Ajker Patrika

গুরুর মান-অপমান ও হিতোপদেশের গল্প

অজয় দাশগুপ্ত
গুরুর মান-অপমান ও হিতোপদেশের গল্প
ছবি: এআই

আমাদের দেশ ও সমাজে এখন তারুণ্য বড় উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে—এটা এখন ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সমানে একদল কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীর এমন উচ্ছন্নে যাওয়া সত্যি কষ্টের। এরা কীভাবে এমন হয়ে গেল? সবটাই কি তাদের দোষ? তাদের জন্য সমবেদনা আর ভালোবাসা রেখেই বলি, পরিপূর্ণভাবে তাদের দোষারোপ করা ঠিক হবে না। তারা যে বয়সে প্রেম-ভালোবাসা, কবিতা-নাটক নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সে বয়সে তাদের মাথায় রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়েছে সমাজ। সমাজের মাথা নামের পরিচিতজনেরা দিয়েছেন ইন্ধন।

একটি সরকার যখন একনায়ক হয়ে ওঠে বা সরকার যখন অগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তখন সমাজ তার বিরুদ্ধে যাবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে তরুণদের ব্যবহার করে সরকার পতনের কারণেই এরা বিপথগামী হয়ে পড়েছিল।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো; এরা ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক বোঝার আগেই এদের স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে গেছে। যে কারণে এখন এরা বেপরোয়া আর নিয়মের বাইরে। এদের জন্য ভালোবাসার পরিবর্তে মানুষের মনে যে ক্রোধ আর ঘৃণার বিস্তার হচ্ছে, তার নিরসন জরুরি। সে কারণেই আজ আমাদের দেশ, সাহিত্য আর সমাজে প্রচলিত কয়েকটি গুরুভক্তির গল্প বলব। যে গল্পগুলো ঠিক গল্প না, এগুলো আসলে শিশু-কিশোরদের মানস গঠনের সহায়ক। কেন, কী কারণে তাদের টার্গেট নিজেদের শিক্ষক বা গুরুকুল? যাঁরা তাদের পথ দেখাবেন, যাঁরা তাদের ভুল শুধরে দেবেন, যাঁরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করবেন, তাঁদের প্রতি এদের এত রাগ? এত ক্রোধ? এই অন্ধত্ব যে বা যারাই চালু করুক, এর অবসানে নিচের গল্পগুলো জানা জরুরি।

১. একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্য ও একটি কুকুর নিয়ে সেই বনে পৌঁছেছিলেন, যেখানে একলব্য শিকারের জন্য থাকতেন। তাঁর কুকুর পথ হারিয়ে একলব্যের আশ্রমে পৌঁছে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। একলব্য তখন ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন করছিলেন। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে একলব্যের সাধনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। তাই তিনি এমন দক্ষতার সঙ্গে তির নিক্ষেপ করলেন যে কুকুরটি সামান্য আঁচড়ও দিল না এবং কুকুরের মুখও বন্ধ হয়ে গেল।

কুকুরটি অসহায়ভাবে গুরু দ্রোণের কাছে ছুটে গেল। এমন চমৎকার ধনুর্বিদ্যা দেখে দ্রোণ ও তাঁর শিষ্যরা বিস্মিত হলেন। তাঁরা সেই মহান তিরন্দাজের সন্ধানে একলব্যের আশ্রমে পৌঁছে দেখেন যে একলব্য এমন তির নিক্ষেপ করছেন, যা একজন শীর্ষ যোদ্ধাও ছুড়তে পারে না। এটি দ্রোণাচার্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি একলব্যের সামনে তাঁর গুরু সম্পর্কে জানার কৌতূহল দেখালে একলব্য তাঁকে দ্রোণাচার্যেরই একটি মূর্তি দেখান।

দ্রোণাচার্যকে মানসিক গুরু হিসেবে বিবেচনা করে একলব্য নিজে অনুশীলনের মাধ্যমে এই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন জেনে তিনি আরও অবাক হয়েছিলেন। নিজের মূর্তি দেখে আচার্য দ্রোণ বললেন, ‘তুমি যদি আমাকে তোমার গুরু মনে কর, তবে আমাকে গুরুদক্ষিণা দাও।’

একলব্য জীবন বিসর্জনের কথা বললেন। কিন্তু গুরুদক্ষিণায় গুরু দ্রোণ বুড়ো আঙুল চেয়েছিলেন, যাতে একলব্য শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধারী না হয়; এমনটা হলে অর্জুনকে মহান তিরন্দাজ বানানোর প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হয়ে যাবে। একলব্য বিনা দ্বিধায় গুরুকে তাঁর বুড়ো আঙুল অর্পণ করলেন। এরপর একলব্য ছাড়া সবাই চলে গেলেন।

একটি পুরোনো গল্প অনুসারে, এর একটি প্রতীকী অর্থও হতে পারে যে একলব্যকে খুব মেধাবী বলে জেনে দ্রোণাচার্য তাঁকে বুড়ো আঙুল ছাড়াই ধনুক চালানোর বিশেষ দক্ষতা উপহার দিয়েছিলেন। আরও বলা হয় যে বুড়ো আঙুল কাটার পর একলব্য তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল ব্যবহার করে তির ছুড়তে শুরু করেন। এখানেই আধুনিক ধনুর্বিদ্যার জন্ম। তাই একলব্যকে আধুনিক ধনুর্বিদ্যার জনক বলাই সংগত হবে। নিঃসন্দেহে এটিই উত্তম উপায় এবং আজকাল এভাবেই তিরন্দাজ করা হয়।

২. ছেলেবেলায় হিতোপদেশে আরুণীর গল্প পড়েছিলাম। গুরু তাকে ডেকে বলেছিলেন, শস্যখেতে জল ঢুকছে, গিয়ে বন্ধ করে এসো। বেচারা কিশোর গিয়ে দেখতে পায়, পানি ঢোকা বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু গুরুবাক্য অমান্য করবে কীভাবে?

অনেক বিলম্ব দেখে গুরু বেরিয়েছিলেন তাকে খুঁজতে। গিয়ে দেখেন, যেদিক দিয়ে পানি ঢুকছে, সেটাকে আড়াল করে লম্বালম্বি শুয়ে আছে আরুণী। তার শরীর পুরো ভিজে গেছে, কিন্তু গুরুর কথা অমান্য করেনি সে। গুরুই তাকে কোলে তুলে নিয়ে এসেছিলেন।

৩. বাদশাহ আলমগীর ভারতের সম্রাট। দিল্লির অধিশ্বর। পুত্রের শিক্ষা কেমন চলছে দেখার জন্য গুরুগৃহে গিয়ে দেখেন, ওস্তাদজি পা পরিষ্কার করছেন নিজ হাতে। বাদশাহর পুত্র দূর থেকে পানি ঢেলে দিচ্ছিল ওস্তাদের পায়ে। বাদশাহকে দেখে শিক্ষকের তো জান খাঁচাছাড়া। ভাবলেন এই অপরাধে জীবনই দিতে হবে হয়তো!

কিন্তু না, কাজী কাদের নেওয়াজের কবিতায় আমরা পড়লাম, বাদশাহ পুত্রকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, তুমি মানুষ হবে না। কেন তুমি নিজ হাতে শিক্ষকের পা পরিষ্কার করে দাওনি?

৪. বাঙালির কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শিক্ষকদের সম্মান করতেন বলে শান্তিনিকেতনের যেসব ক্লাসে ছাত্রছাত্রী কম হতো, তিনি নিজে এসে তাদের সঙ্গে বসে যেতেন। তাঁর মতে, শিক্ষক যেন মনে করেন যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ।

বাঙালির আজ এ কোন দশা? বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে আর যাই বলি, কোমলপ্রাণ-কোমলমতি বলা যায় না। দুধের দাঁত পড়েনি, আক্কেল দাঁত ওঠেনি; এরা যে ভাষায় কথা বলে, যে পরিমাণ মারমুখী, তাতে তো মনে হয় এই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের চাইতেও ভয়াবহ।

এসব রাগ, ক্রোধ, মান, অপমান সব আগেও ছিল। কিন্তু বিগত মেটিকুলাস ডিজাইন আমলে এগুলো ওপেন করে দেওয়া হয়েছিল। সরকার পতনের জন্য টুলস হিসেবে এদের ব্যবহারের পরিণতিতে জন্ম নেয় মব। অবাধ মবের এখন যা চেহারা, তাতে দেশের দুর্ভাগ্যই নিহিত আছে।

হায় বাঙালি! এই প্রজন্মের কী হবে?

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত