Ajker Patrika

পাউরুটি

সম্পাদকীয়
পাউরুটি

শহীদ শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবি ভাষা থেকে। যিনি সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে প্রাণ দেন, তিনিই শহীদ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁরা তো শহীদ বটেই, নব্বই কিংবা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদেরও শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাউরুটি খেতে গিয়ে কারও মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার কি তাঁকে শহীদ হিসেবে দাবি করতে পারে? ‘শহীদ’ শব্দটি কি এতই সস্তা হয়ে গেল?

৩ আগস্ট আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত এমনই একটি সংবাদ পড়লে খানিক অবাক হতে হয়। বগুড়া শহরের ঘটনা। এই ঘটনার মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ঝাউতলা এলাকায় মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন রিপন ফকির। অভিযোগটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০৪ জনকে আসামি করা হয়। কিন্তু তদন্তে ২২ জন সাক্ষীর বক্তব্য, স্থানীয় তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। বরং অধিকাংশ সাক্ষ্য বলছে, রিপন ফকির পাউরুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। একটি পাউরুটি তাঁর ‘শহীদ’ খেতাব আটকে দিল!

সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো, নিহতের স্ত্রী নিজেই বলেছেন, গ্রামের কয়েকজনের পরামর্শে তিনি মামলা করেছিলেন। তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, এভাবে মামলা করলে তাঁর স্বামীকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে এবং সরকারি অনুদানও পাওয়া যেতে পারে। এ কথা জানার পর এটিকে শুধু একটি মিথ্যা মামলার ঘটনা বলা যাবে না; এটাও বলতে হবে যে ব্যক্তিগত লাভের আশায় একটি মৃত্যুকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার ভয়ংকর প্রবণতার প্রকাশ। রিপনের স্ত্রী অন্যের পরামর্শে সরলমনে নাকি লোভে পড়ে মিথ্যা মামলা সাজাতে পারলেন, তা দুশ্চিন্তার বিষয় বটে। তবে এর চেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, যারা তাঁকে কুপরামর্শ দিয়ে মামলা করাল, তারা নিশ্চয়ই নৈতিক অবক্ষয়ের মানদণ্ডে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে!

যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবেগ, প্রতিশোধ বা সুযোগসন্ধানী মনোভাব কাজে লাগিয়ে মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু প্রতিটি ভিত্তিহীন মামলা প্রকৃত অপরাধের বিচারকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে নির্দোষ ব্যক্তিদের সামাজিক, মানসিক ও আইনি হয়রানির মুখে ঠেলে দেয়। বিচারব্যবস্থার মূল্যবান সময় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদও অপচয় হয়।

এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে তদন্তের আগেই যাচাই-বাছাই ছাড়া গুরুতর অভিযোগ গ্রহণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা সাজান বা অন্যকে প্ররোচিত করেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার স্বচ্ছ নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ মিথ্যা পরিচয়ের আশ্রয় নিতে উৎসাহিত না হন।

রাজনৈতিক পরিচয় বা আবেগ নয়, প্রমাণই হবে বিচারপ্রক্রিয়ার একমাত্র ভিত্তি—এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা গেলে ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত