Ajker Patrika

গাছ কেটে কিসের উন্নয়ন

মৃত্যুঞ্জয় রায় 
গাছ কেটে কিসের উন্নয়ন
গাছ কেটে ফুটপাত ও রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছবি: রাতুল মুন্সী

বুঝতে পারছি না, দেশে হচ্ছেটা কী! গত মাসেই কয়েকটা খবর দেখলাম গাছ কাটার। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫৪টি পরিণত বড় গাছ কেটে ফুটপাত ও রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ইতিমধ্যে তিন বছর আগে রোপণ করা ৫৪টি গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, রাস্তা প্রশস্ত ও ফুটপাত করার জন্য গাছগুলো কাটা না, সরানো হচ্ছে, এখান থেকে উঠিয়ে অন্য জায়গায় লাগানো হচ্ছে।

পরিবেশ ধ্বংস করে সৌন্দর্যবর্ধনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষায় অবিলম্বে গাছ উপড়ানো বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপায়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে ক্যাম্পাসের কদমতলায় মানববন্ধন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট থেকে কদমতলা পর্যন্ত ফুটপাত নির্মাণের অংশ হিসেবে তিন বছর আগে রোপণ করা ৫৪টি গাছ তুলে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘চির উন্নত মম শির’ ভাস্কর্য এলাকা থেকে প্রথম গেট পর্যন্ত আরও ১০০টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। কাটা পড়ার তালিকায় রয়েছে জারুল, সোনালু, ছাতিম, তাল, খেজুর, কৃষ্ণচূড়াসহ অন্তত ১৩ বছর বয়সী বিভিন্ন প্রজাতির পরিণত বড় গাছ। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিতভাবে এসব গাছ রোপণ করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে যাতায়াত ও ফুটপাত নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন পরিবেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সবুজবেষ্টনী সংরক্ষণ সবচেয়ে জরুরি। অথচ সৌন্দর্যবর্ধনের নামে পরিপক্ব গাছ কেটে কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে প্রশাসনের একধরনের দ্বিমুখী নীতি। একদিকে শতাধিক গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সম্প্রতি প্রশাসন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নতুন বৃক্ষরোপণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন গাছ লাগিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবে শিক্ষার্থীরা তা অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, একটি পরিপক্ব গাছের পরিবেশগত, প্রতিবেশগত ও জীববৈচিত্র‍্যগত অবদান কখনোই সদ্য রোপণ করা চারা গাছ দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

একটা গাছ বড় করতে লাগে ৪০-৫০ বছর, আর তাকে হত্যা করতে সময় লাগে ৫০ মিনিট। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, সেখানকার কিছু কিছু গাছের বয়স ১৩ বছর। দুর্মুখরা হয়তো বলবেন—‘একটা কেটে তো তিনটা গাছ লাগাচ্ছি, তাতে অসুবিধাটা কোথায়? তিনটার একটা মরলেও তো দুটো গাছ বেঁচে থাকবে। তাতে তো গাছের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।’ সেই নির্বোধদের আমি বোঝাতে পারব না যে ছোট চারা গাছটার ওরকম বড় হতে সে রকম সময়ই দিতে হবে। আজ একটা বড় গাছ যে পরিমাণ অক্সিজেন ছাড়ছে, সেই পরিমাণ অক্সিজেন পেতে আমাদের সেই ৪০-৫০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তত দিনে আমাদের সংখ্যা ও অক্সিজেনের চাহিদাও বাড়বে। ও রকমের বড় একটা গাছই আমাদের মতো চারজন বড় মানুষের বার্ষিক অক্সিজেন চাহিদার প্রায় সমপরিমাণ অক্সিজেন দিতে পারে।

জানি, এসব হিসাব যাঁরা গাছ কাটছেন, তাঁদের মাথায় ঢুকবে না। কিন্তু শুনেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় উদ্ভিদবিজ্ঞানের মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই জানেন এর গুরুত্ব ও গাছ স্থানান্তরের সঠিক পদ্ধতি। নতুন গাছ লাগানো ভালো কথা, কিন্তু পুরোনো গাছগুলো রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বিদেশে অনেক বড় বড় গাছ রক্ষার জন্য মিলিয়ন ডলারও খরচ করা হয় প্রাচীন গাছের গুরুত্ব অনধাবন করে। তাদের সে কৌশল, যন্ত্রপাতি ও দক্ষতা আছে। একটি বড় গাছ তুলে অন্য এক জায়গায় লাগানোর মতো সে রকম দক্ষতা ও পারদর্শিতা এবং সক্ষমতা কি আমাদের আছে? এর অভাবে গাছ তোলা হবে, ঢাকঢোল পিটিয়ে সেসব বড় গাছকে লাগানোও হবে। কিন্তু কয়টি বেঁচে থাকবে, সেটাই বড় কথা।

বড় গাছ স্থানান্তর বা প্রতিস্থাপনের জন্য শিকড় ছাঁটাই, ট্রি স্পেড বা ক্রেনের সাহায্যে যান্ত্রিকভাবে উত্তোলন এবং সতর্কতার সঙ্গে পরিবহন করা দরকার হয়। এ কাজ করার ধাপগুলো হলো রুট বল প্রস্তুত করা, উপযুক্ত আকারের নতুন গর্ত খোঁড়া ও স্থানান্তরের পর প্রচুর পরিমাণে গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া। যে গাছটি তোলা হবে, তোলার কয়েক মাস আগে তার চারপাশে নালার মতো গর্ত করে ধীরে ধীরে দিনের পর দিন গাছের ছোট শিকড়গুলো ছেঁটে ফেলতে হয়। এভাবে বেশ কয়েক দিন ধরে গাছের শিকড়গুলো মাটি থেকে পৃথক করে শিকড়াঞ্চলের স্বল্প পরিমাণ মাটি নিয়ে একটা পিণ্ড বা বলের মতো তৈরি করতে হয়। চট বা অনুরূপ কোনো বস্তু দিয়ে সেই পিণ্ড মুড়ে ফেলতে হয়। একই সময়ে গাছের ওপরের ডালপালা পর্যায়ক্রমে ছাঁটতে হয়। এভাবে গাছটি যাতে তোলার ধকল সইতে পারে, সে জন্য দিনের পর দিন সে গাছের সহ্যক্ষমতা বুঝে এসব কাজ করতে হয়। ক্রেন দিয়ে গাছটির গুঁড়ি বেঁধে তুলে ফ্ল্যাট বেড ট্রাকে করে রোপণের স্থানে স্থানান্তর করতে হয় এবং আগে করে রাখা গর্তে সেটি লাগিয়ে তার পরিচর্যা করতে হয়। আমি জানি না যে সেখানে এসব কাজ যথাযথভাবে করা হয়েছে বা হচ্ছে কি না। হলে সেসব গাছ মরবে কেন?

এটি শুধু জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা না। অহরহ উন্নয়নের নামে রাস্তা ও স্থাপনা নির্মাণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। সম্প্রতি সৈয়দপুরে ৩৩টি শতবর্ষী গাছ কাটার উদ্যোগ নিলে তা নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কয়েক দিন আগে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বনভূমি উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ফল ধরা কমলাগাছ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

খুশির কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গাছ না কেটে সড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় কক্সবাজারে ৩ হাজারের বেশি গাছ না কেটেই নির্মাণ করা হচ্ছে মেরিন ড্রাইভের চার লেনের সড়কটি। তাহলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাত নির্মাণের জন্য গাছগুলো কেন সরাতে হবে? রাস্তার পাশে সারি করে লাগানো গাছগুলোকে সেভাবে রেখে একটু দূর দিয়ে ফুটপাত করা গেলে সেসব গাছের ছায়ায় পথচারীরা হেঁটে বরং বেশি খুশি হবেন। সিলেটে শাহজালালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সড়কের পাশে লাগানো বৃক্ষের দীর্ঘ সারি যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি পথিকের জন্য প্রশান্তিময়। আমরা কি গাছগুলো সেভাবে রেখে ফুটপাতের পরিকল্পনা করতে পারতাম না?

এ ঘটনা বন্ধ হলেও আমি নিশ্চিত কয়েক দিন পর দেশের অন্য কোনো স্থানে আবার গাছ কাটার ঘটনা ঘটবে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতর গাছপালা কেন কাটা পড়ে বা কাটা হয়, সেটি বোধগম্য হয় না। তাহলে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির সময় যে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল, সেখানে কেন এসব ত্রুটি রেখে তা অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হলো? মূল গলদটা বোধ হয় ওখানেই। আমরা আসলে কোনো কিছুর পরিকল্পনাটাই ভালোভাবে করতে শিখিনি। ভালো থাকার জন্য উন্নয়ন, আর জীবনের জন্য গাছ। গাছ কেটে জীবন মেরে সে উন্নয়ন আমাদের কোন কাজে আসবে? কোনো কোনো দেশে যেকোনো গাছ কাটার আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা সরকারের অনুমতি নিতে হয়। ভাগ্যিস, সাধারণ গাছ কাটার বেলায় আমাদের ওসব লাগে না! তাই আমরা যে যা খুশি করতে পারি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত