
এবার যেভাবে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি দেখছি, কদম ফুল ফোটা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে বর্ষাকাল বুঝি এসে গেছে। এ বছর মে মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মে মাসে দুই থেকে তিনটি তীব্র বজ্রঝড় ও এক-দুটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া মে মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে তাপপ্রবাহ বা দাবদাহ চলতে পারে, যা ইতিমধ্যেই টের পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসের প্রথম ১০ দিন সারা দেশে বিক্ষিপ্তভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিলেও স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এই অতিবৃষ্টিতে তাপমাত্রা কম থাকলেও তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। বরিশাল ও ঢাকা বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, সাধারণত এ সময় ভারতের উজানে বেশি বৃষ্টি হয়, কিন্তু এবার বাংলাদেশের ভাটিতে প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে ফসলের খেত তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে, দাম বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে কালবৈশাখী ও তীব্র বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে অনেক মানুষের জীবন ও সম্পদ। এ বছর এ চার মাসেই বজ্রপাতে সারা দেশে ৭২ জন মানুষ মারা গেছে। গত ২৬ এপ্রিল এক দিনেই মারা গেছে ১৪ জন। গ্রাম, শহর, বিল, হাওর, বাঁওড়—কোথাও বাদ নেই এর প্রভাব। অকাল বৃষ্টিপাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের হাওরগুলোতে। অকাল বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে উঠতি বোরো ধানের। প্রায় পেকে আসা ধানগুলোতে যেন মই পড়েছে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি বাংলাদেশে বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে?
শুধু বাংলাদেশেই না, গবেষকদের ধারণা বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাতের ধরনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বছরে সময়-অসময়ে বৃষ্টিপাত যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বড় ঝুঁকিতে পড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষি বা চাষাবাদের ক্ষেত্রে। উন্নত বিশ্বে যেখানে পলিনেটহাউস বা গ্রিনহাউসে ফসল চাষ করা হয়, তাদের কথা আলাদা, সেখানে বৃষ্টিপাত হওয়া বা না হওয়ার প্রভাব পড়ে না। কিন্তু আমাদের দেশের মতো যেসব দেশে খোলা মাঠে ফসল চাষ করা হয়, সেখানে বৃষ্টিপাতের ওপর আমাদের কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আজ মাটিতে বীজ বোনার পর কাল যে সেসব বীজ অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নষ্ট হবে না, পাকা ধান যে তলিয়ে যাবে না—সে কথা কোনো কৃষক জানেন না। প্রকৃতির এরূপ খামখেয়ালিপনায় তাই কৃষককেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। শুধু তাই না, রাষ্ট্রের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার ওপরও তা প্রভাব ফেলে।
প্রতিটি ফসলের উৎপাদন মৌসুম জলবায়ুভিত্তিক ও অনাদিকাল থেকে তা সুনির্দিষ্ট। ফসলের জন্য চাই পানি, বৃষ্টিনির্ভর জাতের আমন ধানগুলো বৃষ্টির পানি না পেলে ফলবে না। আবার অতিবৃষ্টি ও ঢল এলে তলিয়ে যায়। এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষক আর কত ঝুঁকি নিয়ে চাষ করে যাবেন? এখন অবশ্য বিজ্ঞানীরা ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করায় সেসব জাত বিশেষ বিশেষ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রভাব কাটিয়েও মাঠে টিকে থাকছে, আমরা সারা বছরই লাউ ও বাঁধাকপি খেতে পারছি। জলবায়ুর ঘাত সহনশীল আধুনিক জাতের ফসল চাষের ফলে আগের সেই মৌসুম ও নির্দিষ্ট জলবায়ুগত চাহিদা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। তারপরও কৃষকের ক্ষতি থেমে নেই। সময়ে-অসময়ে হওয়া বৃষ্টিপাত কৃষককে ভোগাচ্ছে।
আমরা সব সময়ই জানি আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস হলো বর্ষাকাল, এ সময় প্রচুর বৃষ্টি হয়। চৈত্র মাসে শুকানো মাটি আষাঢ়ে সিক্ত হয়ে রসবতী ও ফলবতী হয়। কিন্তু এখন প্রকৃতির সে নিয়ম যেন খাটছে না। চৈত্র মাসের সেই মাঠ চৌচির চিত্র বদলে সেসব মাঠ এখন কর্দমাক্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কেন বিশ্বব্যাপী বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন? বৃষ্টিপাতের সময়, পরিমাণ ও বণ্টনের অপ্রত্যাশিত ওঠানামাই হলো অনিয়মিত বৃষ্টিপাত যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় পরিবেশগত পরিবর্তনের সংমিশ্রণে ঘটছে। গবেষকদের মতে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রধান বৈশ্বিক কারণগুলো হলো—বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব, বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তন, মহাসাগরীয় ডাইপোল ইত্যাদি। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওঠানামাতেও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। আর এ কারণগুলোর মূলে রয়েছে যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মনুষ্যসৃষ্ট কাণ্ড। অতিরিক্ত নগরায়ণ ও বন উজাড়, শিল্প-কলকারখানা পরিচালন, বাতাসে বিভিন্ন দূষককণার বৃদ্ধি ইত্যাদির ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। আর তার প্রভাবেই বৃষ্টি বাড়ছে বা কমছে।
বন ও গাছপালা সব সময়ই জৈবিক শোধক বা পাম্প হিসেবে কাজ করে। এরা বাতাসের আর্দ্রতা পুনর্ব্যবহার করে। কৃষিকাজের জন্য জমি সাফ করা ও গাছ কাটার ফলে সেখানকার বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়। এতে স্থানীয় পানিচক্রে ব্যাঘাত ঘটে ও শুষ্কতা বিরাজ করে। ফলে বৃষ্টি কমে যায়। বাতাসে থাকা শিল্পজাত দূষক ও ধূলিকণা মেঘ গঠনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, বৃষ্টিপাত কমিয়ে দিতে পারে অথবা অতিরিক্ত মেঘপুঞ্জ সৃষ্টি করে হঠাৎ তা ফেটে গিয়ে কোথাও প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটতে পারে, যাকে বলা হয় ক্লাউড বার্স্টিং বা মেঘ বিস্ফোরণ। কয়েক দিন আগে ফেনীতে এরূপ ঘটনা ঘটেছিল বলে অনেকে বলেছেন। এসব ঘটনা এখন নতুন করে আমাদের সামনে আসছে, আমরাও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছি।
সম্প্রতি আমেরিকার পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী জাপান ও চীনের মেঘ পরীক্ষা করে বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়ার আরেক নতুন কারণ খুঁজে পেয়েছেন। সেসব মেঘ পরীক্ষা করে তাঁরা মেঘের মধ্যেও পেয়েছেন প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি। তাঁরা বলেছেন, প্লাস্টিক শুধু মাটি, নদী, সমুদ্র নয়, বায়ুমণ্ডলকেও দূষিত করছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে এসব প্লাস্টিক কণা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তার প্রভাবে বদলে যাচ্ছে মেঘের গঠন। মেঘ মানেই বৃষ্টি। মেঘের গঠন বদলালে বৃষ্টির ধরনও বদলাবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাঁরা আরও বলেছেন, প্লাস্টিক কণা শুধু মেঘের গঠনই না, মেঘকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় উড়িয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সেগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সেসব গবেষকের গবেষণা নিবন্ধটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: এয়ার’-এ। সে নিবন্ধে তাঁরা দেখিয়েছেন যে পানি জমে বরফ হওয়ার ক্ষেত্রে প্লাস্টিক কণাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিকভাবে যে তাপমাত্রায় পানি জমে বরফে পরিণত হয়, প্লাস্টিক কণা সেখানে থাকায় তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায়ও পানি জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। সেসব পানির ফোঁটা যখন জমে বরফ হয়ে যায় তখন প্লাস্টিক কণারাও জমে যায়। তাঁরা দেখেছেন যে প্লাস্টিকের কণাযুক্ত পানিবিন্দু বিশুদ্ধ পানিবিন্দুর চেয়ে ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রায় জমাট বাঁধতে সক্ষম হয়। সাধারণত আদর্শ বায়ুমণ্ডলে পানিকণা জমাট বাঁধে মাইনাস ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। যখন তাতে প্লাস্টিক কণা মিশে থাকে তখন তার অর্ধেকের বেশি পানিকণা মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমাট বাঁধে। এ থেকেই বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছে যে মেঘ গঠন ও পানিকণা জমাট বাঁধার ক্ষেত্রে প্লাস্টিক কণার ভূমিকা রয়েছে।
জটিল সেসব অদৃশ্য কারণগুলো। আমরা শুধু টের পাই যখন আকাশের মেঘ থেকে আমাদের গায়ে বৃষ্টি পড়ে, মাঠঘাট ভিজে যায়। আর সরল হিসেবে এ থেকে অন্তত এটুকু বুঝলাম, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া মানে দেশ থেকে ঋতুবৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়া, ফসলহানি ও খাদ্যসংকট তৈরি হওয়া, খোলা মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষকের মরে যাওয়া। জলবায়ুর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ চলে না, কিন্তু অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে আমরা বৃষ্টিপাতের ধরনের এই বদলে যাওয়া কমাতে পারি। প্রথমত, বন উজাড় না করে বন সৃজন করে ও দ্বিতীয়ত, সব কাজে প্লাস্টিক পণ্য বর্জন করে। পারব কি তা করতে?
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

ড. রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। জাতীয় বাজেটে প্রত্যাশা এবং বিভিন্ন খাতে যথার্থ অর্থ বরাদ্দ ও তা যথাযথভাবে ব্যয় না হওয়ার কারণ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা...
৩৮ মিনিট আগে
সারা দেশে কোথাও না কোথাও রান্নার জন্য গ্যাস পেতে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ পাওয়াটা যেন সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কয়েকটি গ্যাস বিস্ফোরণ দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে শুধু দুর্ভাগ্য বলে চালিয়ে দিলে কি হয়?
১ ঘণ্টা আগে
বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘লড়াই’ নামের একটি ছবি ছাপা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার জন্য টিসিবির ট্রাকের সামনে সমবেত আদম সন্তানদের উদ্বিগ্ন, প্রাণান্তকর অবয়বগুলো দেখা যায় ছবিতে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের এই জীবনসংগ্রাম কাউকেই স্বস্তি দেয় না।
২১ ঘণ্টা আগে
মানুষ সংঘবদ্ধভাবে নানা লড়াই ও সংগ্রামের পর একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করে। একটি সীমানার মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও আয়ের মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো জীবিকার নিশ্চয়তা চায়। মানুষ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকে একটি সরকার, যারা সাধারণত জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হয়।
১ দিন আগে