Ajker Patrika

বিশ্বকে আবার ভূতের ভয়, বামপন্থার ভূত

আজাদুর রহমান চন্দন
বিশ্বকে আবার ভূতের ভয়, বামপন্থার ভূত
ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বামপন্থী সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের উগ্রবাদ এখন সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই এটি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ১৬ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আয়োজনে ৬০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে মার্কো রুবিও এই অভিমত তুলে ধরে বলেন, অতি বামপন্থী উগ্রবাদ এখন শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি, যৌথ পদক্ষেপসহ আরও বেশি সহযোগিতা দরকার। বৈঠকে অংশ নেওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন, বামপন্থী রাজনৈতিক সহিংসতা এমন একটি বিশেষ ধরনের উগ্রবাদ, যার মূল ভিত্তি সভ্যতার প্রতি গভীর বিদ্বেষ। তবে বৈঠকে ডানপন্থী উগ্রবাদ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ২০২৪ সালের এক অভ্যন্তরীণ গবেষণায় বলা হয়েছিল, মতাদর্শগত কারণে সংঘটিত প্রাণহানির বেশির ভাগ ঘটনার জন্য অতি ডানপন্থী উগ্রবাদীরা দায়ী। যদিও পরে বিচার বিভাগ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই গবেষণা প্রতিবেদনটি তাদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলে।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বৈঠকে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে অ্যান্টিফা (অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট) আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রশাসনের দাবি, অ্যান্টিফাসহ বিভিন্ন অতি বামপন্থী গোষ্ঠী সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত। অথচ বাস্তবে অ্যান্টিফা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত একটি বিস্তৃত, বিকেন্দ্রীভূত ও স্বাধীন বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন। এই আন্দোলন মূলত উগ্র ডানপন্থী, বর্ণবাদী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী এবং নব্য নাৎসি গোষ্ঠীর বিরোধিতায় সোচ্চার।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলের ১১ জন আইনপ্রণেতা মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক চিঠিতে প্রশ্ন রেখে বলেন, শুধু বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওপর জোর দেওয়া হলে বৈধ রাজনৈতিক আন্দোলন ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও অযথা নজরদারির শিকার হতে পারে। ওই চিঠির অনুলিপি হাতে পাওয়ার কথা উল্লেখ করে রয়টার্স জানায়, চিঠিতে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বলেছেন, পররাষ্ট্র দপ্তরের উচিত রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ করা। আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, পররাষ্ট্র দপ্তর প্রশাসনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রম মিলিয়ে নিচ্ছে।

ইউরোপ তথা পাশ্চাত্যকে সময়ে-সময়ে বিভিন্ন ভয়ের তাড়ায় ভুগতে দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পুরোনো ইউরোপকে পেয়ে বসেছিল ইহুদিদের ভয়। সেই ভয় থেকে উদ্ভূত ঘৃণাকে (ইহুদিদের প্রতি) পুঁজি করে হিটলার জার্মানির তো বটেই, গোটা বিশ্বের ভাগ্যবিধাতা হতে চেয়েছিলেন। বাদবাকি ইউরোপেও ইহুদিবিদ্বেষ চাঙা হয়েছিল। সেই বিদ্বেষের পরিণতি হলো এক ভয়াবহ গণহত্যা ও হিংস্রতা। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে তাঁদের বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো শুরুই করেছিলেন এক ঐতিহাসিক মেটাফর বা রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে। ওই ম্যানিফেস্টো বা ইশতেহার তাঁরা শুরুই করেছিলেন এই বলে, ‘ইউরোপ ভূত দেখছে—কমিউনিজমের ভূত। এ ভূত ঝেড়ে ফেলার জন্য এক পবিত্র জোটের মধ্যে এসে ঢুকেছে সাবেকি ইউরোপের সব শক্তি—পোপ ও জার, মেত্তেরনিখ ও গিজো, ফরাসি র‍্যাডিক্যালরা আর জার্মান পুলিশ-গোয়েন্দারা।’ তখনকার ইউরোপের সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণি, পোপ, জার ও ধনিক গোষ্ঠী কমিউনিজমের আদর্শ ও শ্রমিকশ্রেণির জাগরণকে কতটা ভয় পেত, সেটিই এই রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন মার্ক্স-এঙ্গেলস। ইউরোপীয় শাসক ও ধনিক গোষ্ঠীর কাছে এই সাম্যবাদী মতাদর্শটি এক অদৃশ্য ‘ভূতের’ মতো ছিল। এই ভয় থেকেই ইউরোপের সব শাসক এক জোট হয়েছিল কমিউনিজমকে রুখতে।

চলতি শতকের আবার ভূতের ভয় দেখা শুরু করে ইউরোপ। এই ভয়ের নাম ‘অভিবাসীদের আগ্রাসন’। জীবন-জীবিকা নিয়ে সমস্যা পড়া শ্রমিকশ্রেণিসহ সাধারণ মানুষের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে ভোটারদের মন জয় করে নিচ্ছে ডানপন্থী দলগুলো। এই ভূতের ভয়ে যুক্তরাজ্য তথা ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নেয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়, দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার ভয়ের চেয়ে ব্রিটেনের বেশির ভাগ ভোটারের মন জয় করেছিল এই অভিবাসীর ভয়। মূলত মুসলিম অভিবাসীর ভয় ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের দেশে দেশে। ব্রেক্সিটপন্থীদের পক্ষে স্থাপন করা একটি বিলবোর্ড ভোটারদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ওই বিলবোর্ডে দেখানো হয়েছিল, হাজারো আরব ও মুসলমান শরণার্থীর স্রোত ব্রিটেনের দিকে আসছে। এই ছবির ওপর বড় করে লেখা ছিল: ব্রেকিং পয়েন্ট। নিচে যা লেখা ছিল বাংলায় তার অর্থ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মুক্ত হয়ে ব্রিটিশদের উচিত সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়া। ব্রেক্সিটপন্থীরা ভোটারদের বুঝিয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকলে অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানো যাবে না। ইউরোপীয় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বায়নের চেতনার চেয়ে বড় হয়ে উঠল পরজাতিবিদ্বেষ। ফলে ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশটির ৫২ শতাংশ নাগরিক ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ‘ব্রেক্সিট’ কার্যকর হয় অবশ্য ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি।

এই ভয়ের সূচনা ইউরোপে হলেও কালক্রমে তা আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে মার্কিন মুলুকেও হানা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেনা ছক উল্টে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অনেকটা উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন, তাতেও তাঁকে সাহায্য করছে ওই ভয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দিন দিন বেড়ে যাওয়া; অন্যদিকে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় চীনের ক্রম-অগ্রসরমাণতাকে কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছিল না ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান কোনো সরকারই। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বেছে নেন অতি সহজ এক রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজির পথ। মার্কিন ভোটারদের অনেকের মনে তিনি এই বিশ্বাস গেঁথে দিতে সক্ষম হন যে অভিবাসীদের কারণে তাঁদের চাকরি হচ্ছে না, মজুরিসীমা নিচে নেমে যাচ্ছে, সামাজিক সেবা খাতের টাকা তারাই নিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী মন্দা ও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাসবাদী ও আগ্রাসী যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় স্থানীয় সংখ্যাগুরুদের মধ্যে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব এমনিতেই দানা বাঁধছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে একে উসকে দেওয়া হচ্ছে।

সব ক্ষেত্রেই তো আর অভিবাসীর ভয়ের ধাপ্পাবাজিটা তো আর কাজে লাগে না। নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অন্য ধাপ্পাবাজি তথা জুজুর আশ্রয় নিতে হয়। এই তো কয়েক মাস আগেই, নিউইয়র্কের মেয়র পদে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানির বিজয় ঠেকাতে এবং তাঁর বামঘেঁষা নীতির বিরোধিতা করতে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত দিয়েছেন ট্রাম্প। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট (গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী) হিসেবে পরিচিত হলেও মামদানির সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন এবং শহর পরিচালিত মুদিদোকান চালুর মতো প্রস্তাবগুলোকে ট্রাম্প ‘সমাজতন্ত্রের ব্যর্থ উদাহরণ’ ও ‘কমিউনিজম’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত বছরের ২১ অক্টোবর ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের আশঙ্কা নিউইয়র্কের মেয়র পদে তিনি কোনো ডেমোক্র্যাটকে পাচ্ছেন না, পাচ্ছেন এক কমিউনিস্টকে। ট্রাম্প মূলত জোহরান মামদানির উদ্দেশেই ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেন। মামদানিকে তাঁর এতটাই ভয় যে নিজ দল ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে তিনি সমর্থন পর্যন্ত দেননি। তিনি চান তাঁর দলের প্রার্থী স্লিওয়া যেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর ভোট যেন স্বতন্ত্র প্রার্থী কুয়োমোর বাক্সে যায়। তিনি এই সহজ সমীকরণ টেনেছিলেন শুধু জোহরান মামদানিকে নির্বাচনে পরাজিত করতে। কেননা, কুয়োমো তখন দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন।

এত কূটচাল চেলেও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে মামদানির বিজয় ঠেকাতে পারেননি ট্রাম্প। ইউরোপের দেশে দেশে অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো প্রকট হওয়ায় সেখানে আবারও সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে মতাদর্শগত রাজনীতির যুগের ফিরে আসার। একই রকম অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রেও। তাই সেই সব দেশের শাসকেরা কখনো ভীতি-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন অভিবাসী আগ্রাসনের, আবার কখনো কমিউনিজমের বা বামপন্থার। তাঁরা জানেন, সাধারণ মানুষের মনে ভয়-বিদ্বেষ বাসা বাঁধলে দৃষ্টিতে সত্য ধরা পড়ে না।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত