Ajker Patrika

সংস্কারের দাবি: রাজপথে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের আভাস

  • গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ঢাকায় আজ ১১ দলের বিক্ষোভ
  • সরকার দাবি না মানলে আন্দোলন দিনে দিনে কঠোর হতে পারে
  • বিরোধীদের উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে: বিশ্লেষক
অর্চি হক ও আব্দুল্লাহ আল গালিব, ঢাকা
সংস্কারের দাবি: রাজপথে দীর্ঘমেয়াদি
আন্দোলনের আভাস

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো রাজপথে নামছে বিরোধী জোট। রাজধানীতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আজ শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্য দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে ঘোষিত এই কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের সূচনা বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে রাজপথে নামছে বিরোধীরা। দেশের রাজনীতিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এতে আবার উত্তপ্ত হতে পারে রাজপথ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা, যেখানে সংসদের বাইরে চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, শুরুতেই তাঁরা কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছেন না। প্রথমে বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। এতে ইতিবাচক সাড়া না পেলে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ানো হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে। তার আগে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। এরপর সরকারের মনোভাব বুঝে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার যদি ভুল পথ থেকে ফিরে না আসে, অর্থাৎ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা হয়, তাহলে আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃহত্তর কর্মসূচিতে যেতে হলে, তা-ই করা হবে।’

বিরোধীদলীয় জোটের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতা বলেন, যখন সরকারের কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে আন্দোলন শুরু হয়, তখন সরকারবিরোধী সব পক্ষই ক্রমান্বয়ে একদিকে চলে আসে। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁরা সেটা দেখেছেন। এখন তাঁদের জোটে যাঁরা নেই, তাঁরাও ক্রমান্বয়ে সরকারবিরোধী যেকোনো কর্মসূচিতে সমর্থন জানাবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা।

নির্বাচনের আগে-পরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ‘সহযোগিতার মনোভাব’ দেখা গিয়েছিল তা দিনে দিনে কমে আসছে। বরং বিভিন্ন ইস্যুতে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই মতভেদের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধান সংস্কার এবং সংসদের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে গত বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপন করে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে ৯৮টি হুবহু, ১৫টি সংশোধনী আকারে বিল পাসের উত্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কমিটি। অন্যদিকে গণভোট, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুদক কমিশনসহ ১৬টি নতুন করে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে বিল পাস না হলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাবে।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণের সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় স্থাপনে জুলাই সনদে থাকা প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন বিএনপির আপত্তি ছিল না।

বিরোধী দলের দাবি গণভোট, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের উল্টো পথে হাঁটছে। আবার গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করছে ক্ষমতাসীনেরা। এর প্রতিবাদে বিরোধী জোট আন্দোলনের পথে নামল।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘গণরায় স্পষ্টভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে আসা সত্ত্বেও সরকারি দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি গুরুতর গণতান্ত্রিক অবমাননা। সংসদেও আমরা দেখছি, যুক্তি ও ন্যায়ের পরিবর্তে গায়ের জোরে আইনের অপব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা রাজপথের আন্দোলনে যাচ্ছি।’

আসিফ আরও বলেন, ‘সরকার যদি জনরায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগোয়, আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। না করলে আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি কেমন হবে তা আমরা আমাদের ১১ দলীয় জোটের ভেতর এবং সংস্কারপন্থী সব শক্তির সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করব।’

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকার যদি বিরোধীদের দাবিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে, তাহলে আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি ভবিষ্যতে দেশব্যাপী হরতাল বা অবরোধের কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।

জামায়াত ও এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সে রকম ইঙ্গিত দিয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বর্তমানে পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে রয়েছেন। তিনি দেশে ফেরার পর আগামী ৭ এপ্রিল আবারও বৈঠকে বসবেন ১১ দলীয় জোটের নেতারা। সেই বৈঠকে আরও কঠোর কর্মসূচির সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানিয়েছেন একাধিক নেতা।

তবে আন্দোলনের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় জোট তাদের দাবি আদায় করতে সক্ষম হবে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, অনেক কিছু নির্ভর করছে সরকারের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সরকার অনেক সময় বিরোধীদের উপেক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায়। এবার সরকার ও বিরোধী জোট কোন পথে হাঁটে, সেটাই দেখার বিষয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত