Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক চা দিবস: সবুজ অরণ্যে ঢাকা ধূসর জীবন

মালিহা মেহনাজ
আন্তর্জাতিক চা দিবস: সবুজ অরণ্যে ঢাকা ধূসর জীবন
মাঠপর্যায়ে চা-পাতা সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত সিংহভাগই নারী শ্রমিক। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

পানি বাদে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় হলো চা। এটি শুধু পানীয় নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনুভূতি, আড্ডা ও আতিথেয়তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চায়ের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। চা প্রথম আবিষ্কৃত হয় চীনে। পরে ধীরে ধীরে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকে প্রথম ব্রিটিশদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে চায়ের বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে চা-শিল্প গভীরভাবে জড়িত। চায়ের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রতিবছর ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালিত হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম চা উৎপাদনকারী দেশ। সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশে সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিস্তীর্ণ চা-বাগান রয়েছে। এসব চা-বাগান আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি পর্যটনশিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অপরূপ সৌন্দর্যে বিস্তৃত এই বাগানগুলোর মাঝেই দিনরাত পরিশ্রম করেন হাজার হাজার চা-শ্রমিক। এই শ্রমিকদের ঘাম আর কষ্টেই গড়ে উঠেছে বিশাল চা-শিল্প। অথচ যে কাঁধে ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত, সেই চা-শ্রমিকেরাই রয়ে গেছেন সমাজের পিছিয়ে থাকা ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে। চা-শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পেশায় যুক্ত। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পে কাজ করেও তাঁদের জীবনমান এখনো খুব বেশি উন্নত হয়নি। আজও একজন চা-শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১২০-১৭০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো কোনো মৌলিক চাহিদাই এই আয় দিয়ে পূরণ করা যায় না। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে চা-পাতা তুলতে হয়, কিন্তু সেই শ্রমের তুলনায় তাঁদের আয় খুবই কম।

বাংলাদেশের চা-শিল্পে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নারী। তার মানে মাঠপর্যায়ে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত সিংহভাগই নারী শ্রমিক; যাঁরা একই সঙ্গে ঘরের কাজ, সন্তান পালন এবং বাগানের কাজ সামলান। কিন্তু মজুরির বেলায় দেখা যায় নারী-পুরুষ বৈষম্য। অধিকাংশ বাগানে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা নেই। অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক শ্রমিক নানা রোগে ভোগেন। গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। তাঁদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো মৌলিক সুবিধাটুকুও দেওয়া হয় না। এ ছাড়া স্বল্প মজুরির কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ সুষম খাদ্য না পাওয়ায় তাঁরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগেন। চা-শ্রমিকদের শিশুদের শিক্ষার সুযোগও সীমিত। অনেক চা-বাগান এলাকায় ভালো কোনো স্কুল নেই, থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবার শিশুর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। অনেককে অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে যোগ দিতে হয়। ফলে এক প্রজন্মের দারিদ্র্য আর অপূর্ণতার চক্র পরবর্তী প্রজন্মকেও আটকে ফেলে।

সামাজিক বৈষম্যও তাঁদের জীবনের একটি কঠিন দিক। দীর্ঘদিন ধরে চা-শ্রমিক সম্প্রদায় মূলধারার সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। চা-শ্রমিকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী, সংস্কৃতিমনা ও সংগ্রামী মানুষ। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন। তাঁদের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু তাঁদের এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে।

চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ন্যায্য মজুরি, উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাঝে মাঝে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও তার অধিকাংশই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাস্তবে চা-শ্রমিকদের জীবনে স্থায়ী ও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কমই আসে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মাঝেমধ্যে ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনে নামলেও দীর্ঘ মেয়াদে তার কার্যকর ফল দেখা যায় না। বরং দাবি তুললে অনেক শ্রমিককে হুমকি, হয়রানি কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হয়।

অথচ এই শ্রমিকদের শ্রম ও ত্যাগ ছাড়া দেশের চা-শিল্প কল্পনাই করা যায় না। চা উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় পুরো ব্যবস্থাই তাঁদের পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তবু দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র, শিল্পমালিক ও সমাজ এখনো তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি।

চা দিবস এলে শহরের ক্যাফে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা নানা আয়োজনজুড়ে চায়ের স্বাদ ও ঐতিহ্যের প্রশংসা দেখা যায়। কিন্তু সেই সময়েও দূরের কোনো চা-বাগানে একদল শ্রমিক নীরবে কাজ করে যান। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাঁরা পাতার পর পাতা তুলে চলেন। তাই চায়ের স্বাদে নিজের স্বস্তি খোঁজার পাশাপাশি সেই চায়ের পেছনের মানুষগুলোর জীবনে স্বস্তি ও মর্যাদার আলো পৌঁছে দেওয়াই আমাদের সত্যিকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত। এক কাপ চায়ের চুমুকেই লুকিয়ে থাকুক সুন্দর ও টেকসই আগামী।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত