জামায়াত যে প্রার্থী দিচ্ছে, তারা কত ভোট পেতে পারে? আমার হিসাবে তাদের বড়জোর ৯০টি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরও কেন তারা নির্বাচন করছে? জামায়াত হয়তো বলবে—গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতেই তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ভালো একজন প্রার্থী দিয়ে প্রকারান্তরে তারা বিএনপির ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটিকে আমার কাছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ গুরুত্বহীন, সম্মানিত অথচ অবহেলিত, ক্ষমতাবান এবং একই সঙ্গে ক্ষমতাহীন ব্যক্তি বলে মনে হয়। উনি অনেক কিছুই পারেন, অথচ কিছুই পারেন না। মাত্র দেড়টি কাজ ছাড়া আর সবকিছুই তাঁকে করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। এ রকম একটা পদে নির্বাচন হবে এ মাসের ২০ তারিখে। তবে ওই পদে কে নির্বাচিত হবেন, সেটা জানতে আমাদের হয়তো অত দিন অপেক্ষা করতে হবে না। এক সপ্তাহ আগেই আমরা সেটা জেনে যাব। ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনেই জানা যাবে কে হতে যাচ্ছেন আমাদের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। বিএনপি যাঁকে মনোনয়ন দেবে, বস্তুত তিনিই যাবেন ৫৪ একর জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বঙ্গভবনের বাসিন্দা হয়ে।
এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে ২০ আগস্ট হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন ২৪ জুলাই। সে হিসাবে এক মাস না পেরোতেই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারমুক্ত হবেন। এরই মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে তারা এই নির্বাচনে অংশ নেবে। যদি তারা শেষ পর্যন্ত প্রার্থী দেয়, তাহলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এই নির্বাচন হবে কেবল সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে। এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের সদস্যসংখ্যা ৩৪৭ জন। ফলে ১৭৪ জন এমপি যাঁকে ভোট দেবেন, তিনিই নির্বাচিত হবেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ বিএনপির সদস্য আছেন ২৪৫ জন। এ ছাড়া তাদের জোটের আছে আরও তিনজন। স্বতন্ত্রদের মধ্যে যাঁরা নির্বাচনের আগেও বিএনপি করতেন, এখন বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের সংখ্যাও ৩-৪ জন হবেন। ফলে ধরেই নেওয়া যায় ২৫০টি ভোট তারা অবধারিতভাবে পাবে। এই সংখ্যা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তাহলে জামায়াত এ নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছে কেন? ফলাফল যখন জানাই, তাদের প্রার্থীর জয়ের কোনোই সম্ভাবনা নেই, তখন তারা এই নির্বাচনে অংশ কেন নিচ্ছে? এই অংশগ্রহণ কি নিতান্তই হাস্যকর? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। উল্টো এখানে আমি একটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেখতে পাই। এ নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে বরং আরেকবার রাষ্ট্রপতি পদটি আমাদের সংবিধানে কীভাবে আছে, সেটা একবার বলে নিই।
আজ পর্যন্ত যে সংবিধানটি বলবৎ আছে, তার ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন।’ এর পরেই আবার বলা হয়েছে—‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ এতটুকু পড়ে মনে হতেই পারে মাত্র এই দুটি কাজই কেবল রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী করতে পারেন। কিন্তু লক্ষ করবেন, এই লেখার শুরুতে আমি দুটি নয়, দেড়টি কাজের কথা বলেছিলাম! আসলে এই দুটি কাজের প্রথমটি তিনি করতে পারবেন শর্ত সাপেক্ষে। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগটি তাঁকে করতে হবে ৫৬ (৩) অনুসারে। অর্থাৎ সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের যাঁর প্রতি সমর্থন আছে বলে রাষ্ট্রপতির কাছে মনে হবে, তাঁকেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারবেন। যাঁকে ইচ্ছা তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন না। তবে প্রধান বিচারপতিকে তিনি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারবেন। এ জন্যই দেড়টি বলেছিলাম।
এর বাইরে যত কিছু আছে, করতে হবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে। সংবিধানে আরও বলা আছে—‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।’ সরকারি যেকোনো প্রজ্ঞাপনের দিকে তাকালে দেখবেন সকল আদেশ-নির্দেশ কিন্তু হয়ে থাকে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’। প্রধানমন্ত্রী কোনো আদেশ দেন না, সব রাষ্ট্রপতি দেন। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রীর আদেশই রাষ্ট্রপতির আদেশ হিসেবে জারি করা হয়। এ এক আজব পদ্ধতি! তাঁর কোনো কিছু করারই ক্ষমতা নেই, অথচ সবকিছুই তাঁর নামে হয়ে থাকে! আমি বুঝি না এভাবে ঘুরিয়ে খাওয়ার কী দরকার থাকতে পারে। নিশ্চয়ই কোনো অপরিহার্য কারণ রয়েছে, আমাদের মোটা মাথায় সেটা ঢোকে না।
রাষ্ট্রপতির জীবন যে খুব একটা উপভোগ্য, তা মনে হয় না। আমাদের সবশেষ দুই রাষ্ট্রপতির কথাবার্তায় সে রকমই ধারণা করি। আবদুল হামিদ সাহেব তো একাধিক পাবলিক মিটিংয়ে সে কথা প্রকাশও করেছেন। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরায় কীভাবে তাঁকে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকতে হতো, সেসব বলেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে আমার যতবার কথা হয়েছে, তিনি তাঁর অসহায়ত্বের কথা উচ্চারণ করেছেন। ওই বিশাল প্রাসাদে থাকাটা তিনি যে মোটেই এনজয় করছেন না, সে কথাও বলেছেন অকপটে। একাধিকবার নিজেকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘বন্দী’ হিসেবে। তারপরও এই পদটি পেতে অনেকের মধ্যে যে আকুতি দেখি, তা আমাকে বিস্মিত করে।
এরই মধ্যে ইঁদুরদৌড় শুরু হয়ে গেছে। অনেকের মধ্যেই দেখেছি আলোচনা। সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা। বিএনপির অনেক সিনিয়র রাজনীতিক নানা দেনদরবার করছেন বলেও শুনেছি। রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া যায়—তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। স্থায়ী কমিটি দীর্ঘ আলোচনার পর প্রার্থী নির্বাচনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছে দলীয় চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। অর্থাৎ, এখন যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন, তিনি আসলে প্রধানমন্ত্রীর বদন্যতাতেই হবেন। এর আগেও তা-ই হয়েছে। জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ, মো. সাহাবুদ্দিন—তাঁরা সবাই শেখ হাসিনার পছন্দে হয়েছেন। এই পছন্দের মধ্যে গণতন্ত্রহীনতা কতটা প্রবল, তার নির্মম উদাহরণ হচ্ছে মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি হতে পারা। এই নামটি ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বা মন্ত্রী ভাবতেও পারেননি, তাঁকেই রাষ্ট্রপতি করা হবে! সবকিছু হাসিনার ইচ্ছায়ই হয়েছে। এখনো কি তা-ই হচ্ছে না? শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে যদি সেটা একনায়কতান্ত্রিক আচরণ হয়ে থাকে, তাহলে এবারেরটাকে কী বলবেন? অথচ এই একজনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার যে পদ্ধতি, তার থেকে মুক্তি পেতেই হয়েছিল ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন। ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমান হয়তো তেমন একনায়ক হতে চান না, কিন্তু তাঁরই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কি তাঁকে সেই দিকেই ঠেলে পাঠাচ্ছেন না?
এমন বাস্তবতায় জামায়াতের এই যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত, এটা অনেকের কাছে কৌতুককর মনে হতে পারে। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও লড়াইয়ে নামা। ধরা যাক জামায়াত খুব ভালো একজনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিল। হয়তো বিএনপির অনেক এমপি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দও করেন। তবু তাঁরা কি জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন? না, পারবেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদই তাঁদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেবে না। বিএনপির ২৪৭ জন এমপির সবাইকেই বাধ্যতামূলকভাবে তারেক রহমানের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।
তাহলে কেবল হেরে যাওয়ার জন্যই জামায়াত কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে? এর আগে ১৯৯১ সালে একবার এ রকম নির্বাচন হয়েছিল। সেবারই রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতি চালু হয়েছিল। এরশাদ পতনের পর সেবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। বিএনপি তাদের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দিয়েছিল রাষ্ট্রপতি পদে। বিপরীত দিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল সাবেক বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। জামায়াত এমপিদের সমর্থন নিয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। ওই একবারই, এরপর প্রতিবারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ৩৫ বছর পর এবার আবার সেই ভোট প্রদানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই নির্বাচনে কোনো উত্তেজনা থাকবে বলে মনে হয় না। সে বিবেচনায় একে ‘দুধভাত’ নির্বাচন বলা যায়। জামায়াত যে প্রার্থী দিচ্ছে, তারা কত ভোট পেতে পারে? আমার হিসাবে তাদের বড়জোর ৯০টি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরও কেন তারা নির্বাচন করছে? জামায়াত হয়তো বলবে—গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতেই তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ভালো একজন প্রার্থী দিয়ে প্রকারান্তরে তারা বিএনপির ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগ নেত্রীর মতো মো. সাহাবুদ্দিন মার্কা কোনো প্রার্থী দেয়, তাহলে জামায়াত তাদের বিকল্প প্রার্থীর নাম উচ্চারণের মাধ্যমে জনমত গড়ার চেষ্টা করতে পারবে। গণতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যটি আলোচনায় আনতে পারবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সম্প্রতি ওমানের পরিবেশ অধিদপ্তর বন্য প্রাণী নিয়ে কনটেন্ট নির্মাতাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যেভাবে বন্য প্রাণী নিয়ে ছবি তুলছেন আর ভিডিও বানাচ্ছেন, তাতে বন্য প্রাণী মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে, বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে...
২ ঘণ্টা আগে
মুরগি, গরু, খাসি—যেকোনো মাংসের চাপ সুস্বাদু বটে। তবে অতিরিক্ত কাজের চাপ যেমন জীবনে কোনো ‘মজা’ যোগ করে না, তেমনি পানির চাপও চরম বিপদের কারণ হয়। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে হয়ে যাওয়া টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার পানির চাপ সেই প্রমাণ দিচ্ছে।
২ ঘণ্টা আগে
জি এম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি লালমনিরহাট-৩ ও রংপুর-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সপ্তম, অষ্টম, নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন তিনি।
১ দিন আগে
সবকিছুর দাম বাড়ে, মানুষের দাম বাড়ে না। এই আক্ষেপ এখন অনেকের। বিশেষ করে নুন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের, তারা বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করেছিল যারা, তাদের মনেও সংশয়।
১ দিন আগে