Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

স্থিতিশীলতা ফেরাতে জাতীয় ঐক্য দরকার

স্থিতিশীলতা ফেরাতে জাতীয় ঐক্য দরকার

জি এম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি লালমনিরহাট-৩ ও রংপুর-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সপ্তম, অষ্টম, নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন তিনি। সম্প্রতি দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই আন্দোলন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, জাতীয় পার্টির কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ১০

আপনাদের পার্টির কর্মকাণ্ড এখন কেমন চলছে?

জাতীয় পার্টি বর্তমানে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে যেকোনো গণমুখী কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দলের দেশব্যাপী যেসব উপজেলা ও জেলা কমিটি আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নতুন করে গঠন এবং পুনর্গঠনের কাজ চলছে। প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক টিম তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, যারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কমিটির সঙ্গে আলোচনা করছে। এ ছাড়া অনেকে নতুনভাবে দলে যোগদান করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা নিয়েও দল এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। সব মিলিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং গোছানোর কাজটা এই মুহূর্তে দলের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

আপনাদের পার্টি কেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল?

আমাদের দলকে কিন্তু নির্বাচনে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। শুরু থেকেই এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করা হয়নি, যাতে দল স্বাধীনভাবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচনের আগে যেখানেই মিটিং-মিছিল করতে যাওয়া হয়েছে, এমনকি সরকারের অনুমতি নিয়ে যাওয়ার পরও সেখানে বাধা দেওয়া হয়েছে—সরকারি পর্যায় থেকেও। আমাদের পার্টিকে যেভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে বলা হয়েছে, তা যেন ‘হাত-পা বেঁধে নদীতে সাঁতার কাটতে’ বলার মতো অবস্থা করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সরকারের মদদে আরেকটি গোষ্ঠী তৈরি করে লাঙ্গল প্রতীক দখলের জন্য মামলা করেছে। এবং এতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অনেকটা মদদ দেওয়ার ব্যাপার ছিল। এ কারণেই দল মনে করেছে, নির্বাচন থেকে সরে গেলে লাঙ্গল প্রতীক ওই গোষ্ঠীর হাতে চলে যাবে এবং দল ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই লাঙ্গল প্রতীক রক্ষার জন্য যেকোনো পরিবেশেই নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ছিল—নির্বাচনে অংশ না নিলে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার, যাকে মোটামুটি জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত সরকার বলা উচিত হবে, তাদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা হয়েছিল, নির্বাচন ঠিক সময়ে না হলে এবং কোনোভাবে নির্বাচন বানচাল হলে, তারা আরও চার-পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারত। যদি কোনোভাবে নির্বাচনপ্রক্রিয়া বিঘ্নিত করা যায়, তাহলে তারা এই মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেত। যেহেতু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ছিল না, আর যদি জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করত, তাহলে কোনো একটি অজুহাতে জামায়াত ও সমমনা শক্তি সরে দাঁড়ালে নির্বাচন একতরফা হয়ে পড়ত এবং তা স্থগিত হয়ে সরকারের মেয়াদ আরও দীর্ঘ হতে পারত। যেহেতু জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক উপস্থিতি প্রায় সব স্থানেই আছে এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তাই দলের উপস্থিতি নির্বাচনপ্রক্রিয়া চালু রাখার একটি নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করত। এই বিবেচনা থেকেই জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা দলের পক্ষ থেকে অতীব প্রয়োজনীয় মনে করা হয়।

নির্বাচন নিয়ে আপনাদের পার্টির মূল্যায়ন কী ছিল?

নির্বাচনের পরে একটি নির্বাচিত সরকার এলে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে দেশ উদ্ধার পাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনটি প্রকৃত অর্থে অবাধ হয়নি। সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি, ভোটারদের অবাধে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি এবং আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন দলের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি, অথচ অন্য দুটি জোটকে সরকারি প্রটোকলসহ পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রচারণা চালাতে দেওয়া হয়েছে। পুলিশি সহায়তায় তাদের মিটিং-মিছিল নির্বিঘ্নে হয়েছে। অথচ আমাদের দলের প্রচার কার্যক্রম এবং কর্মসূচিতে বারবার বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরও অনেক স্থানে দলের কর্মীরা সুরক্ষা পাননি।

দলের তিনজন প্রার্থীকে কারাগার থেকে নির্বাচন করতে হয়েছে; মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাঁদের জামিন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তাঁদের মধ্যে দুজন ভোট গণনার অর্ধেক পর্যায়ে অভিযোগ তোলেন যে কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন হলো, নির্বাচনে সমতাভিত্তিক পরিবেশ, যাকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলা হয়, সেটা এ নির্বাচনে কার্যকর ছিল না।

আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে আরও মূল্যায়ন হলো, নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত ছিল—ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করে ইচ্ছেমতো প্রার্থীদের হারানো-জেতানো হয়েছে এবং সুকৌশলে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে ছিটকে দিয়ে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই দাবির সমর্থনে আমি একটি হিসাব দিতে চাই। সেটা হলো, ঘোষিত ভোটের হার ছিল প্রায় ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যার অর্থ প্রায় ৭ কোটি ৫৯ লাখ ভোট পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সর্বোচ্চ দেড় থেকে দুই কোটি ভোট পড়েছে। বাকি সাড়ে ৫ কোটির মতো ভোট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।

আমার নির্বাচনী এলাকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ঘোষিত ভোটের হার অনুযায়ী প্রতিটি ভোটারকে গড়ে ৯৮ সেকেন্ডের মধ্যে ভোট দিতে হয়েছে। অথচ একটি ভোটপ্রক্রিয়ায় ছয়টি ধাপ থাকে—পরিচয় যাচাই, হাতে চিহ্ন দেওয়া, ব্যালট পেপারের জন্য স্বাক্ষর, গোপন কক্ষে গিয়ে সিল মারা, ভাঁজ করা এবং বাক্সে ফেলা। এই পুরো প্রক্রিয়া তিন-চার মিনিটের কম সময়ে সম্পন্ন হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এই হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে ভোট পড়ার হার হওয়া উচিত ছিল ২৬ থেকে ৩৪ শতাংশের মধ্যে এবং ভোটকেন্দ্রগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ভোট না পড়ার প্রমাণও রয়েছে। এই হিসাবে প্রকৃত ভোট পড়েছে মোট ভোটের ২০-৩০ শতাংশের মতো, বাকি ৭০-৮০ শতাংশ আগের রাতে বা নির্বাচনের দিন কৃত্রিমভাবে যোগ করা হয়েছে, তা আমাদের কাছে মনে হয়েছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া হয়েছিল এই আশায় যে একটি নির্বাচিত সরকার এলে ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তি মিলবে।

নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

নতুন সরকারের পাঁচ মাস পার হয়ে গেলেও একই ধরনের প্রবণতা অব্যাহত আছে। আমাদের দলের দুজন নেতা এখনো কারাগারে। বগুড়ার প্রার্থী শরিফুল হক জিন্না ভোটারদের ওপর হুমকি ও বাধার কারণে নির্বাচনের মাঝপথে সরে দাঁড়ান, তবু নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে নতুন সরকার তাঁকে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনসংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার করে। জামিন হওয়ার পরও নতুন করে অ্যারেস্ট দেখিয়ে তাঁকে এখনো আটকে রাখা হয়েছে। আমাদের পার্টির আরেকজন নেতা নির্বাচনের আগে থেকেই কারাগারে আছেন। গাজীপুরের এক নেতার বাসায় সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা এক হাজার জনের নামীয় হত্যা মামলায় তাঁর নাম যুক্ত করে সিরিয়াল নম্বর বসানো হয়েছে এবং তাঁকে বাসায় না পেয়ে তাঁর ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যদিও এসব মামলায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই, বরং দলের সংশ্লিষ্ট আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ ও সাক্ষ্য রয়েছে। জুলাই আন্দোলনে যে জাতীয় পার্টি যুক্ত ছিল, সেই ডকুমেন্ট নিয়ে সম্প্রতি দলের পক্ষ থেকে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

বিএনপি সরকারের এই পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে কী বলবেন?

আমরা জানি, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা যেখানে সরকারি দল ও রাষ্ট্র একীভূত হয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারের পক্ষে কাজ করে, বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়, বিরোধী মত দমন করা হয় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকে না। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়েও বর্তমান সরকার এগিয়ে আছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। এই সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করেই দলীয় লোকদের বিভিন্ন পদে বসিয়ে নির্বাচিত ব্যক্তিদের পর্যন্ত অপসারণ করেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন মাত্রায় দলীয়করণের উদাহরণ বলতে হবে। আর দেশে ইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।

শুধু ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়, বাড়িঘর, সম্পদ, মিল-ফ্যাক্টরি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে এনটিভির একটি লাইভে দেখা গেছে, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকাশ্য চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও খুন-জখমের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন। চাঁদাবাজি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে চাঁদা দিয়ে কিছুটা সুরক্ষা মিলত, এখন চাঁদা দেওয়ার পরও বাড়িঘর ও দোকানপাট লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।

এলজিআরডিমন্ত্রী কয়েক দিন আগে দেশে ৪ কোটি বেকার কর্মক্ষম যুবকের কথা নিজেই জানিয়েছেন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ—অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ, তীব্র খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর নয়। ফলে দেশকে এই অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের নামে দেশে নতুন একধরনের বিভাজনমূলক রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে উদারপন্থী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের কোণঠাসা করে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র শক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে কী করা যেতে পারে?

দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য এখন দরকার জাতীয় ঐক্য। বিভিন্ন বিদেশি কূটনীতিক সাম্প্রতিক সময়ে এই বার্তা দিয়েছেন। চীনা রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বাংলাদেশে ঐক্য ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সম্প্রতি সফরে আসা একজন বিদেশি প্রতিনিধিও একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে স্বয়ং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে সেখানে বিদেশি অতিথিরা নিরাপত্তার অভাব অনুভব করে সেই সুরক্ষিত এলাকা থেকে দ্রুত চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, যা প্রমাণ করে দেশে প্রকৃত স্থিতিশীলতা এখনো আসেনি। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ না এলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে এবং চলতি বাজেট বাস্তবায়নের অর্থায়নও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সরকার যদি শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় ঐক্যের পথে না হাঁটে, তবে তা সরকার ও দেশবাসী উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হবে।

এবার একটা অন্য বিষয়ে আসা যাক। ২০২৪ সালে যেদিন হাসিনার পতন হয়, সেদিন আপনিই প্রথম সেনানিবাসে যান। সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত জানাবেন কি?

সেদিন সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়, ‘আপনিসহ আপনাদের পার্টির দু-একজন নেতাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। শুনতে পাচ্ছি, শেখ হাসিনা হয়তো পদত্যাগ করতে পারেন। আপনারা আসলে এর পরবর্তী করণীয় কী হতে পারে, সে নিয়ে আলোচনা হবে।’

শেষে আমরা সেনানিবাসে গেলাম। আমার সঙ্গে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক চুন্নু ছিলেন। তিনি তখন আমাদের পার্টির মহাসচিব। আমরা যাওয়ার পরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেখলাম। আমরা বললাম, ছাত্রনেতাদের ডাকতে হবে। কারণ, তাঁরাই এ আন্দোলনের মূল কারিগর। আমরা বসে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললাম, কী করা যায়। এরপর একে একে আসিফ নজরুল, জোনায়েদ সাকি, জামায়াতের পক্ষ থেকে শফিকুর রহমানসহ আরেকজন নেতা এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সবাই মিলে চিন্তা করা হলো কী করা যায়। এই পরিস্থিতিতে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে অফিশিয়ালি একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাবে। ততক্ষণে খবর আসে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং রাস্তায় মানুষ নেমে পড়েছে।

এরপর বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হয়। আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল, আগে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। তখন আমি বললাম, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর একটা লিখিত অর্ডার লাগে। এটা হলো নিয়ম। তবে আইনগতভাবে যদি কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে আমাদের তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই। রাষ্ট্রপতি আবার তখন বলেন, ‘আচ্ছা, আমি বিষয়টাকে বিবেচনা করছি।’ আর আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে বললাম, এখন যেহেতু আমরা সেটেলমেন্ট পর্যায়ে আছি, এখন জরুরি হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া। পুলিশ, সেনাবাহিনীকে দিয়ে যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যায়, সে জন্য তাদেরকে সেভাবে দায়িত্ব দেন। অনেকে তখন বললেন, আবার তাহলে গোলাগুলি করতে হবে। আমি বললাম, এখনই এটা করা না গেলে নিরীহ মানুষ মারা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যেহেতু জনগণ শৃঙ্খলার বাইরে চলে গেছে। সবাইকে দেখলাম যে আমার ওপর খুব ক্ষুব্ধ—হ্যাঁ, আপনি আবার গোলাগুলি করতে বলছেন!

তারপরে আর আমাদের ওনারা ডাকেননি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক মাস পরে বোধ হয় ইউনূস সাহেব একটা মিটিংয়ে ডেকেছিলেন। সেখানে আমরা বলেছিলাম, আপনারা একটা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন তৈরি করেন, ট্রুথ কমিশন গঠন করে সবাইকে নিয়ে বসে আলোচনা শুরু করেন। তারপরে একটা নির্বাচন সংস্কার বা যেটাই হোক, করার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব দেন। নির্বাচিত সরকারের জন্য যত দেরি করবেন, মানুষের মধ্যে কিন্তু একটা উৎকণ্ঠা তৈরি হবে।

এরপর আপনাদের বাদ দেওয়ার কারণ কী?

শুরুতে সংস্কারপ্রক্রিয়ায় দলকে অন্তর্ভুক্ত রাখা হলেও প্রায় দুই মাস পর, অক্টোবরের ৭ বা ৮ তারিখে দুজন সমন্বয়ক ফেসবুকে লেখেন, জাতীয় পার্টিকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না। প্রথমে এটিকে আমরা কোনো গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু পরে সরকারের একজন উপদেষ্টা একই ঘোষণা দেন। ফলে দলের কার্যালয় ও নেতা-কর্মীদের বাড়িঘরে হামলা শুরু হয় এবং মিটিং-মিছিলে বাধা দেওয়া শুরু হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয় আমাদের কাছে; যেখানে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের নথিভুক্ত প্রমাণ রয়েছে। আমি মন্ত্রী থাকার সময়েও সরকারের জনবিরোধী কাজের বিরোধিতা করেছি। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে, বিএনপির ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও সংসদে ও সংসদের বাইরে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছি।

যদিও দলের মধ্যে অল্প কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছেন। তবে এটি সামগ্রিকভাবে দলের নীতি ছিল না। ২০১৪ সাল পরবর্তী মন্ত্রিসভায়, যেখানে জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল, সে সময়েও মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

আপনাদের বিরুদ্ধে তো গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ আছে। অস্বীকার করতে পারবেন?

দল সব সময় জনগণের পক্ষের রাজনীতি করে এসেছে এবং এখনো একই ধারায় কাজ করছে। বর্তমানে রাস্তায় নেমে বড় ধরনের আন্দোলনে সরাসরি না গিয়ে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর কৌশল নিয়েছি। এ সময় আন্দোলন করলে কর্মীরা গ্রেপ্তার হলে তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর্থিক সংস্থান দলের নেই। তাই এখনই বড় ধরনের রাস্তার আন্দোলনে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে অর্থবহ রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

বারবার আপনাদের দলে কেন ভাঙন দেখা দেয়?

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় থেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই জাতীয় পার্টিকে নিজেদের রাজনীতির জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা মনে করত। ১৯৯০ সালের পর থেকে এই দুই দল জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।

দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কিছু সুবিধাবাদী লোক ছিলেন, যাঁদের তৈরি করেছিল বিগত সময়ের আওয়ামী লীগ সরকার। এর আগে বিএনপির শাসনামলে মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে দলকে শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে একটি পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করে, যারা দলের প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে নিয়মিত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করত। এই প্রবণতা ১৯৯৬ থেকে শুরু হয়ে ২০১৪ সালে বড় আকারে দেখা যায়, এরপর ২০২৪ সালে এবং সাম্প্রতিক সময়েও একই ধরনের ঘটনা লক্ষ করা যাচ্ছে।

দল ক্ষমতায় না থাকার কারণে এসব অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে চলমান বিরোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্টতা ছিল। তবে দলের পক্ষ থেকে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রতিপক্ষের এ ধরনের কৌশল প্রত্যাশিত হলেও পূর্বের মতো এবারও এই ভাঙনের চেষ্টা সফল হবে না।

আওয়ামী লীগের একটা রাজনীতি আছে। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। বিএনপিও এ রকম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। এরপর ইসলামি পার্টি এবং বামপন্থী দলগুলোও তাদের আদর্শের কথা বলে রাজনীতি করে। কিন্তু জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক আদর্শ কী?

আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামি ও বামপন্থী দলগুলোর নিজস্ব আদর্শের তুলনায় জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক আদর্শ স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে দলের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতীয় পার্টির মূল আদর্শ হলো ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করা। আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, যেখানে কেউ অন্যায়ের শিকার হবে না। এই লক্ষ্যে গণতন্ত্র, ইসলামি শাসনতন্ত্র বা সাম্যবাদ—যেকোনো নীতির মাধ্যমেই অর্জনের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটা করা সম্ভব না। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রায় সাড়ে ৯ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো মানের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আইন সবার জন্য সমান ছিল, বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল, বিরোধী দলের নেতাদের জামিন কখনো প্রত্যাখ্যান করা হয়নি এবং গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ৬ দফা ও পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে কোটাব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন বৈষম্য তৈরি করেছে, যা আমি সংসদেও বলেছি। জাতীয় পার্টির আমলে এ ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ ওঠেনি। বৈষম্যহীন ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসনই জাতীয় পার্টির মূল আদর্শ এবং ভবিষ্যতেও এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দল কাজ করে যাবে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আজকের পত্রিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত