Ajker Patrika

শিক্ষা ও ধোঁয়া

সম্পাদকীয়
শিক্ষা ও ধোঁয়া

আমাদের দেশেই ঘটে সম্ভবত এ রকম অর্বাচীন কর্মকাণ্ড, যেখানে কাণ্ডজ্ঞানের কোনো মাত্রা খুঁজে পাওয়া যায় না। স্কুলের কাছে যখন ইটভাটা চালু থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবে শিশুদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটবে। এটা জানার পরও দিব্যি চলছে ইটভাটার কার্যক্রম। নওগাঁর মান্দা উপজেলার নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে সাবাইহাট এলাকার ঝাঁঝরের মোড়ে যমুনা ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা অবস্থিত। এর মাত্র ২৫০ মিটার দূরে রয়েছে একরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একরুখী উচ্চবিদ্যালয় এবং এর আশপাশে রয়েছে আবাসিক এলাকা ও দুটি আমবাগান।

দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর ফুসফুস আজ কয়লা আর কাঠের ধোঁয়ায় বিষাক্ত হচ্ছে, যা কেবল অমানবিক নয়, বরং প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন। ২০১৩ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আবাসিক এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ এই ভাটাটি এক কিলোমিটার তো দূরের কথা, মাত্র ২৫০ মিটারের মধ্যে থেকে এর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ২০ বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এই অবৈধ কার্যক্রম কীভাবে চলতে পারে? স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই স্থায়ী চিমনির মাধ্যমে ইটভাটাটি পরিচালিত হচ্ছে। আর কয়লার সঙ্গে কাঠ পোড়ানো পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এতে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুরা শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের বদলে তারা গ্রহণ করছে বিষবাষ্প। একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসরুমে বসে স্বচ্ছন্দে শ্বাস নিতে পারে না, তখন সেখানে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে কথা বলাও বিলাসিতা। এটি স্পষ্টতই শিশুদের জীবন ও সুস্থ বিকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্য হলো, ইটভাটাটি সম্প্রতি ট্রেড লাইসেন্স পেয়েছে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পায়, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভাটামালিকের বক্তব্য হলো, তিনি আগামী বছর থেকে ব্যবসা করবেন না।

এই আশ্বাস দেওয়াটা কেবল কালক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে আইনি প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের দোহাই দিয়ে চলে না।

আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। যাদের আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তাদের অবহেলার কারণে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। এই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে সমাজের কিছু অর্থলোভী মানুষ এ রকম অপকর্ম করে যাচ্ছে।

আমরা মনে করি, শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো সুযোগ নেই। উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত অবিলম্বে সরেজমিন তদন্ত করে ইটভাটাটি বন্ধ করে দেওয়া। শুধু ‘যমুনা ব্রিকস’ নয়, সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

শৈশবকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। প্রশাসনের সক্রিয় পদক্ষেপই পারে এই পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত