Ajker Patrika

যে অভ্যাস পরিবর্তনে অর্থের প্রয়োজন নেই

আব্দুর রাজ্জাক প্রকৌশলী
যে অভ্যাস পরিবর্তনে অর্থের প্রয়োজন নেই
আমাদের দেশের জনগণ ট্রাফিক আইন সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আমাদের কিছু কিছু অভ্যাস এমনভাবে মনের মধ্যে গেঁথে গেছে, এটা থেকে আমরা বের হতে পারছি না। অভ্যাসগুলো আইনত দণ্ডনীয়, নিজেদের জন্য অনেক সময় প্রাণঘাতীও বটে। আসলে এগুলো অভ্যাস নয়, এগুলো বদভ্যাস, প্রতিনিয়ত সারা দেশে চলছে। বদভ্যাসের সঙ্গে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি জড়িত। এইসব বদভ্যাসকে এখন আর আমরা কিছু মনে করি না! ছাত্রজীবনে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতাম, ‘তুই ভালো হয়ে যা, ভালো হইতে পয়সা লাগে না’। এখন বলব কিছু বদভ্যাসের কথা, যা থেকে মুক্তি পেতে কোনো অর্থের দরকার হয় না।

আমি যে এলাকায় থাকি সেই এলাকায় বেশ কয়েকটি স্কুল আছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের তাদের মায়েরা স্কুলে নিয়ে আসেন, আবার ছুটির পরে স্কুল থেকে নিয়ে যান। অতি ব্যস্ত একটি রাস্তা পারাপার করে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা যাতায়াত করে অভিভাবকদের সঙ্গে। ওই রাস্তায় দ্রুতগতির যান যেভাবে আসা-যাওয়া করে, যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমার জানা মতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছেও। অথচ স্কুলের সঙ্গেই ওই রাস্তা পারাপারের জন্য একটি ফুটওভারব্রিজ আছে। সেটি কেউ ব্যবহার করে না। ফুটওভারব্রিজে ওঠাকে কি তারা আনস্মার্ট মনে করে?

বেশ কয়েক বছর আগে, কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে এ রকম এক মা ছুটির পরে বাচ্চা নিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় দুর্ঘটনা করেন, বাচ্চাটা মারা যায়। অনেক আন্দোলন হলো, বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর হলো। অথচ স্কুলের সামনেই ফুটওভারব্রিজ ছিল, এটা নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। কেননা, আমরা প্রায় সবাই কোনো আইনের ধার ধারি না, ফুটওভারব্রিজে উঠতে চাই না, হাত উঁচু করে পারাপারে অভ্যস্ত। সেই দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছিল, চালক জেলে গিয়েছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যে মামলা খালাস—আইনের চোখে চালকের কোনো দোষ নেই, সেটা প্রমাণিত হয়েছে।

অনেক জায়গায় রাস্তার ডিভাইডার আছে। ডিভাইডার সংযুক্ত করে সেখানে ৫ ফুট উঁচু লোহার বেড়া দেওয়া আছে। ১০০ বা ২০০ মিটার পরপর ওই লোহার বেড়ার দু-তিনটা ভাঙা! ওই ভাঙা স্থান দিয়ে নির্বিঘ্নে মানুষজন পারাপার হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো আইন হচ্ছে না, আইনের কঠোরতাও নেই।

আমি কয়েক দিন জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে আসলে ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলারসহ অন্যান্য যানবাহন একটু দ্রুতগতিতে চলে যায়, মনে করে যদি এই সময় কেউ রাস্তা পারাপার হয়, তাহলে তার পাঁচ সেকেন্ড সময় নষ্ট হবে। তাই জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে এলে স্পিড বাড়িয়ে দেন। আমাদের নাগরিক সচেতনতা শূন্যের কোঠায়। যদি কেউ সচেতনভাবে সবকিছু মেনে চলে, তাকে আমরা বলি আঁতেল অথবা আনকালচার্ড!

কিছুদিন আগে ঘোষণা হলো, এআই ক্যামেরা ব্যবহার করে ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে। বড় বড় কয়েকটি রাস্তায় আপাতত এই প্রযুক্তি থাকলেও এখনো বেশির ভাগ রাস্তা এআই ক্যামেরার আওতায় আসেনি। আবার ব্যাটারিচালিত রিকশা ওই সব রাস্তা দিয়েই চলছে। তারা ওটা মানে না, কেননা তাদের কোনো নম্বরপ্লেট নেই।

আমি টোকিওতে একবার দেখেছি রাস্তায় লাল বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি কুকুর দাঁড়িয়ে গেল। আমি আশ্চর্য হয়ে ব্যাপারটি দেখছিলাম। বেশ কয়েক মাস আগে আমি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছিলাম। তারপরও হাত জাগিয়ে পারাপার হতেই ব্যাটারিচালিত রিকশা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। আমার ডান হাতের দুটো হাড় ভেঙে গেল। রিকশাচালককে সবাই ধরল, তাঁর রিকশার ব্রেক কাজ করেনি বলে স্বীকার করলেন। ১৭ দিন হাসপাতালে থেকে দেখেছি হাত-পা ভাঙার যত রোগী আসে, সবাই এই রকম ব্যাটারিচালিত রিকশা বা সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার অথবা মোটরসাইকেলে আহত মানুষ। সবাই এই রকম অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার শিকার। এখানে পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা একটু সচেতন হলে প্রতিদিন কয়েক শ লোক দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচতে পারত।

কয়েক বছর আগে ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে মারা হলো। দেখা গেল, এক নারী সন্দেহবশত অন্য নারীকে ‘ছেলেধরা’ আখ্যা দিয়ে তাঁর জীবনটাই কেড়ে নিলেন। এ রকম বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন শহরে যদি কোনো গুজব ছড়ায়—এটা ছেলেধরা, এটা পকেটমার, এটা চোর—সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাকে গণধোলাই দিই। অনেক সময় আবার কোনো যানবাহনের চালকের দোষ থাকে না, পথচারীর দোষেই দুর্ঘটনা হয়, তবু চালককেই আমরা ধরে ধোলাই দিই। এমনকি গণধোলাই দিয়ে মেরেও ফেলি। এ রকমই চলছে, সমাজ পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই।

অনেক সময় গাড়ির হর্ন এত জোরে বাজানো হয় যে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়। হাসপাতাল অথবা স্কুল এলাকাগুলোতে হর্ন বাজানো নিষেধ করে বিজ্ঞপ্তি দিলেও আমাদের চালকেরা ওসব তোয়াক্কা করেন না। শব্দদূষণ যে কতটা মারাত্মক, সে ব্যাপারে আমরা কেউই কিছু জানি না। এই সচেতনতা আমাদের এখনো গড়ে ওঠেনি যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ ছেড়ে দিতে হবে। বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশু যখন পারাপার হয়, তখন তাদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করতে হবে—এসবের কোনো সচেতনতা আমাদের একেবারেই নেই বললেই চলে।

যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক আইন শেখান এবং অন্যদেরও শেখাতে বলেন ট্রাফিক আইন মেনে রাস্তা পারাপার হতে, ফুটওভারব্রিজ থাকলে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে, তাহলে কিন্তু অনেক ছেলেমেয়েই তাদের অভিভাবক এবং আশপাশের মানুষকে সচেতন করতে পারবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা নিশ্চয়ই সবাই শুনবে।

আমাদের জাতীয় জীবনে জনসচেতনতা কত যে দরকার, আমাদের সংস্কৃতির কত যে পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটা অনুভব করার ক্ষমতাও আমাদের নেই। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যদি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনসচেতনতার ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রতিদিন একটা ক্লাসে পাঁচ মিনিট এ রকম জনসচেতনতার কথা বলতে বলেন, তাহলে ছাত্রজীবন থেকেই শিক্ষার্থীরা নিয়মকানুন মানা শুরু করবে। তাহলে ধীরে ধীরে একদিন আমাদের বদভ্যাসগুলোও পরিবর্তন করা যাবে।

আমি পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশে পড়াশোনা করেছি। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ওই সব দেশের স্কুলগুলোতে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও জাতিগত কৃষ্টি-কালচার, জনসচেতনতা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করা হয়। সেভাবেই তারা বেড়ে ওঠে, সেভাবেই তারা নিজের জীবনকে পরিচালনা করার চেষ্টা করে। আমরাও যেন নিজেদের মতো করে, আমাদের বদভ্যাসের পরিবর্তন করে নিজেরা সচেতন হই, নিজেরা যেন ভালোভাবে বাঁচি, দুর্ঘটনার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে অপরকে বাঁচতে সচেতন করি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত