সংগ্রামী নারী: উপন্যাস এবং বাস্তবের আলোয়

কিছুদিন হলো পাকিস্তানের বেলুচিস্তান আমাদের ভাবনায় নতুন করে একটা নাড়া দিয়েছে। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাসংগ্রাম বহুদিনের। তাদের নেত্রী মাহরাঙ বালুচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চান। এক বক্তৃতায় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটিও উচ্চারণ করেছেন। নেত্রী একজন চিকিৎসক। তিনি এখন জেলে। তিনি কেমন আছেন জানি না। তবে একসময়ের পাকিস্তানের নির্যাতনের প্রক্রিয়া আমাদের জানা।
সম্প্রতি বাঙালি লেখক আফতাব হোসেনের একটি বই পড়ে বিষয়টি নিয়ে আবার নতুন চিন্তার উদ্রেক হলো। বইটির নাম ‘ইরানি দাস্তান’। লেখক পেশায় চিকিৎসক। চিকিৎসক হিসেবে তিনি ইরানের বালুচ অধ্যুষিত ইরান-পাকিস্তান সীমান্তে কর্মরত ছিলেন। সাধারণভাবেই সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী বালুচ। তাদের সামাজিক রীতিনীতি সবই বালুচ কায়দার। যেহেতু এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা সুন্নি মতাবলম্বী, তাই ইরানের শিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। তবে পাকিস্তানের বালুচদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশ ভালো। তারা সবাই পাঠান। উপন্যাসটি বেশ দীর্ঘ—২৮২ পৃষ্ঠার। কিন্তু এতই সহজপাঠ্য যে একটানে পড়ে শেষ করা যায়।
জানা গেছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশ কিছু জায়গায় পাঞ্জাবিদের সঙ্গে বালুচদের দ্বন্দ্ব হয়েছে। যুদ্ধের সময় দ্বন্দ্ব মানে সে এক ভয়ংকর ব্যাপার—সবার হাতেই অস্ত্র। যাই হোক, বালুচ পুরুষদের সম্পর্কে নানাভাবেই কিছু কিছু জানা গেছে। কিন্তু নারীদের সম্পর্কে তেমন একটা তথ্য আমাদের জানা নেই। এই উপন্যাসে অন্য অনেক চরিত্রের মধ্যে একটি প্রধান চরিত্র আফসানেহ। তরুণী আফসানেহ এলাকার দুর্ধর্ষ সর্দার আব্বাস আলী রিগির মেয়ে। বাবার মতো মেয়েটিও দুঃসাহসী। অদ্ভুত এক কোমল কঠোর চরিত্র তার। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সে অবিবাহিত। ওই অঞ্চলের পাহাড়, উপত্যকা, দুর্গম পথে একাকী ঘুরে বেড়ায়। একেবারেই বেপরোয়া। আবার রান্নাবান্নার হাত চমৎকার। সত্যভাষণে তার কোনো ছাড় নেই। বাবা সর্দার আব্বাস একদিকে কঠোর এবং বেপরোয়া পাঠান। অন্যদিকে মেয়ের কাছে একেবারেই শিশুসুলভ আচরণ করে। আফসানেহর মনের গভীরে যত বেদনাই থাক, তা সে কখনোই প্রকাশ করে না। তবে একটা বিশেষ প্রকাশভঙ্গি তার মধ্যে আছে। বালুচরা পুরুষশাসিত। আফসানেহ খুবই বলিষ্ঠভাবে সেখানকার পুরুষদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে।
বর্তমানে বালুচদের নেত্রী মাহরাঙ বালুচ তার সমবয়সীই হবেন হয়তো। মাহরাঙের বয়স এখন ৩৩ বছর। অসম সাহসী এই নারী পাকিস্তান সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধ রুখে দাঁড়িয়েছেন। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য আপসহীন সংগ্রামে নেমেছেন। অতীতেও বালুচ নারীদের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে স্বাধীনতার এবারের সংগ্রামের চরিত্র একেবারেই আলাদা।
‘ইরানি দাস্তান’ বইয়ের চরিত্র আফসানেহ রাজনৈতিক কোনো আন্দোলনের নেতৃত্বে নেই। কিন্তু কেন যেন তার আচরণে মনে হয় সারা বেলুচিস্তান আফসানেহর মধ্যে কথা বলে ওঠে। লেখক উত্তম পুরুষে বইটি লিখেছেন। এর সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষ-প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। স্বাভাবিকভাবেই আফসানেহর চরিত্রটি একটু বেশি স্থান দখল করেছে। আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারব না যে কেমন করে মাহরাঙ বালুচ আর আফসানেহর সঙ্গে কেমন যেন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। এটা যেন অনুভব করার বিষয়।
মনে পড়ে, একদা আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকার ইলা মিত্র এসে কৃষকদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কেমন করে পাকিস্তানিরা তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল। সেসব আমাদের জানা। শুধু তাই নয়, বেলুচিস্তানে একবার নয়, বহুবারই দেখা গেছে পাঞ্জাবি সেনা ও পুলিশ নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। সেদিক বিবেচনা করলে ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায় বালুচরা অনেকটাই স্বস্তিতে বসবাস করছে। বর্তমানে মার্কিনদের হামলার পর কেমন আছে ইরান—এর পূর্ণাঙ্গ সামাজিক পরিস্থিতি জানা যায় না। জানা যায় না, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তে বালুচ অধ্যুষিত সমাজের কথা।
যাই হোক, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ জীবনটা খুঁজে পাওয়া যায় না। লেখক উপন্যাসের শেষে আফসানেহকে দূরবর্তী এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তার চাচা বিশাল বাড়িঘর, ব্যবসা এসব নিয়ে থাকে। তবে বোঝা যায়, আফসানেহর চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। একটা সত্যকে আঁকড়ে ধরেই তার জীবনযাপন চলে। কিন্তু আপস করে না। বালুচ নারীদের আপসহীন সংগ্রামের সংবাদ আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ৩৩ বছরের নেত্রী মাহরাঙের সামনেও রয়েছে অনেক সময়। এইভাবেই যেন তিনি সংগ্রামটা চালিয়ে যেতে পারেন, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আমার এক বন্ধুর সঙ্গে সিন্ধুর এক ভদ্রলোকের দেখা হয়েছে। সিন্ধিদের মনেও স্বাধীনতার স্বপ্ন। আমার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক পাকিস্তানির সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি লাহোরের মানুষ এবং পাঞ্জাব প্রদেশের। তাঁরও দেশে ফেরার কোনো তাগিদ নেই। কারণ, দুর্নীতিতে, সামরিকতন্ত্রে, ব্যর্থ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে দেশটা ক্ষতবিক্ষত। এই পরিস্থিতিতে বালুচদের জাগরণ এবং সিন্ধুর মানুষদের স্বাধীনতার স্বপ্ন—সবটা মিলিয়ে বালুচ এবং সিন্ধুর নারীদের মুক্তির সংগ্রাম আরও বেগবান হবে। যদি চেতনায় আফসানেহ, মাহরাঙ, ইলা মিত্রকে একসূত্রে বাঁধা যায়, তাহলে এ সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
একসময় সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ পড়ে আফগানিস্তানের মানুষ, সেখানকার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছিল। লেখক আফতাব হোসেনের বই পড়ে বালুচ পাঠানদের সম্পর্কে ধারণা শুধু নয়, পাকিস্তানি বালুচদের সম্পর্কেও একটা ধারণা হলো। এবং ধারণা করা যায়, সেখানকার নেত্রী মাহরাঙের যে লড়াই, এর প্রেরণাও ছড়িয়ে যাবে। কারণ, আমাদের মুক্তিসংগ্রামে আমাদের নারীরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আফসানেহ উপন্যাসের চরিত্র, লেখকের দক্ষতাই সেই চরিত্রের মূল শক্তি। কিন্তু মাহরাঙ তো সত্যিকারের রাজপথে। তাঁর লড়াইয়ে শত সহস্র মাহরাঙ যুক্ত হোক, জেগে উঠুক বালুচ-পাঠানরা। অজান্তেই সেই লড়াইয়ের মিছিলে এসে দাঁড়াক আফসানেহ।









