Ajker Patrika

দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস গড়ল নেপাল: দলিতদের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা বালেন্দ্র শাহের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস গড়ল নেপাল: দলিতদের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা বালেন্দ্র শাহের
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই দলিত সম্প্রদায়ের মানুষেরা সমাজে অস্পৃশ্য বিবেচিত হন। ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ায় কয়েক শতাব্দীর জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার কলঙ্ক মুছতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নেপাল। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দলিত ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা দিয়েছে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের প্রশাসন। গত মাসে এক গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত হয়ে আসা ৩৫ বছর বয়সী এই র‍্যাপার ও সাবেক মেয়রের ১০০ দফা সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করা হবে।

নেপালের মোট ৩ কোটি জনসংখ্যার ১৩ শতাংশেরও বেশি মানুষ দলিত সম্প্রদায়ের। হিন্দু বর্ণপ্রথার তলানিতে থাকা এই মানুষগুলো বংশপরম্পরায় চরম বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। বালেন্দ্র শাহের সরকার জানিয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর মাধ্যমে দলিতদের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদী অন্যায় ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ইতিহাস রয়েছে, রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করে নেবে। এই ক্ষমা প্রার্থনার পর সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনর্বাসন এবং ঐতিহাসিক পুনর্মিলনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নেপালের দলিত অধিকার কর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। দলিত সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সভাপতি সরস্বতী নেপালি বলেন, ‘রাষ্ট্রের এই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের ক্ষতে প্রলেপের মতো কাজ করবে। তবে এর পূর্ণ নিরাময় তখনই সম্ভব, যখন সরকার আমাদের সাংবিধানিক অধিকারগুলো কার্যকরভাবে নিশ্চিত করবে।’ ছোটবেলায় স্কুলে সহপাঠীদের সঙ্গে এক পাত্র থেকে পানি পান করতে না পারার সেই যন্ত্রণার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি এটিকে আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার লড়াই হিসেবে অভিহিত করেন।

নেপালের এই সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় দলিত নেতা ও সংসদ সদস্য চন্দ্রশেখর আজাদ নেপালের উদাহরণ টেনে লোকসভায় ভারতের ঐতিহাসিক অবিচারের জন্য নৈতিক দায়বদ্ধতা স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন। ১৯৫০ সালে বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ হলেও ভারতে আজও ২০ কোটি দলিত নানাভাবে নিগৃহীত।

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলিতসহ সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া পাকিস্তানে দলিতরা এখনো ময়লা পরিষ্কার বা চামড়ার কাজের মতো পেশায় আটকা পড়ে আছে। শ্রীলঙ্কায় বৈষম্য কিছুটা কম হলেও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ে এখনো লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে এই সম্প্রদায়কে।

নেপালের বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছে, ‘পরিবর্তন আনা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন।’ বর্তমানে নেপালের ৪২ শতাংশ দলিত দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত নগণ্য। ২০০৬ সালে নেপালকে ‘অস্পৃশ্যতামুক্ত রাষ্ট্র’ ঘোষণা করা হলেও এবং ২০১১ সালে বর্ণবৈষম্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখনো অনেক বাকি।

বিশ্লেষকদের মতে, বালেন্দ্র শাহের এই সাহসী পদক্ষেপ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জাতিভেদ প্রথা বিলোপের আন্দোলনে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত