Ajker Patrika

হামে আর কত মৃত্যু

সম্পাদকীয়
হামে আর কত মৃত্যু

কত মা-বাবার বুক খালি হচ্ছে! কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের এ নিয়ে কোনো হেলদোল দেখা যাচ্ছে না। ২০ মে আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় ১১ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

আর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৫টি। আমাদের দেশে একটা ব্যাপার দেখা যায়, যখন কোনো ঘটনায় একের পর এক মৃত্যু হতে থাকে, তখন সেটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে যায়। এটা শুধু হামের ক্ষেত্রেই নয়। সড়ক দুর্ঘটনা বা এর আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনায় কথাটার যৌক্তিকতা বোঝা যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামে টিকা কেনার ব্যর্থতার কথা আমরা জানি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে দায়ী করে বর্তমান সরকার কোনোভাবেই পার পেতে পারে না। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে কতটা নাজুক, সেটা এ ঘটনায় প্রকাশিত হয়েছে।

যথাসময়ে টিকা না দেওয়ার কারণে হামে যেকোনো শিশু আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু হামে আক্রান্ত হওয়ার পর কেন যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না, এ দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? আর শিশুদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টা কারও নজরে পড়ছে না।

একটি দেশে নিছক প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একসঙ্গে শত শত শিশুর প্রাণ চলে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়। আর এই বিপর্যয়ের পেছনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চরম উদাসীনতা ও ব্যর্থতাই মূলত দায়ী। যখন প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের জীবন শেষ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে স্বাস্থ্য খাতের মূল ভিত ভেঙে পড়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের রুল জারি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বাস্থ্যসচিবের কাছে জানতে চেয়েছেন—কেন এই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে না। একই সঙ্গে মৃত শিশুদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও রুলে বলা হয়েছে। আদালতের এই হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতটা ব্যর্থ হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই ব্যর্থতার পেছনে দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, রাষ্ট্রকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

শিশুদের মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি মৃত্যুই এক একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙবে কবে? আমরা আশা করব, আদালতের রুল জারির পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের সুদীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে জেগে উঠবে আর আমাদের শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত