Ajker Patrika

চিকিৎসাব্যবস্থা কবে স্বস্তির হবে

স্বপ্না রেজা
চিকিৎসাব্যবস্থা কবে স্বস্তির হবে
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনমনে অনেক শঙ্কা, সংশয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

একটা ঘটনা দিয়ে লেখা শুরু করব। এ রকম ঘটনা কিন্তু অহরহ ঘটছে। যাঁরা ভুক্তভোগী কেবল তাঁরাই ভালো জানেন, তাঁরা কতটা বিপর্যস্ত হন। বাকিরা হয়তো খবর আকারে বিষয়টি জানতে পারেন, যদি না সংবাদটা মিডিয়ায় আসে। তবে যেহেতু অসুখবিসুখ কমবেশি সবারই হয়, সুতরাং সাধারণ মানুষ বিশেষত যাঁরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিংবা যাঁরা যথাযথ ধারণা রাখেন না, চিকিৎসককে প্রশ্ন করবার শক্তি রাখেন না। একপর্যায়ে তাঁরা চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রকৃত অর্থে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যবসায়ীদের চেহারাটাই দেখতে পান। অসহায় বোধ করেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে, ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে, এসব কিন্তু নতুন কোনো সংবাদও নয়। কিন্তু তারপরও এ-জাতীয় ঘটনার অবসান ঘটেনি। চিকিৎসাসেবা সর্বসাধারণের নাগালে এসে পৌঁছায়নি। বরং চিকিৎসাসেবা পাওয়া ব্যয়বহুল, যেখানে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রতিনিয়ত নিভে যায়।

ঘটনায় ফিরে আসা যাক। দুর্ঘটনায় আমার এক আত্মীয়র মারাত্মকভাবে ব্রেন ইনজুরি হয়। বাইক থেকে পড়ে যান এবং চুল আটকানো ক্লিপটা তাঁর মগজে ঢুকে যায়। তিনি মেহেরপুরে বসবাস করেন। দুর্ঘটনা সেখানেই। দ্রুত কুষ্টিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ঘোরাঘুরি চলে, চিকিৎসা চলে না। তাঁকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা সেসব হাসপাতালে নেই। এমনকি চিকিৎসকও নেই।

তাঁকে ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ঢাকার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। ব্রেনের সিটি স্ক্যান করা হয়। জখম ভয়াবহ রকমের। আইসিইউতে সিট নেই বলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেহেতু রোগীর লাইফ সাপোর্ট লাগবে। এ রকম কথা এর আগেও শোনা গেছে যে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে সহজে সিট পাওয়া যায় না। কিন্তু রাতের আঁধারে কোথায় যাবে?

স্বজন ও পরিজনদের কেউ পরামর্শ দিল যে পান্থপথে একটা স্পেশালাইজড হাসপাতাল আছে। সেখানে আইসিইউতে সিট পাওয়া যেতে পারে। কালবিলম্ব না করে সেখানে ছোটা হয় রোগী নিয়ে। সেখানকার নিউরো ডাক্তার দেখলেন। ভর্তি করিয়ে নিলেন। স্বজনদের বললেন, দ্রুত সার্জারি করতে হবে।

আমি যখন খবর পেলাম তখন মধ্যরাত। স্বজনেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না যে তাঁরা কী করবেন। মধ্যরাতে দুজন নিউরোসার্জনের সঙ্গে কথা হলো। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলাম। একজন সরাসরি বললেন, এই রোগী বাঁচবে না। আরেকজন বললেন, চেষ্টা করা যায়। তবে এই মুহূর্তে সার্জারি নয়। সেই তথ্য জানিয়ে দিলাম রোগীর আত্মীয়দের। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হলো।

ছুটলাম সেই স্পেশালাইজড হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক এলেন। তাঁর কাছ থেকে রোগীর সার্বিক অবস্থা জানতে চাওয়া হলো। কিন্তু তিনি বড় ডাক্তারের কথা বললেন, যেখান থেকে সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানা সম্ভব। বড় ডাক্তার এলেন। বয়সে খুব একটা বড় মনে হলো না। জানা গেল তিনি এখানকার একজন নিউরোসার্জন। তাঁর আন্ডারেই রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। রোগীর অবস্থা সম্পর্কে সব জানার পর বললাম, আরও দু-চারজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না। নিজের পরিচিত চিকিৎসকদের কথা বললাম। তিনি সেই দিকে গেলেন না। বললেন, সিরিয়াস পেশেন্ট। গতকাল রাতেই তিনি সার্জারি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বজনদের সাড়া না পেয়ে তিনি সার্জারি করেননি। আরও বললেন, এখন সিটি স্ক্যান করলে দেখা যাবে আরও ক্ষতি হয়ে গেছে। চিন্তায় পড়ে বললাম, প্লিজ তাড়াতাড়ি সিটি স্ক্যান করান। তিনি মুখটা ছোট করে বললেন, ‘আমাদের হাসপাতালের অনেক লিমিটেশন আছে। সিটি স্ক্যান, এমআরআই মেশিন নেই।’

চেয়ারে বসে থাকা আর সম্ভব হলো না। এতটা বিস্মিত হলাম যে আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ল। ‘বলেন কী! তাহলে এত বড় সার্জারি কিসের ওপর ভিত্তি করে করতেন!’

স্বজনেরা সবাই আমার দিকে চেয়ে আছেন। কত অসহায় চেহারাগুলো। একটা নির্ভরযোগ্য চেষ্টা দরকার। ডাক্তারকে ধন্যবাদ দেওয়া হলো, সত্যটা অকপটে বলার কারণে। দ্রুত অন্য হাসপাতালে রোগী শিফট করা হলো। সেখানে একপর্যায়ে সার্জারি হলো। আজ প্রায় ২৭ দিন রোগীর জ্ঞান ফেরেনি। তবে তাঁকে লাইফ সাপোর্ট থেকে কেবিনে নেওয়া হয়েছে। জ্ঞান না ফিরলেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে তা খুব ধীরগতিতে। বলা যায়, জিরো থেকে রোগীকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ২৭ দিন পর্যন্ত হাসপাতালের বিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা ক্রস করেছে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলছে তাঁকে ফিরে পাওয়ার তীব্র তাড়নায়। সন্তানেরা চায়, মা সুস্থতায় ফিরে আসুক। যদিও চিকিৎসক বলেছেন, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যাবে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সময়ের ব্যাপার।

২.

ওপরের ঘটনার তিনটি অংশ। এক. সরকারি হাসপাতালগুলোকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য সরকারের একটা মন্ত্রণালয় আছে, আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অথচ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো ইকুইপমেন্ট নেই। থাকলেও দক্ষ লোকের অভাবে অব্যবহৃত থেকে সেসব যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর আমরা দেখি, স্বাস্থ্য খাতে প্রচুর অর্থ বাজেটে রাখা হয়। সরকারি হাসপাতালের করুণ দশার বর্ণনা প্রায়ই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয় না।

দুই. যেনতেনভাবে হাসপাতাল গড়ে উঠছে, যেখানে রোগীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা নেই, অথচ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। হাসপাতালে সিটি স্ক্যান মেশিন নেই, নেই এমআরআই মেশিন। অথচ ব্রেন অপারেশন করবার মতো ঘটনা ঘটিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। গবেষণা করলে দেখা যাবে যে এ রকম হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর হার বেশি। কেউ এদের দেখে না, দেখবার প্রয়োজন বোধ করে কি না, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়।

তিন. যে রোগীর চিকিৎসার ব্যয়ের কথা বললাম, তাঁর পরিবারের পক্ষে এদিক-ওদিক থেকে ব্যবস্থা করে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও কতটা সাধারণ পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব? আমি তো মনে করি, আমারও সেই সক্ষমতা নেই। এককথায়, বাংলাদেশে চিকিৎসা পাওয়াটা সর্বসাধারণের অনেকটাই নাগালের বাইরে চলে গেছে। সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হলেও জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে তা একেবারেই অসম্ভব। এমতাবস্থায় চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে অনেকেই চিকিৎসা পরামর্শ নিয়ে থাকেন। শরীরের সুস্থতার প্রতি মনোযোগ কমে যাচ্ছে। এই বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে এবং গভীরভাবে অনুধাবন না করলে এ দেশের সাধারণ মানুষ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে বরণ করতে একদিন অভ্যস্ত হবে। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ একদিন স্বাভাবিক ঘটনায় রূপান্তরিত হবে।

৩.

আরেকটা বিষয় উল্লেখ করতে হয়। দেখা গেছে, রোগীর জটিল অবস্থার চিকিৎসার পাশাপাশি তার বিল যেভাবে বাড়তে থাকে, আকাশছোঁয়ার মতো হয়, তার একটা প্রভাব পড়ে রোগীর স্বজনদের ওপর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পলিসির দোহাইতে রোগীর স্বজনকে এক দিন পরপর টাকা পরিশোধের চাপ দিতে থাকে। এতে রোগীর পাশে না থেকে স্বজনদের ছুটতে হয় টাকা জোগাড়ের পেছনে। কী আজব একটা অবস্থা! এটা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত না হওয়ার কারণে বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠছে ইচ্ছেমতো। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরাই প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী দেখছেন। সরকারি হাসপাতালের চেয়ে প্রাইভেট বা বেসরকারি হাসপাতালের প্রতি তাঁদের দায় ও দায়িত্ব বেশি। এর পেছনকার কারণ সহজেই অনুমেয়। একজন বলছিলেন যে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ মালিক হলেন চিকিৎসক নিজেরাই। তাঁদের শেয়ারে নাকি প্রাইভেট হাসপাতাল চলে।

সত্য-মিথ্যা যেটাই হোক, সরকারের এ বিষয়ে বিচক্ষণ হস্তক্ষেপ জরুরি। যাঁরা সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, তাঁরা কোনোভাবেই যেন প্রাইভেট হাসপাতালে যুক্ত হতে না পারেন। অবসর গ্রহণের পরই কেবল প্রাইভেট হাসপাতালে যুক্ত হবেন। আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ যেন স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নিয়ে কোনো রকম ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হতে পারেন, তার জন্য একটা নির্দলীয় নিরপেক্ষ কমিটি বা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যত্রতত্র হাসপাতাল গড়ে ওঠা, যার উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা নেই, নেই দক্ষ চিকিৎসক বা জনবল, এমন হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে অনুমতি দেয়, তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনমনে অনেক শঙ্কা, সংশয়। এককথায়, চিকিৎসা মানেই রীতিমতো আতঙ্ক। রোগী সুস্থ হবে কি না, সেই চিন্তারও বড় চিন্তা—চিকিৎসার টাকা জোগাড় হবে কীভাবে। মৃত্যু অবধারিত একটি বিষয় হলেও তার স্বাভাবিকতা জনগণের প্রত্যাশা, অধিকার তো বটেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ক্ষমতাসীন ও বিত্তবানেরা চিকিৎসার প্রশ্নে বিদেশে যান। ফলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মনোনিবেশ করতে বাধ্য হন না তাঁরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত