বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটান। এই সময়েই তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু আমরা কি সচেতন যে সেই শিক্ষার্থীরা আজ নীরব এক বিপদের মুখোমুখি? হলের খাবার এবং খাদ্যাভ্যাসের ভয়াবহ অবস্থা ধীরে ধীরে তাঁদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি মেধা তৈরি করছে, নাকি ধীরে ধীরে অসুস্থ এক প্রজন্ম তৈরি করছে?
কিছুদিন আগে বুয়েটের শিক্ষার্থী আসিফ আসমাত নিবিড়ের মৃত্যু এই বাস্তবতাকে নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরে জানা যায়, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় নিয়মিত বাটার বান, ডিপ-ফ্রাইড খাবার এবং তেলযুক্ত ফাস্টফুড খেয়েছেন। এই অভ্যাসের কারণে তাঁর শরীরে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। আসিফের ঘটনা শুধু এক শিক্ষার্থীর গল্প নয়; এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সাধারণ চিত্রের একটি প্রতিফলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা প্রায় একই রকম। সকালে অনেকের নাশতা হয় বাটার বান, ডালপুরি বা শিঙাড়া, যা প্রায়ই বহুবার ব্যবহৃত তেলে ভাজা। দুপুরে ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল এবং সামান্য তরকারি। রাতের খাবারও প্রায় একই রকম। মাঝেমধ্যে ক্ষুধা মেটাতে ক্যাম্পাসের দোকান থেকে চাউমিন, ফ্রাইড রাইস, প্যাকেটজাত নুডলস বা বার্গার খাওয়া হয়। এই খাবারের বড় একটি অংশে থাকে অতিরিক্ত তেল, ট্রান্স ফ্যাট এবং নিম্নমানের উপাদান, যা দীর্ঘ মেয়াদে লিভার সমস্যা, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে।
কেন শিক্ষার্থীরা এমন খাবারের ওপর নির্ভরশীল? প্রথমত, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। অনেক শিক্ষার্থী সীমিত বাজেটে দিন কাটান। সাশ্রয়ী দামের কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে সস্তা খাবার খান। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যকর খাবারের অভাব। ক্যাম্পাসের বেশির ভাগ হলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের বিকল্প নেই। তৃতীয়ত, সচেতনতার অভাব। শিক্ষার্থীরা খাদ্য এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে অসচেতন। চতুর্থত, প্রশাসনের উদাসীনতা। ডাইনিং ব্যবস্থার মান, স্বাস্থ্যবিধি এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে না? যদি প্রশাসন বা ছাত্রসংগঠনগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিত, তবে হয়তো এমন বিপর্যয় ঘটত না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সুপেয় পানির অভাব। অনেক হলে শিক্ষার্থীরা যে পানি দিয়ে গোসল বা অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ করেন, সেই একই পানি পান করেন। এই আধুনিক যুগে এমন পরিস্থিতি কল্পনা করা দুঃসাহসিক। আর আবাসনের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর—চারজনের রুমে আটজন, গণরুমে ২০-৩০ জন একই ঘরে থাকা, যেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিভিন্ন চর্মরোগ, সংক্রামক রোগের দ্রুত বিস্তার অনিবার্য।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে হলের প্রভোস্ট বা হাউস টিউটররা উদাসীন। তাঁরা কেবল কাগজে সই দিয়ে দায় সারেন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, হাইজিন ও জীবনমানের উন্নতির কোনো জবাবদিহি তাঁদের কাছে নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্যকে বিপদের মধ্যে রেখে বাধ্য হয়ে বসবাস করছেন। এই বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও প্রভাবিত করছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চালু থাকলে ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি শিক্ষার্থীদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে? হলে বিক্রি হওয়া খাবারের মান এবং পুষ্টিগুণ কে নিরীক্ষণ করছে? ছাত্রসংগঠনগুলো কি খাদ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প প্রচারে ভূমিকা রাখছে? একজন শিক্ষার্থী কি বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাবারে নির্ভর করবেন?
সমাধান অবশ্যই সম্ভব। প্রশাসন চাইলে খুব সহজেই কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন—
ডাইনিং মেনু পুনর্গঠন: পুষ্টিবিদদের পরামর্শে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবারের বিকল্প তৈরি করা।
নিয়মিত মান পরীক্ষা: প্রতিটি হলে খাবারের মান, স্বাস্থ্যবিধি এবং পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি: খাদ্য ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কর্মশালা, সেমিনার এবং ক্যাম্পেইন চালানো।
ছাত্রসংগঠনের সহায়তা: তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প গ্রহণের গুরুত্ব প্রচার করতে পারে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়; এটি একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার জায়গা। যদি সেই প্রজন্মই ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে সেই শিক্ষার সাফল্য কতটা অর্থবহ হবে? আসিফের মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শুধু ডিগ্রি তৈরি করলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কথাটা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে কি?
ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকারের পতনের পর সারা দেশে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। সেসব মামলা থেকে কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী-এমপি, স্থানীয়পর্যায়ের নিরপরাধ নেতা-কর্মী কেউই রেহাই পাননি। এভাবে হরেদরে মামলা দেওয়ার কারণে সেই সময় ব্যাপারটি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।
২ ঘণ্টা আগে
কোভিড-১৯ মহামারির ধকল কাটিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও যখন অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বের নামীদামি সব সংবাদমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষ একে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বললেও কার্যত এটি রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর যুদ্ধ।
২ ঘণ্টা আগে
স্বাধীনতা মূলত একটি স্পৃহা, যাকে পূর্ণ করে মানুষ আনন্দ আর স্বস্তি লাভ করে থাকে। সে কারণে আমাদের দেশে একদা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আজ অনেক বছর পার হওয়ার পর সেই স্পৃহার সামনে কতগুলো প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যার উত্তর না খুঁজলে আমাদের স্বাধীনতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে।
২ ঘণ্টা আগে
যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২৩ মার্চ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইরানের কাছে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেটি কতটা আন্তরিকতাপূর্ণ আর কতটা তাদের চতুর কৌশল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পাওয়া পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা এ যুদ্ধ বন্ধে কোনো অবদান রাখতে পারবেন...
১ দিন আগে