বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

দেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চ হার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি মেলে না। কারণ, তাঁদের অনেকেরই নেই প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা; নেই ভাষাগত যোগ্যতা, সমস্যা সমাধানের বাস্তব সক্ষমতা। ফলে একদিকে বাড়ছে সনদধারীর সংখ্যা, অন্যদিকে বাড়ছে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান। এই সংকটের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামো, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত কলেজগুলোতে নির্বিচারে অনার্স কোর্স চালু এবং উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতা অন্যতম।
গ্রামগঞ্জের অনেক বেসরকারি কলেজে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অনার্স ও ডিগ্রি পাস কোর্স খোলা হয়েছে। যেখানে নেই যোগ্য শিক্ষক, নেই সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা। ক্লাসও হয় না ঠিকমতো। উপজেলা পর্যায়ের অনেক সরকারি কলেজের অবস্থাও একই। শুধু নতুন নতুন কোর্সের অনুমোদন আর ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত হয় না। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষক, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, মানসম্মত পাঠ্যক্রম এবং কঠোর একাডেমিক তদারকি।
আজ অনেক শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্সে পড়ছেন অথচ তাঁরা বাংলা-ইংরেজি শুদ্ধভাবে বলতে বা পড়তে পারেন না। ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ কিংবা নিজের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার মতো মৌলিক দক্ষতায় তাঁরা অনেক পিছিয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাঁরা অনার্সে পড়েন কিন্তু ইংরেজিতে অনার্স বানান করতে পারেন না, যা খুবই দুঃখজনক। এমন শিক্ষার্থীর হাতে সনদ তুলে দেওয়া গেলেও তাঁকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা কঠিন। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন করা নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞান, কর্মদক্ষতা, চিন্তা ও মননের উন্নয়ন, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যা মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করা।
বর্তমানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব নয়। চাকরিদাতারা এমন কর্মী খোঁজেন, যাঁদের মধ্যে বাস্তব সমস্যা সমাধান করার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর যোগাযোগ করতে পারার সক্ষমতা রয়েছে। আমার এক পরিচিত শিল্পপতিকে বলতে শুনেছি, ‘সবাই বলে দেশে চাকরি নেই, কিন্তু আমি তো চাকরি দেওয়ার জন্য ইন্টারভিউ নিতে গেলে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাই না।’
আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার বড় গলদ বা দুর্বলতা হলো, শুধু তাত্ত্বিক পড়াশোনা আর পরীক্ষায় পাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। সেখান থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং হাতে-কলমে কাজ শেখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করলেই হবে না, পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও পাঠ্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার গুণগত মান, কর্মমুখী দক্ষতার অভাব এবং ডিগ্রির সঙ্গে কর্মসংস্থানের অসামঞ্জস্য নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বাড়ছে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি এবং বেসরকারি ১১৬টি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ২২৫৭টি। সরকারি কলেজ মাত্র ৫৫৫টি (সূত্র: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৩)। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। যদিও শিক্ষাবিদরা নাম-সর্বস্ব এসব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের উচ্চশিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। গবেষণা বলছে, এসব উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশই বেকার। আর উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বড় অংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
একটি দেশের উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই প্রয়োজন। তবে দক্ষ শিক্ষক ও গবেষণার পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় না রেখে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে একই ধরনের ডিগ্রি প্রদান করলে উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য তার বিশাল ক্যাম্পাস, নান্দনিক দালানকোঠা আর শিক্ষার্থীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সাফল্য নির্ভর করে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দেশ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখার সক্ষমতার ওপর। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যায় নয়, শিক্ষার মান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাই হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের মাপকাঠি। সবাইকে শুধু উচ্চশিক্ষিত করা নয়; প্রত্যেককে সুশিক্ষিত, দক্ষ, আত্মনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম ও কাঠামো নিয়ে যেমন ভাববার সময় এসেছে, তেমনি বেকার তৈরির কারখানা হিসেবে খ্যাত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোও পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করে মৌলিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তার পরিবর্তে ‘জাতীয় বৃত্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি; যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হবে কেবল উচ্চশিক্ষার সনদ প্রদান নয়, বরং দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ, কর্মক্ষম ও আত্মনির্ভর মানবসম্পদ তৈরি করা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে কৃষি ও কৃষিপ্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা-সহায়ক পেশা, মার্কেটিং, ব্যবসায় ও হিসাবরক্ষণ, পর্যটন, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, নির্মাণশিল্প, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস এবং সেলস ট্রেডসহ আধুনিক কারিগরি পেশায় ডিপ্লোমা, স্নাতক ও পেশাভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি কোর্সে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ এবং কর্মক্ষেত্রে বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে।
তবে এই পরিবর্তনের অর্থ সাধারণ উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ করে দেওয়া নয়। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানসহ মৌলিক ও মানবিক জ্ঞান চর্চারও নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। তাই মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও ডিগ্রির স্বীকৃতি সুরক্ষিত রেখে যোগ্য শিক্ষক ও উপযুক্ত অবকাঠামোসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাপথের মধ্যে স্থানান্তরের সুযোগ থাকতে হবে। একটি ‘জাতীয় বৃত্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হবে শুধু তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করা নয়, তাঁদের দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এর পাঠ্যক্রম নির্ধারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিবিদ এবং শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের সংযুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে স্বাধীন মূল্যায়নব্যবস্থা ও নিয়মিত কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কেউ হবেন গবেষক, কেউ হবেন শিক্ষক, কেউ হবেন প্রযুক্তিবিদ আবার কেউ হবেন দক্ষ কারিগর; উচ্চশিক্ষিত বেকার নন। এবং তাঁরা প্রত্যেকেই হবেন কাজেকর্মে দক্ষ ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষার সার্থকতা শুধু সনদ অর্জনে নয়, বরং অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে। যে শিক্ষা মানুষকে কর্মক্ষম করে না, সেই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।









