Ajker Patrika

একাকী বার্ধক্য: পরিবার আছে কিন্তু সঙ্গ নেই

হাসান আলী 
একাকী বার্ধক্য: পরিবার আছে কিন্তু সঙ্গ নেই

একসময় মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছিল পরিবার। বার্ধক্যে পৌঁছালে সন্তানসন্ততি, নাতি-নাতনি এবং জীবনসঙ্গীকে ঘিরে একটি শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন দেখতেন অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু সমাজের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক প্রবীণের পরিবার আছে, আত্মীয়স্বজন আছে, সন্তানও আছে—কিন্তু সঙ্গ নেই। এই একাকী বার্ধক্য নীরবে আমাদের সমাজের একটি বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে।

একাকিত্ব মানেই একা বসবাস নয়। একজন মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থেকেও গভীরভাবে একাকী হতে পারেন। কারণ, মানুষের শুধু খাদ্য, বস্ত্র বা চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কথা বলার মানুষ, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার মানুষ এবং নিজের অস্তিত্বের মূল্য অনুভব করার সুযোগ। বার্ধক্যে এসে এই চাহিদাগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

অতীতে যৌথ পরিবারে প্রবীণেরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ এবং সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। সংসারের ছোট-বড় নানা বিষয়ে তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে বয়স বাড়লেও তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় এবং সম্মানিত মনে করতেন। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, ছোট পরিবার এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে সেই সামাজিক কাঠামো দ্রুত বদলে গেছে।

আজকের তরুণ প্রজন্মের জীবন ছুটছে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এবং নানা প্রতিযোগিতার পেছনে। অনেক সন্তান দেশের এক প্রান্তে, আবার কেউ বিদেশে বসবাস করে। প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগের সুযোগ বাড়লেও সম্পর্কের গভীরতা সব সময় সমানভাবে বাড়েনি। মোবাইল ফোনে কয়েক মিনিটের খোঁজখবর নেওয়া হয়তো দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু তা সব সময় সঙ্গের অভাব পূরণ করতে পারে না।

অনেক প্রবীণ আছেন, যাঁদের সংসারে অর্থের অভাব নেই। সন্তানেরা দায়িত্বশীল, নিয়মিত খোঁজও নেন। তবু তাঁদের মনে একধরনের শূন্যতা কাজ করে। কারণ, তাঁরা অনুভব করেন, তাঁদের কথা শোনার মতো মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, পরিবারের আলোচনায় তাঁদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা থেকে তাঁরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। ফলে তাঁরা নিজের ঘরেই অনেক সময় অতিথির মতো অনুভব করেন।

জীবনসঙ্গী হারানোর পর এই একাকিত্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী চলে গেলে শুধু একজন মানুষকে হারানো হয় না; হারিয়ে যায় স্মৃতির অংশীদার, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী এবং জীবনের সাক্ষী। সন্তানসন্ততি পাশে থাকলেও সেই শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। অনেক প্রবীণ তখন নীরবে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা এবং জীবনের প্রতি অনাগ্রহের মধ্যে দিন কাটান।

একাকী বার্ধক্যের আরেকটি কারণ হলো প্রজন্মগত দূরত্ব। নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, জীবনধারা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবন অনেক সময় প্রবীণদের কাছে অপরিচিত মনে হয়। অন্যদিকে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধও তরুণদের কাছে সব সময় সমান গুরুত্ব পায় না। ফলে একই পরিবারে থেকেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।

এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানসিক অবসাদ, স্মৃতিশক্তির অবনতি, উদ্বেগ এবং নানা শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রবীণদের একাকিত্বকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামাজিক স্বাস্থ্য সমস্যার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

সমাধানের জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার ভূমিকা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পারিবারিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা। সমাজে প্রবীণবান্ধব ক্লাব, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রবীণদের নিজেদেরও নতুন সম্পর্ক, নতুন আগ্রহ এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার সুযোগ খুঁজে নিতে হবে।

বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও এটি বিচ্ছিন্নতার অধ্যায় হওয়া উচিত নয়। একজন প্রবীণের সবচেয়ে বড় চাহিদা সব সময় অর্থ বা সম্পদ নয়; অনেক সময় একটি আন্তরিক কথা, কিছু সময় এবং পাশে থাকার আশ্বাসই তাঁর জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।

পরিবার থাকা সত্ত্বেও সঙ্গহীন হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা যদি বাড়তেই থাকে, তবে আমাদের সামাজিক উন্নয়ন অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই এখনই সময় একাকী বার্ধক্যের এই নীরব সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। কারণ, একটি মানবিক সমাজের পরিচয় নির্ভর করে সে তার প্রবীণদের কতটা সম্মান, সঙ্গ এবং মর্যাদা দিতে পারে তার ওপর।

প্রবীণদের সবচেয়ে বড় অভাব অনেক সময় অর্থের নয়, মানুষের—পরিবারের নয়, সঙ্গের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত