Ajker Patrika

মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ

শিক্ষকদের ৯৮ ভাগ অবৈধ, অনিয়ম ৬০০ কোটির

  • মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদন।
  • ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব অনিয়ম।
  • প্রতিষ্ঠানটি ছিল সাবেক মন্ত্রী কামাল মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে।
রাহুল শর্মা, ঢাকা 
শিক্ষকদের ৯৮ ভাগ অবৈধ, অনিয়ম ৬০০ কোটির
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষক এখন ৬৭৬ জন। তাঁদের মধ্যে ৬৬২ জনের নিয়োগে মানা হয়নি কোনো নিয়মনীতি। সব প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছেমতো তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা, পরিচালনা কমিটির সম্মানী ভাতা, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০০ কোটি টাকার বেশি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও ভয়াবহ এসব অনিয়মের তথ্য পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। অধিদপ্তরের সাত কর্মকর্তা গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দুই দফায় এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে নিয়োগ, ভ্যাট ফাঁকি, একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা এবং সম্মানী বাবদ নেওয়া ভাতা সরকারি কোষাগারে জমা, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

তবে অধিদপ্তরের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সিরাজুল ইসলাম। আর প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি ম. হামিদুল হক মানিককে একাধিকবার ফোন ও এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

১৯৬৯ সালে রাজধানীর মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। বর্তমানে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার ২০৯ জন। আর শিক্ষক আছেন ৬৭৬ জন এবং কর্মচারীর সংখ্যা ১১৮ জন।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এবং তাঁর পরিবারের। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় কামাল মজুমদার কারাগারে রয়েছেন।

শিক্ষক নিয়োগে মানা হয়নি নিয়ম

শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে হলে প্রার্থীকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয়। থাকতে হয় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) শিক্ষক নিবন্ধন সনদ। নিয়োগের আগে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশও বাধ্যতামূলক।

এ ছাড়া নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রতিনিধির উপস্থিতি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার টেবুলেশন শিট সংরক্ষণসহ পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু রাজধানীর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ৬৬২ জন শিক্ষক নিয়োগে এসব নিয়মের কোনোটিই মানা হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়া। আর অনেক শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদনই করেননি। অনেক শিক্ষকের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র তদন্তকালে পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছেন।

ভাতার নামে লোপাট ৯০ কোটি টাকা

২০১০ সাল থেকে হওয়া এসব নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের পাশাপাশি একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা, পরিচালনা কমিটির সম্মানী ভাতা, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০৫ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪২ টাকার অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তদন্ত দল।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৮১৯ শিক্ষক-কর্মচারীকে একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে মোট ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৪ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একাডেমিক উন্নয়ন ভাতা ৬৩ কোটি ৪৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৮ টাকা এবং নগর ভাতা ২৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৬ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক উন্নয়ন এবং নগর ভাতা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা নেই। এসব অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

এর বাইরে আর্থিক বিধিতে প্রভিশন না থাকলেও গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ২ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬৪ টাকা সম্মানী নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

নির্মাণে অনিয়ম ৪৩৬ কোটি

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মাণ/মেরামত ও উন্নয়ন খাতে মোট ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮ হাজার ৪৪২ টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে তদন্ত দল এসব অর্থ ব্যয়ের ভাউচার, ব্যয়ের প্রক্রিয়া, গভর্নিং বডির রেজল্যুশনসংক্রান্ত কোনো তথ্য পায়নি। প্রতিবেদনে নির্মাণ/উন্নয়ন খাতে করা বিপুল অর্থ ব্যয়ের ভাউচার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ না করায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা অথবা রেকর্ডপত্র উদ্ধারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।

ছাপাখানা থাকলেও খরচ ১১ কোটি

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। এরপরেও এ খাতে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭১২ কোটি খরচ দেখানো হয়েছে। এসব অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুদ্রণ খাতে আত্মসাৎকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে জমা করতে হবে। ব্যর্থতায় দায়ী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলো।

আর্থিক নয়ছয়ের চিত্র

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ইব্রাহিমপুর শাখায় আদায় করে মোট ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭০ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ক্যানটিন বাবদ আদায় করা ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকাও ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি। এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় করা ৪ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৭ টাকা এবং ছয়টি গাড়ি ক্রয় বাবদ ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার কোনো ভাউচার তদন্তকালে প্রদর্শন করা হয়নি। এ জন্য অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এর বাইরে বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ না করেও ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকার খরচ দেখানো হয়েছে। বাড়িভাড়া-চিকিৎসা বাবদ নেওয়া ৫৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ টাকা এবং ইব্রাহিমপুর ক্যাম্পাসের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা ১ কোটি ১৭ লাখ ৬৭ হাজার ৯১০ টাকা প্রতিষ্ঠানের তহবিলের জমা দেওয়া হয়েছে।

পদে পদে ভ্যাট ফাঁকি

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রশ্নপত্র ছাপা, বিজ্ঞাপন, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন খরচে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যাট বাবদ ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৬ টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করে চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে। এর বাইরে সম্পত্তি ভ্যাট ও আইটি বাবদ ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিশেষ ক্লাস ও পরিচালনা কমিটির সম্মানীর আয়কর বাবদ ১ কোটি ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৯৮৭ টাকা এবং উন্নয়নকাজ বাবদ ১ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ৪৯১ টাকা এবং ঠিকাদারকে দেওয়া বিল থেকে ১০ কোটি ৫২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৬ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

১০টি শিফটই অবৈধ

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রভাতি ও দিবা মিলিয়ে মোট ১৪ শিফট চালু রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪টি শিফট অনুমোদিত অর্থাৎ বাকি ১০টি শিফটেরই অনুমোদন নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ছয়টি শাখায় ২৯ হাজার ২০৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত জটিল, তাই ছয়টি শাখাকে আলাদা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা করার সুপারিশ করা হলো।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রকৃত অর্থে শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে একটি বৃহৎ শিক্ষার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সীমাহীন অর্থ আদায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের মাত্রাতিরিক্ত বেতন/ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঐকমত্য পরিলক্ষিত হয়েছে।

আরও বলা হয়েছে, এ প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা অধিশাখা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো আমার কাছে আসেনি। প্রতিবেদন পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বছরের পর বছর দলবদ্ধ ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল, বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ইরানের নতুন রণকৌশল: হরমুজের তলদেশ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান

বিনা খরচে কারিনা কায়সারের মরদেহ দেশে আনছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

জেরুজালেমের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ, ইসরায়েল বলছে ‘পূর্বপরিকল্পিত পরীক্ষা’

লাগবে না হরমুজ—পাইপলাইন ও রেলে আসবে উপসাগরীয় তেল!

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত