Ajker Patrika

আশুরার মহৎ বার্তা

সম্পাদকীয়
আশুরার মহৎ বার্তা

আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে ‘আশুরা’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ দশম। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখে এই দিনটি পালিত হয়। এটি ইসলামপূর্ব যুগ থেকে মক্কার পৌত্তলিক এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছেও একটি মহিমান্বিত দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। সৃষ্টির সূচনাপর্ব থেকেই এই ১০ মহররম নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। এই দিনে আসমান, জমিন, সাগর ও পাহাড় সৃজিত হয়েছিল। আদি পিতা আদম (আ.) ও বিবি হাওয়ার তওবা কবুল হয়েছিল এই দিনে। আশুরার দিনেই মহাপ্লাবনের পর নুহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে নোঙর করে; ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুল হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, এই ১০ মহররম আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে অলৌকিকভাবে মুক্ত করেছিলেন এবং লোহিতসাগরে ফেরাউনের সলিলসমাধি ঘটেছিল।

আশুরার দিনটি সমকালীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও আবেগঘন নবীজির স্নেহের দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে। প্রিয় নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের প্রায় অর্ধশতক পর হিজরি ৬১ সনের এই দিনে কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির কারণে দিনটি মুসলিম হৃদয়ে গভীর শোক ও বেদনার প্রতীক। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, মুআবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ দামেস্কের খলিফা হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু ইয়াজিদ এই পদের অযোগ্য ও অত্যাচারী হওয়ায় মদিনার শীর্ষস্থানীয় সাহাবিরা তাঁর আনুগত্য (বায়াত) মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, যাঁদের অন্যতম ছিলেন মা ফাতিমা (রা.)-এর আদরের দুলাল হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

এই পরিস্থিতিতে কুফাবাসীরা ইয়াজিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আসার জন্য হাজার হাজার চিঠি পাঠায় এবং তাঁকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কুফাবাসী তাদের দেওয়া অঙ্গীকার আর রক্ষা করেনি। ইমাম হোসাইন (রা.) ইরাকের কারবালা নামক প্রান্তরে পৌঁছালে ইবনে জিয়াদের বিশাল বাহিনী চারদিক থেকে তাঁর পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফোরাত নদীর তীরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যার ধমনিতে বইছে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র রক্ত, তিনি কি মিথ্যার কাছে মাথা নত করতে পারেন? তিনি জালিমের বশ্যতা অস্বীকার করেন। ফলে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মমভাবে শহীদ হন ইমাম হোসাইন (রা.)।

কারবালা আমাদের শেখায়—প্রয়োজনে প্রাণোৎসর্গ করতে হবে, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, সহনশীলতা ও সত্যের পথে আমৃত্যু অবিচল থাকা। আসুন, আশুরার এই পবিত্র প্রহরে আমরা অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং কারবালার অবিনাশী চেতনায় দীক্ষিত হয়ে সব ধরনের জুলুম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আওয়াজ তুলি। হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি দূর করে আগামীর পৃথিবীকে নিষ্কলুষ, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক করে তোলাই হোক আমাদের দৃঢ় শপথ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত