Ajker Patrika

সার্জিও গরের সফর প্রশ্ন, কূটনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা

চিররঞ্জন সরকার, কলাম লেখক
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০৬
সার্জিও গরের সফর প্রশ্ন, কূটনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ছবি: পিএমও

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের ঢাকা সফর কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়নি। সার্জিও গরের সম্মানে আয়োজনের কথা থাকলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়নি। এসব পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের বয়স মাত্র পাঁচ মাস। কিন্তু এরই মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফর কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও জল্পনারও জন্ম দিচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেন এখন কূটনীতির চেয়ে রহস্যের আবরণেই বেশি আলোচিত হচ্ছে। বৈঠক হয়, ছবি তোলা হয়, করমর্দন হয়; এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এমনভাবে নীরব থাকেন, যেন আলোচনার সবকিছুই রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার অন্তর্ভুক্ত। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রায়ই শোনা যায়—‘এটি আলোচনা হয়নি’, ‘ওটি আলোচনায় আসেনি’। যদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় না-ই আসে, তাহলে দীর্ঘ বৈঠকের মূল আলোচ্য কী ছিল—এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। কূটনীতিতে নীরবতা অবশ্যই একটি স্বীকৃত ভাষা। কিন্তু সেই নীরবতা যদি নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতে শুরু করে অনুমান, গুজব ও ব্যাখ্যার রাজনীতি।

সার্জিও গরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের দীর্ঘ বৈঠকটিও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে বৈঠকটি হওয়া এবং এর কারণে কক্সবাজার সফরের সময়সূচি পরিবর্তিত হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। যদিও বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবু ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি কখনোই কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় না।

এই ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক বাস্তবতাকেও সামনে আনে। কোনো রাষ্ট্র তার অংশীদার বা সহযোগী নির্বাচন করে আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। যে সরকার ভারতের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর বলে বিবেচিত হবে, ভারত স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে কাজ করবে। একই যুক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি ঐতিহাসিকভাবে ছিল ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান, ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কোনো একক শক্তির কৌশলগত বলয়ে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই ছিল সেই নীতির ভিত্তি। এই নীতির বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; তবে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি মতভেদ নেই।

পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা খেলোয়াড়ের মতো। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে চীন, আর মাঝখানে ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি। এখানে ভারসাম্য হারানোর মূল্য শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তি নয়; কখনো কখনো একটি রাষ্ট্র অন্যের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।

মনে রাখতে হবে, বড় শক্তিগুলো মূলত স্থায়ী বন্ধুত্ব নয়, স্থায়ী স্বার্থের ভিত্তিতেই সম্পর্ক পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থের ধারাবাহিকতাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই ভারসাম্যের অবস্থান কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই চীন সফর করেছেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের সফর ঘিরে যে অস্বাভাবিকতা বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

এসব ঘটনার ভিত্তিতে অনেকেই দ্রুত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন যে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, কিংবা বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নীরব সমঝোতা গড়ে উঠছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষণে অনুমানকে তথ্যের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।

ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট। তবে এ ধরনের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিটি বিশ্লেষণকে যেমন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতির প্রতিফলন হিসেবে ধরা যায় না, তেমনি সব প্রতিবেদনকেই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়াও সমীচীন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অনেক সময় গণমাধ্যম বিভিন্ন সূত্র, কৌশলগত মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে এমন তথ্য প্রকাশ করে, যা নীতিনির্ধারণী আলোচনার ইঙ্গিত বহন করতে পারে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই তা কেবল বিশ্লেষণ বা অনুমানের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে।

তবে এটিও বাস্তবতা যে বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসর নয়। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, আঞ্চলিক সংযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে দেশটি এখন বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ ওয়াশিংটন, নয়াদিল্লি, বেইজিংসহ অন্যান্য শক্তি নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে।

বর্তমান সরকারের সামনে সেই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি মেরুকৃত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এখানেই উদ্বেগের জায়গা। যদি পররাষ্ট্রনীতি সংসদ, জনগণ এবং এমনকি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও ক্রমেই অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তাহলে তথ্যের শূন্যস্থান গুজব দিয়ে পূরণ হতে শুরু করে। রাষ্ট্রের জন্য এটি কখনোই ইতিবাচক নয়।

আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। বাংলাদেশে প্রায়ই পররাষ্ট্রনীতিকে দলীয় রাজনীতির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়। একটি দল ক্ষমতায় থাকলে বলা হয় তারা ভারতের ঘনিষ্ঠ; অন্য দল এলে বলা হয় তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ; আবার কাউকে চীনের ঘনিষ্ঠ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। অথচ বাস্তব রাষ্ট্রনীতি এত সরল নয়। কোনো দায়িত্বশীল সরকারই কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রতিটি রাষ্ট্রকেই বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।

সার্জিও গরের সফর নিয়ে সরকার যদি মনে করে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, তাহলে সেই স্বাভাবিকতার ব্যাখ্যাও জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি গোপন বিষয় নয়। নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য ব্যতীত জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অস্পষ্টতা যত বাড়বে, ততই জল্পনাকল্পনা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিস্তার ঘটবে।

আমাদের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত প্রবণতা রয়েছে। ক্ষমতায় থাকলে কাউকে বিদেশি শক্তির ঘনিষ্ঠ বলে অভিযুক্ত করা হয়; ক্ষমতা হারালে তিনিই জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকাগুলো বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষ্য প্রায় একই থেকে যায়।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নীতিগত স্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐকমত্য। কোনো বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের স্থায়ী বন্ধু নয়, আবার স্থায়ী শত্রুও নয়। স্থায়ী বিষয় একটাই—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।

আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই সার্জিও গরের সফরে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, সেটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখনো কি সুস্পষ্টভাবে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়ায় ক্রমেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে?

রাষ্ট্র যদি এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিদেশি সফরের চেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে নীরবতা। আর কূটনীতিতে নীরবতা কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। তবে সেই নীরবতা যদি অতিরিক্ত দীর্ঘ হয়, তাহলে সত্য, গুজব ও প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।

পররাষ্ট্রনীতি আতশবাজির প্রদর্শনী নয়, যেখানে কেবল দৃশ্যমানতা অর্জনই উদ্দেশ্য। এটি অনেকটা সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মতো—যেখানে দক্ষতা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজনীয় মাত্রায় জবাবদিহিও অপরিহার্য। কারণ, রাষ্ট্র যদি নিজের নাগরিকদের কাছেই তার কূটনৈতিক অবস্থান ও অগ্রাধিকারের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দিতে না পারে, তাহলে একসময় আনুষ্ঠানিক নীতির চেয়ে অনানুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাই বেশি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। সেটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শক্তির নয়, বরং রাষ্ট্রীয় যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতারই ইঙ্গিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত