
সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু হওয়া মানুষের পরিচয়ের একটি ছোট্ট অংশ মাত্র; মহত্ত্বের পরিচয় আসে কর্ম থেকে। পৃথিবীর অনেক শ্রেষ্ঠ মানুষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে জন্মেছিলেন। যাঁদের সেই দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘুত্বের কারণে বঞ্চনা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা নিজেদের পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে থাকেননি। তাঁরা এমন কর্ম, চিন্তা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত কোনো বিশেষ ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির সম্পদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো সংখ্যালঘুর সীমা পেরিয়ে সবার হয়ে ওঠার এই গল্প।
উপমহাদেশের ইতিহাসে এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ব্রিটিশ ভারতের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কবি ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতায় নিজেকে কখনো আবদ্ধ করেননি। তিনি যেমন ইসলামের গান লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত ও ভজনও রচনা করেছেন। তিনি যেমন মুসলমানের কবি, তেমনি হিন্দুরও কবি; যেমন বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তেমনি বাংলা ভাষাভাষী কোটি মানুষের হৃদয়ের কবি। বিদ্রোহী এই কবির সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটাই যে তিনি নিজের পরিচয় ও জন্মভূমির সীমানা ছাপিয়ে মানুষের কবি হয়ে ওঠেন। মাতৃভূমি ভারতের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশের জাতীয় কবি হওয়ার বিরল সম্মান তাঁকে বিশ্বজনীন করে তোলে।
ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী আজ প্রায় ২০ কোটির কাছাকাছি। সংখ্যায় তারা বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। তবু বৃহত্তর ভারতীয় সমাজে তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সেই সম্প্রদায় থেকেই উঠে এসেছেন ড. এ পি জে আবদুল কালামের মতো মহান ব্যক্তিত্ব। বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও স্বপ্নদ্রষ্টা এই ব্যক্তিত্ব শুধু মুসলিম সমাজের গর্ব নন; তিনি গোটা ভারতের অন্যতম প্রিয় নাগরিক হিসেবে স্মরণীয়। একইভাবে সানাইসম্রাট বিসমিল্লাহ খান কিংবা কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ তানসেনও তাঁদের শিল্পসাধনার মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন।
একই শিক্ষা পাওয়া যায় পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জীবন থেকেও। দানেশ কানেরিয়া, রানা ভগবানদাস কিংবা মহেশ মালানির মতো ব্যক্তিত্ব দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্র, ধর্ম কিংবা সংখ্যার হিসাব মানুষের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে জন্মালেও তাঁদের অবদান বৃহত্তর সমাজে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা জন্মভূমির সংকট, বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে নিজেদের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। নাৎসি নিপীড়নের কারণে জন্মভূমি জার্মানি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়া এই অভিবাসী বিজ্ঞানীর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব শুধু পদার্থবিজ্ঞানের নয়, মানবসভ্যতার চিন্তার জগৎকেই বদলে দিয়েছে।
একইভাবে ইহুদি বংশোদ্ভূত সংগীত কিংবদন্তি বব ডিলান, ইহুদি ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা কবি-গায়ক লিওনার্ড কোহেন, আর্মেনীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উত্তরসূরি ফরাসি শিল্পী শার্ল আজনাভুর কিংবা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী মিরিয়াম মাকেবা ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বমানবের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছেন।
মালালা ইউসুফজাই ও নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনও একই শিক্ষা দেয়। একজন শিক্ষার অধিকারের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, অন্যজন দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবাস ও নির্যাতনের পরও প্রতিশোধের বদলে পুনর্মিলন ও সহাবস্থানের পথ দেখিয়েছেন। এভাবেই তাঁরা নিজ নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমানবতার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছেন।
বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে পারিবারিক শিকড় থাকা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও কালজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও তাঁদের কর্ম ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে ভৌগোলিক সীমানা এবং জাতীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানবতার অভিন্ন সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের কাজ প্রমাণ করে সৃষ্টিশীলতায় জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার সীমান্ত বাধা হতে পারে না।
মহাত্মা গান্ধী যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী গিরিশচন্দ্র সেনও ধর্মীয় বিভাজনের দেয়াল অতিক্রম করে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, জ্ঞান ও মানবতার কোনো সাম্প্রদায়িক সীমানা নেই।
প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানুষকে বড় করে তার জন্মপরিচয় নয়, তার কর্মপরিচয়। যাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়ের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বমানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত সবার হয়ে উঠেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম থেকে আবদুল কালাম, গিরিশচন্দ্র সেন থেকে আইনস্টাইন, বব ডিলান থেকে রানা ভগবানদাস—প্রত্যেকেই আমাদের মনে করিয়ে দেন যে মানবতার ভাষা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ভাষার চেয়ে অনেক বড়।
তাঁদের কেউ কোনো ভূখণ্ড দখল করেননি, কোনো জনপদ নিশ্চিহ্ন করেননি, কাউকে ঘরছাড়া করেননি। তাঁরা বিজয়ী হয়েছেন অস্ত্রের শক্তিতে নয়, মানবতার শক্তিতে। তাঁদের সাফল্যের ভিত্তি ছিল না অন্যকে হারানো, বরং নিজ নিজ ক্ষেত্রে উৎকর্ষ সাধন। তাই তাঁদের অবদান ও সৃষ্টিকর্ম যুগের পর যুগ নীরবে আশ্রয় নিয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়ে।
সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু—এ দুটি পরিচয় সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষা হতে পারে, কিন্তু মহান মানুষের পরিচয় নয়। মহান মানুষের প্রকৃত পরিচয় একটাই—তিনি মানুষের জন্য কতটা আলো রেখে গেছেন। আর সেই আলো যখন বিভাজন ও সময়-কালকে অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের হৃদয় আলোকিত করে, তখন তিনি আর কোনো গোষ্ঠীর থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন সবার।

আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে ‘আশুরা’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ দশম। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখে এই দিনটি পালিত হয়। এটি ইসলামপূর্ব যুগ থেকে মক্কার পৌত্তলিক এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছেও একটি মহিমান্বিত দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। সৃষ্টির সূচনাপর্ব থেকেই এই ১০ মহররম নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।
১ ঘণ্টা আগে
গণতন্ত্র নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে তাদের শক্তিমত্তার জানান দেয়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা গণতান্ত্রিক কোনো দল অতি দ্রুত স্বৈরাচারী দলে পরিণত...
১ ঘণ্টা আগে
একসময় মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছিল পরিবার। বার্ধক্যে পৌঁছালে সন্তানসন্ততি, নাতি-নাতনি এবং জীবনসঙ্গীকে ঘিরে একটি শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন দেখতেন অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু সমাজের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক প্রবীণের পরিবার আছে, আত্মীয়স্বজন আছে, সন্তানও আছে—
২ ঘণ্টা আগে
নানা নাটকীয়তার পর মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন দুই পক্ষের মধ্যে চলছে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে আলোচনা, দর-কষাকষি। এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সরবরাহ করা হবে।
১ দিন আগে