দিন যত যাচ্ছে, অর্থনীতিতে চলমান মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিপরীতমুখী লক্ষ্যে টানাপোড়েন ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার। একই অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশের। ইতিমধ্যেই চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক বা তিন মাস পার হয়েছে। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে অর্থনীতির গতি বাড়ানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তার কাছেই পৌঁছানো যাচ্ছে না। সেখানে ঊর্ধ্বগতির মূল্যস্ফীতি প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এবার লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছাতে হলে বাকি ৯ মাসের মধ্যে অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যোগ করতে হবে। একই উৎসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখনো লক্ষ্যের চেয়ে মূল্যস্ফীতি ৮৪ বেসিস পয়েন্ট দূরে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছেন অর্থনীতির নীতিনির্ধারকেরা। কারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি পুরোপুরি শিথিল করলে আবার দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নীতি বেশি কড়াকড়ি থাকলে দেশের ভেতর বিনিয়োগ, বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদনে গতি ফেরানো কঠিন হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সূচকের ইতিবাচক অগ্রগতি ছাড়া লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধিও আসবে না। ফলে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির বিপরীতমুখী এই চাপের মধ্যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও সতর্ক হতেই হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, এই দুই লক্ষ্যের মাঝেই এখন নীতির বড় টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের খরচ বেশি রাখলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো কঠিন। এতে অর্থনীতি গতি হারাতে বাধ্য। আবার প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে দ্রুত সুদহার কমালে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়বে। এতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, যা ভোগব্যয়কে উসকে দিলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত টানা তিন মাস দেশে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিক কমেছিল। এরও আগে টানা আট মাসের ঊর্ধ্বগতির মূল্যস্ফীতির ধকল কাটিয়ে একটি স্বস্তির আভা দেখা যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বরে আবার মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
অবশ্য দেশে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই করছিল। এর পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী ও যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন—মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
আবার একই সময়ে দুর্বল শিল্প উৎপাদন, ধীর বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ও দুর্বল পিএমআই অর্থনীতির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডেও চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সেই সতর্কতারই প্রতিফলন দেখা গেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঘোষিত অক্টোবর-ডিসেম্বর মেয়াদি ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আগের ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর আগে চলতি বছর জুলাইয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর দেশে প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। যদিও তখন লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ, বেসরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো। তবে সরকারের এই প্রবৃদ্ধিমুখী চিন্তা শেষ পর্যন্ত দুই মাসের বেশি এগোতে পারেনি। প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি সুদহার নতুন করে কমানোর সিদ্ধান্তে যেতে অর্থনীতির বাস্তবতা সাহস জোগায়নি।
অর্থাৎ নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতিকে ধারাবাহিক গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনায় ভাটা পড়তে যাচ্ছে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির দৌড়ে। আর সেটি সবার আগে ধরা পড়েছে বেসরকারি ঋণে। অর্থনীতি এমন একটি বাস্তবতায় আবর্তিত হচ্ছে, যেখানে সরকার চায় অর্থনীতি গতিশীল হোক, প্রবৃদ্ধি বাড়ুক—অথচ সেই প্রবৃদ্ধির চালক ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ, কারখানা সম্প্রসারণের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। কারণ, তাদের মুনাফা খেয়ে ফেলছে ঊর্ধ্বগতির মূল্যস্ফীতি। যেখানে বিনিয়োগ সম্পর্কিত অন্য ঘাটতিগুলো আর এখানে ফোকাস হয়ে উঠছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুনে যা ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুলাইয়ে ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ নীতি সুদহার কমানোর পরও কিংবা আশানুরূপ না কমায় বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে ৫ শতাংশের নিচেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
আবার এখানে প্রবৃদ্ধির সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয় সরকারি ও বেসরকারি ঋণের তুলনায়। আগস্টে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণের প্রবাহ থাকলেও তার বড় অংশ যাচ্ছে সরকারের দিকে; ব্যবসা ও বিনিয়োগে ঋণের চাহিদা সেভাবে এখনো তৈরি হচ্ছে না। এমন অর্থনীতি চাঙা করতে সম্প্রতি ঘোষিত সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণেও বেসরকারি খাত থেকে খুব একটা আগ্রহপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এসবের পেছনেও নানা কারণ দায়ী।
অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য আগেই উচ্চ সুদহারের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁদের মতে, ১০ শতাংশ নীতি সুদহার দীর্ঘ সময় ধরে রাখার পরও মূল্যস্ফীতিতে যেহেতু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি; বরং একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়। চলতি বছর আগষ্ট ও সেপ্টেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির গড়হার ছিল ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, অথচ মূল্যস্ফীতির গড়হার ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বাড়ার গতি মূল্যস্ফীতির চেয়ে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় অসহিষ্ণু রকমের প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের বাজেটে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
অপ্রিয় সত্য এটাই—যেকোনো মূল্যে অর্থনীতিকে গতি দিতে হবে, যার পূর্বশর্ত হলো নীতিনির্ধারণে প্রবৃদ্ধি সহায়ক সব কর্মকাণ্ডের পথ সচল রাখা। কিন্তু সেটিও কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল নষ্ট করে নয়। আবার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা হলেও তার চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, কখনো কখনো এই প্রবৃদ্ধির চেয়ে বাজারে স্বস্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই অধিক গুরুত্ব বহন করে।
শাহ আলম খান, বাণিজ্য সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

সব জিনিসেরই যখন ইতরবিশেষ আছে, গণতন্ত্রেরই-বা থাকবে না কেন। আছে, গণতন্ত্রেরও বাড়তি-কমতি রয়েছে। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সে কথা এবং শুনেছিল সারা বিশ্ব। গণতন্ত্র যদি বাড়তির দিকে ঝুলে পড়ে, তখন ঘটনা কী ঘটে তার ছবি দিয়েছিলেন তিনি। ফল দাঁড়ায় সমকামিতা, নৈতিক অধঃপতন, বর্ণবিদ্বেষ, অর্থনৈতিক
১ ঘণ্টা আগে
একজন মধ্যবিত্ত মা বলছি। গল্পের শুরুটা আমার থেকেই। ২০২৩ সালে আমার ছেলের বয়স যখন প্রায় এক বছর, ফেসবুকের মায়েদের একটি গ্রুপে দেখলাম, রোটাভাইরাসে আক্রান্ত এক শিশু ডায়রিয়া আর পানিশূন্যতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। জানতে পারলাম যে শীতকালে এই ঝুঁকি বেশি, কিন্তু এর টিকা আছে।
১ ঘণ্টা আগে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়, গত শতকের আশি-নব্বই দশকের শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের সম্মান করত আর বর্তমানের শিক্ষার্থীদের দেখলে শিক্ষকেরাই কতটা আতঙ্কিত বোধ করেন। কৌতুকপূর্ণ হলেও এই ধরনের ভিডিও কিন্তু সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। তা না হলে শিক্ষার্থীর
২ ঘণ্টা আগে
সরকারি হাসপাতালে একটি চিকিৎসা যন্ত্র নষ্ট হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন রোগী—আবার কবে সেবা পাওয়া যাবে? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলেই সামনে আসে আরও কিছু জরুরি প্রশ্ন। যন্ত্রটি এখন কোথায়? কার দায়িত্বে রয়েছে? মেরামতের আবেদন কবে করা হয়েছে? সিদ্ধান্ত আটকে আছে কোন দপ্তরে? মেরামতের জন্য কত টাকা...
১৬ ঘণ্টা আগে