Ajker Patrika

পাহাড়ে পানির সংকট

সম্পাদকীয়
পাহাড়ে পানির সংকট

হাওরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারছেন না। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির অনেক জায়গায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। ঝিরি, ঝরনা আর কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ি মানুষের। এ অঞ্চলের এই তীব্র পানিসংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি এখন জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, প্রাকৃতিক উৎসের পানি পান করে অনেকে নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

একসময় পাহাড়ের মানুষ প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজন মেটাত। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে বাধাগ্রস্ত করার কারণে প্রকৃতি এখন বৈরী হয়ে পড়েছে। তাই প্রকৃতি আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না। এ অঞ্চলে পানিসংকটের মূল কারণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক বন উজাড় করে সেগুন বা রাবারবাগান করায় মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এ ছাড়া একসময় পাহাড়ের ঝিরিগুলো ছিল বারোমাসি পানির উৎস। কিন্তু পাথর উত্তোলন এবং ছড়ার উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে এগুলো মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

পানির অভাবে পাহাড়ি জনপদে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে দীঘিনালা, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ির দুর্গম এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির অভাব সবচেয়ে বেশি। শহরাঞ্চলে ৫০০ ফুটের নিচে ছাড়া টিউবওয়েলের পানি পাওয়া যায় না।

এ অঞ্চলের পানিসংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ের ঢালু স্থানে বড় আকারে জলাধার তৈরি করে বর্ষার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বাগান করা রোধ করে বরং স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করতে হবে। বন থাকলে পাহাড়ের আর্দ্রতা এমনিতেই স্বাভাবিক থাকবে এবং ঝরনাগুলো পুনর্জীবিত হবে। পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরি থেকে অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। এ জন্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষা করেই পানিসংকটের উপায় বের করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে স্থানীয় মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রচেষ্টা ছাড়া এই সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। খাগড়াছড়ির প্রতিটি ঘরে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা কেবল উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি পাহাড়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। সে জন্য এখনই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত