নাসিম শামসুজ্জোহা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন; তিনি একটি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল—যে অধ্যায় ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গভীর মেরুকরণ, সংগ্রাম ও বিতর্কে পরিপূর্ণ। রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে তিনি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরেও তাঁর নির্ধারক ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে দুজন নারী রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছেছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের একজন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার বহন করে তিনি বিএনপির নেতৃত্বে আসেন এবং তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় রাজনীতির পথে ফেরার আন্দোলন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের অংশ।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন কখনোই কেবল সাফল্যমণ্ডিত ছিল না, ছিল সংঘাতেরও ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁর সময়ে ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শত্রুতায় রূপ নেয়। সংসদ বর্জন, রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলন, অবিশ্বাস ও অনাস্থার রাজনীতি—এসবের দায় যেমন এককভাবে তাঁর নয়, তেমনি তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনীতিও এই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই রাজনীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত দেশকে সামনে এগোতে যেমন ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি তাঁর শাসনামলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সহিংস রাজনীতির অভিযোগও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে তাই মূল্যায়ন কখনোই একমাত্রিক হতে পারে না। গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াই যেমন স্মরণযোগ্য, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও অস্বীকার করা যায় না।
খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘ অসুস্থতা, রাজনৈতিক মামলায় দণ্ড, কারাবাস ও চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব তাঁকে রাজনীতির সক্রিয় মঞ্চ থেকে অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই অধ্যায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্র, আইন ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। অসুস্থ রাজনীতিকের চিকিৎসা ও মর্যাদার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটা পালন করা হয়েছিল—এই বিতর্ক ভবিষ্যতেও আলোচিত হবে।
তাঁর মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি গভীর অনাস্থা ও মেরুকরণের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর জীবন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলায় পরিণত হয়, তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর ব্যক্তি রাজনীতিকেরা একা হয়ে পড়েন। শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সহনশীলতা ও নিয়মতান্ত্রিকতার চর্চা থেকে।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা। সেই শিক্ষা হলো—ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি; প্রতিপক্ষ নয়, গণতন্ত্রই হওয়া উচিত রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য; আর রাজনীতিকের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মানবিক মানদণ্ডের সঙ্গেই জড়িত।
একজন রাজনীতিক চলে যান, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো থেকে যায়। খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনীতি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে হাজির করবে। বাংলাদেশ কি ভবিষ্যতে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে যাবে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশে শত্রুতা নয়, বরং গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হতে পারে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে ইতিহাসের চূড়ান্ত রায়।
নাসিম শামসুজ্জোহা, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন; তিনি একটি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল—যে অধ্যায় ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গভীর মেরুকরণ, সংগ্রাম ও বিতর্কে পরিপূর্ণ। রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে তিনি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরেও তাঁর নির্ধারক ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে দুজন নারী রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছেছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের একজন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার বহন করে তিনি বিএনপির নেতৃত্বে আসেন এবং তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় রাজনীতির পথে ফেরার আন্দোলন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের অংশ।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন কখনোই কেবল সাফল্যমণ্ডিত ছিল না, ছিল সংঘাতেরও ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁর সময়ে ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শত্রুতায় রূপ নেয়। সংসদ বর্জন, রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলন, অবিশ্বাস ও অনাস্থার রাজনীতি—এসবের দায় যেমন এককভাবে তাঁর নয়, তেমনি তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনীতিও এই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই রাজনীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত দেশকে সামনে এগোতে যেমন ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি তাঁর শাসনামলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সহিংস রাজনীতির অভিযোগও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে তাই মূল্যায়ন কখনোই একমাত্রিক হতে পারে না। গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াই যেমন স্মরণযোগ্য, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও অস্বীকার করা যায় না।
খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘ অসুস্থতা, রাজনৈতিক মামলায় দণ্ড, কারাবাস ও চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব তাঁকে রাজনীতির সক্রিয় মঞ্চ থেকে অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই অধ্যায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্র, আইন ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। অসুস্থ রাজনীতিকের চিকিৎসা ও মর্যাদার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটা পালন করা হয়েছিল—এই বিতর্ক ভবিষ্যতেও আলোচিত হবে।
তাঁর মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি গভীর অনাস্থা ও মেরুকরণের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর জীবন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলায় পরিণত হয়, তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর ব্যক্তি রাজনীতিকেরা একা হয়ে পড়েন। শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সহনশীলতা ও নিয়মতান্ত্রিকতার চর্চা থেকে।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা। সেই শিক্ষা হলো—ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি; প্রতিপক্ষ নয়, গণতন্ত্রই হওয়া উচিত রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য; আর রাজনীতিকের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মানবিক মানদণ্ডের সঙ্গেই জড়িত।
একজন রাজনীতিক চলে যান, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো থেকে যায়। খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনীতি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে হাজির করবে। বাংলাদেশ কি ভবিষ্যতে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে যাবে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশে শত্রুতা নয়, বরং গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হতে পারে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে ইতিহাসের চূড়ান্ত রায়।
নাসিম শামসুজ্জোহা, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে আমাদের অতীতকে মোটেই সুখের কিংবা স্বস্তির বলা যায় না। প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধিরও নয়। ১৯৭১ সালে সংঘটিত সর্বাত্মক সশস্ত্র জনযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, ৫৪ বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক থেকেই গেছে।
১ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতির যেমন কোনো বড় সাফল্যের বছর ছিল না, তেমনি সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের বছরও ছিল না। বছরটি ছিল অনেকটা স্রোতোবহা নদীর মাঝখানে ভেসে থাকা নৌকার মতো, যেখানে পেছনে প্রবল চাপ আর সামনে অনিশ্চিত পথ।
১ ঘণ্টা আগে
আমাদের দেশেই ঘটে সম্ভবত এ রকম অর্বাচীন কর্মকাণ্ড, যেখানে কাণ্ডজ্ঞানের কোনো মাত্রা খুঁজে পাওয়া যায় না। স্কুলের কাছে যখন ইটভাটা চালু থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবে শিশুদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটবে। এটা জানার পরও দিব্যি চলছে ইটভাটার কার্যক্রম।
২ ঘণ্টা আগে
রাজনৈতিক হাওয়া উত্তপ্ত যখন, তখনই শীতের প্রকোপে বিহ্বল দেশ। দুদিন হালকা রোদ উঠলেও সূর্যের উত্তাপহীন হাড়কাঁপানো শীত এবার দেশের মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। সামনে নির্বাচন, তা নিয়েই ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু এই নির্বাচনী ব্যস্ততার মধ্যে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
১ দিন আগে