্তুগালের আকাশে দেখা যাবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এই ধারাবাহিকতা স্পেনকে আগামী কয়েক বছরের জন্য ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘ইক্লিপ্স গন্তব্যে’ পরিণত করেছে। গ্রহণ দেখতে পর্যটকদের ঢল সামলাতে দেশটির কর্তৃপক্ষকে বাড়তি নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাও নিতে হয়েছে। প্রচণ্ড গরম, খরা ও দাবানলের ঝুঁকির কারণে ভিড়ের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

এরপর কবে কোথায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আগামী বছরগুলোতেও একের পর এক পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। ২০২৭ সালের গ্রহণটি দক্ষিণ স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ অতিক্রম করবে। এরপরের উল্লেখযোগ্য পূর্ণগ্রাস গ্রহণগুলোর মধ্যে ২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং ২০৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশ রয়েছে।

উত্তর আমেরিকায় ২০৪৪ সালে আবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ফিরবে। ২০৪৫ সালে আরও একটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের এক উপকূল থেকে অন্য উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে দেখা যাবে। যুক্তরাজ্যে অবশ্য অপেক্ষা দীর্ঘ। দেশটিতে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের জন্য ** ২০৯০ সাল** পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সে পরবর্তীটি দেখা যাবে ২০৮১ সালে। অর্থাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্যালেন্ডার মানুষের জীবদ্দশার সঙ্গে খুব একটা আপস করে না, স্বভাবতই।

বাংলাদেশে দেখা যাবে না

বাংলাদেশের আকাশে আজকের সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। কারণ গ্রহণের সময় সূর্য বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশে দৃশ্যমান অবস্থায় থাকবে না। ভারতীয় সময় অনুযায়ী গ্রহণটি ১২ আগস্ট রাত থেকে ১৩ আগস্টের প্রথম প্রহর পর্যন্ত চলবে। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে যখন গ্রহণের মূল পর্যায় ঘটবে, তখন সূর্য দিগন্তের নিচে অবস্থান করবে। একই কারণে বাংলাদেশ থেকেও গ্রহণের কোনো পর্যায় দৃশ্যমান হবে না। ভারতের ক্ষেত্রেও আজকের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখা যাবে না।

তবে বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীদের জন্য মহাজাগতিক নাটক পুরোপুরি পর্দার আড়ালে নয়। নাসা এবং ইএসএ সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে গ্রহণ দেখার সুযোগ দিচ্ছে। ইএসএস স্পেনের জাভালামব্রে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজারভেটরি থেকে ইংরেজিতে সরাসরি সম্প্রচার করবে; সম্প্রচার শুরু হওয়ার কথা স্পেনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৩০ মিনিটে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত