বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, বিদ্বেষের কারখানা নয়। এখানে যুক্তি আবেগকে শাসন করবে, সহনশীলতা অসহিষ্ণুতাকে পরাস্ত করবে, আর ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা হবে শিক্ষিত মানুষের পরিচয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণেই যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ, উসকানিমূলক স্লোগান, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য এবং অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়, তাহলে প্রশ্ন করতেই হয় আমাদের উচ্চশিক্ষা কি মানুষ তৈরি করছে, নাকি কেবল সনদধারী নাগরিকের সংখ্যা বাড়াচ্ছে? শিক্ষার কাজ হলো মানুষের ভেতরের পশুর শিং, কান, লেজ কেটে তাকে মানব সত্তায় উত্তীর্ণ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণ মিলেছে শিক্ষার্থীদের ভেতরের শিং, কান, লেজ বাইরে বেরিয়ে এসেছে! কিছুদিন পর তারা ছাত্রজীবন চুকিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পাবে। সেখানে গিয়েও তারা যে এমন তামসিক আচরণ থেকে বিরত থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
দুর্গোৎসবকে ঘিরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে তাজ্জব বনে যাই। মন্দির প্রাঙ্গণে গরু জবাই, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য, অর্থের উৎস এবং ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক স্লোগান নিছক ছাত্ররাজনীতির সংঘাত বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের অধিকার আছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতাও আছে। কিন্তু কোনো অধিকারই অন্যের অধিকার অস্বীকার করার অবাধ অনুমতিপত্র নয়। নিজের বিশ্বাসের স্বাধীনতা দাবি করে অন্যের উপাসনাস্থল ও ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হলে সেই আচরণের জবাবদিহি চাইতেই হবে। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে কারও বৈধ অধিকার খর্ব করা হলেও তার প্রতিবাদ করতে হবে।
প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে পরপর দুই দিন মন্দির প্রাঙ্গণে গরু জবাইয়ের ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। নির্দেশটি কি ছিল? কেন দেওয়া হয়েছিল? প্রথম ঘটনার পর প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে এর দায় কার? নির্দেশ অমান্য করাই যদি প্রতিবাদের ভাষা হয়, তবে সেটি নীতির লড়াই, নাকি নিজের সাংগঠনিক শক্তির প্রদর্শন সে প্রশ্ন উঠবেই। প্রশাসনেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আইন প্রয়োগ হতে হবে সবার জন্য সমান। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া কিংবা অন্য কাউকে কঠোরভাবে দমন করা চলবে না। আবার শৃঙ্খলার নামে বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করাও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নিরপেক্ষতার দাবি করবে, অথচ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেবে না—এমন দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। দ্বিতীয় দিন গরু জবাই করে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস (বিশ্ববিদ্যালয় শাখা)। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি সারা দেশে পূজামণ্ডপের পাশে মৌলবাদী গোষ্ঠী এহেন কাজ করতে থাকে, তাহলে এর দায় কে নেবে? এদিকে আবার চট্টগ্রাম বন্দর নিয়েও চলছে নানা বাহানা।
প্রায় সোয়া লাখ টাকায় কেনা গরুর অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। অর্থ কি সংগঠনের তহবিল থেকে এসেছে? সদস্যদের চাঁদায় নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে? ব্যয়ের হিসাব আছে কি? এসব প্রশ্ন তোলা মানেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আর্থিক জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে হিসাব দিতে বলা হলে সেটিকে বিদ্বেষ বলে উড়িয়ে দেওয়া অনুচিত। রাজনীতিতে তরুণদের আবেগকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা নতুন নয়। রাজনীতি যখন আদর্শের বদলে আনুগত্য, যুক্তির বদলে স্লোগান এবং জনস্বার্থের বদলে প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন শিক্ষার্থীরা নাগরিক হিসেবে বিকশিত হওয়ার বদলে সংঘাতের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
‘শাহ জালালের বাংলায়, হিন্দু মৌলবাদীদের ঠাঁই নাই’—এ ধরনের স্লোগান শুধু আপত্তিকর নয়, সমান নাগরিকত্বের ধারণারও পরিপন্থী। হজরত শাহ জালাল (রহ.) বাংলার ইতিহাস ও সুফি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম ব্যবহার করে ধর্মের দোহাই দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে কারা বসবাসের অধিকার পাবে, তা নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে এ দেশ সবার। ‘হিন্দু মৌলবাদ’ কিংবা যেকোনো ধর্মের উগ্রবাদ নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। ধর্মের নামে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি। মন্দির প্রাঙ্গণে গরু জবাই কি উগ্রতা নয়? কোনো ব্যক্তির উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আর একটি গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করা এক কথা নয়।
অপরাধের দায় অপরাধীর। সেই দায় একটি ধর্মের সব অনুসারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের সাম্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় নাগরিকের অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়ার দান নয়। রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষায় তা প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই ন্যায়বিচারের একমাত্র মানদণ্ড নয়। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়।
উপনিষদীয় ঐতিহ্যে আত্মসংযম, আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। বৃহদারণ্যক উপনিষদের বিখ্যাত ‘দ’ উপদেশে দমন, দান ও দয়ার যে শিক্ষা আলোচিত হয়েছে, তার একটি তাৎপর্য হলো মানুষের জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে নিজের লোভ, ক্রোধ ও অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। ইসলামে সংযম ও ন্যায়বিচার, বৌদ্ধ দর্শনে দ্বেষ পরিহার, খ্রিষ্টীয় নীতিতে প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা বিভিন্ন ঐতিহ্যেই আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা রয়েছে। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জলবায়ু প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নিয়ে গবেষণা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা কোনো একটি ক্যাম্পাসের সীমানায় আটকে নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি যুক্তিবাদী, আত্মসংযমী ও মানবিক নাগরিক তৈরি করছে, নাকি পরিচয়ের অহংকারে অন্যকে ছোট করার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ শিক্ষিত হওয়ার পরিচয় দিতে পারে কিন্তু বিবেকবান হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সেই পরিচয় প্রমাণ করতে হয় আচরণে ভিন্নমতকে সম্মান করে, ক্ষমতার ব্যবহার সংযত রেখে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার আন্তরিকতায়।
বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় কাউকে শ্রেষ্ঠ নাগরিক করে না, রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যপদ কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখে না। এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু শিক্ষার মর্যাদা বাড়বে না। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়,
‘ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত গুনতিতে মোড়া বাড়িয়া চলেছি গোরু ছাগলের মতো!’
আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিককে বিভক্ত করবে? আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে স্লোগানের উচ্চতা যুক্তির গভীরতাকে ছাপিয়ে যাবে? এই পরীক্ষায় শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রকেও উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্বেষের যে বীজ আজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সমাজে তার বিষফল ভোগ করতে হবে আমাদের সবাইকে।










