
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি ও শক্তি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতিকে সুযোগ দিতে ১০ দিনের একটি সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। এরপর হয়তো কিছু একটা ঘটবে। ট্রাম্পের সামনে আপাতত তিনটি বিকল্প: কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকা; ইরানকে চুক্তি সম্পাদনে বাধ্য করতে ছোট পরিসরে সামরিক হামলা; অথবা বড়সড় হামলা চালিয়ে সরকারের পতন ঘটানো।
আপাতত পুরো দুনিয়া দমবন্ধ করে সময় গুনছে। ট্রাম্প কী করেন, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছে সবাই। এ কথা পরিষ্কার যে ট্রাম্পের সামনে থাকা তিনটি বিকল্পেরই পরিণতি হবে ভিন্ন ভিন্ন। এগুলোর প্রভাবও হবে ভিন্ন ভিন্ন।
প্রথমে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির আওতায় দীর্ঘদিন একঘরে হয়ে থাকা ইরান বিশ্বমঞ্চে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল। ইরানি জনগণও নতুনভাবে ভাগ্য গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। সে সময় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থা বারবার নিশ্চিত করেছিল, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে নজরদারিতে সহযোগিতা করছে। সব পক্ষই একধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছিল।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দেশটিসহ ছয় মুসলিম দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। তখন থেকেই ইরান আবার বৈরী হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা বৈরিতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই বৈরিতার ফল হয়েছে—পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকেছে ইরান।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় আসেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা থাকলেও তা কোনো না কোনোভাবে চাপা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই আবারও ইরানের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত বছর দেশটিতে এক দফায় আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প যদিও দাবি করেছেন, ওই হামলার পর ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা কী, তা পরিষ্কার নয়। কারণ, ট্রাম্পের ওই হামলার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল যে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির সরঞ্জামগুলো আগেভাগেই লুকিয়ে ফেলেছিল।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাবলি যদি আমরা বিবেচনায় নিই, তাহলে দেখা যাবে, ইরান ইস্যুতে কূটনীতিই সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে। হামলা কিংবা অন্য কোনো উপায় ততটা কার্যকর ফল দিতে পারেনি।
ট্রাম্পের সামনে দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো সীমিত পরিসরে হামলা। এমন হামলা কতটা কাজে আসতে পারে, তার একটি নমুনা আমরা এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি। কিছু আগেই গত বছরের হামলার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছি। এ ছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পরের ঘটনাবলিও অনেকের জানা। কাজেই সীমিত পরিসরে হামলায় ইরান কতটা বাগে আসবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
ইরান ইস্যু সমাধানে ট্রাম্পের সামনে তৃতীয় বিকল্প হলো বড়সড় হামলা চালিয়ে সরকার পতন ঘটানো। ইরানে খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই ক্ষোভ জমছে। কিছুদিন আগে আমরা ব্যাপক পরিসরে বিক্ষোভের ঘটনাও সেখানে দেখেছি। কিন্তু তারপর কর্তৃপক্ষের দমনপীড়নে সেই বিক্ষোভ স্তিমিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষোভ ঠিকই রয়ে গেছে। ট্রাম্প ওই বিক্ষোভের সময় বারবার হুংকার দিয়েছেন। তবে ইরান প্রকাশ্যে তা কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ট্রাম্প হয়তো জনমনে জমতে থাকা এই ক্ষোভকে পুঁজি করে বড় হামলা চালিয়ে খামেনিকে হত্যা কিংবা আটক-গ্রেপ্তারের চেষ্টা করবেন, সরকার পতন ঘটানোর চেষ্টা করবেন। তিনি হয়তো ভাবছেন, ইরানে ফুঁসতে থাকা জনগণ তাঁর এই পদক্ষেপকে সমর্থন দেবে।
কিন্তু হিতে বিপরীতও হতে পারে। খামেনি ও তাঁর অনুগত শাসকগোষ্ঠীরও জনসমর্থন রয়েছে ইরানে। আমরা এই জনসমর্থনের একাংশ প্রত্যক্ষ করেছি জেনারেল কাসেম সোলাইমানির জানাজায়। কাজেই খামেনির পতন মানে ইরানের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশে নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার হবে। তৈরি হবে অস্থিতিশীলতা। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর কী ঘটেছে সবাই জানে। ইরানেও যে তেমন কিছু ঘটবে না, তা কে জানে।
আরেকটি বিষয় হলো, পশ্চিমাদের কাছে ইরান যদিও একঘরে, তারপরও তার রয়েছে শক্তিশালী কিছু মিত্র। এবার মার্কিন বাহিনী ইরানে বড় আকারে হামলা চালালে তাতে ইসরায়েলেরও অংশগ্রহণের সম্ভাবনা প্রবল। অতএব ইরানের পক্ষে ইসরায়েলবিরোধী অংশও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। ইরান যদি মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য বড় ধরনের একটি সংঘাতের কবলে পড়ে যেতে পারে। এমনিতেই সংকটে জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্য বহু বছর ধরে ধুঁকছে। তার ওপর ইরান ইস্যুতে একাধিক পরাশক্তি এই অঞ্চলে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। এর অভিঘাতে কেবল ইরানই নয়, এই অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি নতুন করে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস শক্তির দিক থেকে বেশ এগিয়ে। খামেনির সরকারব্যবস্থার পতন মানে এই বাহিনীরও পতন ঘটবে। যেমনটা সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর তাঁর সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী ইরাকি রিপাবলিকান গার্ডের ক্ষেত্রে ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে এই বাহিনীর সদস্যরা যে বিদ্রোহী হয়ে উঠবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে বহু বছরের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরান। দেশটিতে গতকাল এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল প্রায় ১৩ লাখ ইরানি রিয়াল। এতেই বোঝা যায়, দেশটির অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো সামরিক হামলা দেশটির অর্থনীতিকে একেবারে ধসিয়ে দেবে। এতে কষ্ট বাড়বে সাধারণ মানুষের। এ ছাড়া যেকোনো সামরিক হামলার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। সে দিক থেকে ইরানে সামরিক হামলা কোনোভাবেই কোনো ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না।
তবে ট্রাম্পের বাহিনী যদি ভেনেজুয়েলার মতো করে ইরান থেকে খামেনিকে বের করে নিয়ে যায়, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। যদিও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সৃষ্ট শূন্যতা কাটিয়ে ইরান কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রেও শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে যে একটা ধাক্কা লাগবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সেই ধাক্কা অন্তত বড় পরিসরের সামরিক হামলা ও যুদ্ধের চেয়ে অনেক কম হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, যা অভূতপূর্ব। তার মধ্যে অন্যতম হলো, আইনবহির্ভূতভাবে মব সন্ত্রাস তৈরি করে কিছু আদায় করে নেওয়া। কে কখন কোন স্বার্থান্বেষীর কবলে পড়ে অপমানিত হবেন, অর্থ খোয়াবেন, তা এতটাই অনিশ্চিত ছিল যে এই দুর্ঘটনাগুলো আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল।
২ ঘণ্টা আগে
একসময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক ছিল ভারত। কালের পরিক্রমায় সেই ভারতই এখন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখলদার ইসরায়েলের অন্যতম কৌশলগত মিত্র। মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলেই ভারত-ইসরায়েলের সম্পর্ক এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছেছে।
২ ঘণ্টা আগে
বিশ্বরাজনীতির বড় পরিবর্তনগুলো সাধারণত দৃশ্যমান নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে আসে—যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অভিঘাতে। কিন্তু কিছু পরিবর্তন ঘটে নীরবে, কূটনীতি ও বাণিজ্য প্রবাহের দিকবদলে। ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উত্থান তেমনই এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, যা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্গঠন...
৩ ঘণ্টা আগে
একটা সমাজে বাস করলে একজনের সঙ্গে আরেকজনের মনোমালিন্য হওয়াটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তার জের ধরে কাউকে হত্যা করা বর্বরতার শামিল। আমরা আদিম সমাজ থেকে সভ্য সমাজে প্রবেশ করেছি। কিন্তু আধুনিককালে এসেও যখন সেই আদিমতার লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পেরেছি?
১ দিন আগে