Ajker Patrika

প্রবাসী নারী শ্রমিকের জীবন

ফাহমিদা তাবাসসুম ফারহা
প্রবাসী নারী শ্রমিকের জীবন

দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যথেষ্ট কাজের ক্ষেত্র না থাকার কারণে উন্নত জীবনের হাতছানি এবং পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় প্রতিবছর আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর এক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিংহভাগ প্রবাসীর গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য, যার প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ নারী। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ নারী গৃহপরিচারিকার কাজে যুক্ত হন। সেখানে তাঁরা শুধু নির্দিষ্ট কাজেই যুক্ত থাকেন না। ভয়াবহ ব্যাপার হলো যে, এর বাইরে তাঁদের অমানুষিক পরিশ্রম করার পর গৃহকর্তার মনোরঞ্জনেও সঙ্গী হতে বাধ্য করা হয় বলে নানা সময়ে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর হাজার হাজার নারী নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মরুর দেশে পাড়ি জমান, যাঁদের প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব ও জর্ডান। এত সব ত্যাগের পরও তাঁদের সহ্য করতে হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

কাগজে-কলমে আমরা শিক্ষিত ও নীতিবান হলেও লিঙ্গবৈষম্য ও নারীদের অন্যায্য বেতন আমাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নারীদের বেতন পুরুষদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক, কাজ পাওয়ার সুযোগ তো আরও কম। এদেশে এখনো এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে শিক্ষার আলো নারীর দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি। দালাল চক্র এসব অজ্ঞ ও দরিদ্র নারীদের চাকরির আশা দেখিয়ে বিদেশে পাঠাতে প্রলুব্ধ করে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং সঠিক তথ্য না জানার কারণে এসব গ্রাম্য সহজ-সরল নারীদের অতি স্বল্প বেতনে চুক্তিতে রাজি করিয়ে তাঁদের তপ্ত মরুভূমির দেশে পাঠানো হয়। তাঁদেরকে যেসব আশার কথা বলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে যাওয়ার পর তাঁরা নতুন এক বাস্তবতার মধ্যে পড়ে যান। দালাল চক্র বছরের পর বছর ধরে এসব অপকর্ম করার পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। ফলে এসব চক্র নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, মোট নারী শ্রমিকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেরই প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব এবং বাকিদের একটি বড় অংশ যায় জর্ডানে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী নিয়োগকর্তার যাতায়াত খরচ বহন এবং সর্বনিম্ন ১০০০ সৌদি রিয়াল বেতনের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই তা পান না। তাছাড়া চুক্তিভিত্তিক ন্যায্য বেতন দাবি করলেও তাঁদের ওপর নেমে আসে পাশবিক নির্যাতন। এসব নির্যাতন শুধু মারধরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক ও যৌন নিপীড়নও এর অন্তর্ভুক্ত। কাজের অনভিজ্ঞতা ও ভাষার অদক্ষতা তাদের শোষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিজ অধিকার সম্পর্কে না জানা এবং প্রবাসীদের নিশ্চিত আইনি সুরক্ষার অভাব তাঁদের চরম অসহায় করে তোলে।

ব্র্যাকের ২০২৩ সালের অভিবাসন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর চুক্তিভঙ্গ, নির্যাতন ও নানা জটিলতার কারণে দেড় থেকে দুই হাজার নারী শ্রমিক শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসেন এবং প্রতিবছর দেড় শ থেকে দুই শতাধিক নারী শ্রমিকের লাশ দেশে আসে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁরা যখন কোনো বিচার না পেয়ে দেশে ফিরে আসেন, সমাজ ও তাঁদের নিজের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। বরং তাঁদের ওপর হওয়া নির্যাতনের জন্য তাঁদের চরিত্রকেই দোষারোপ করা হয়। শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যদের দ্বারা অবশিষ্ট অর্থ আত্মসাৎ করাও নতুন কিছু নয়। একদিকে সমাজের চোখে কলঙ্কিত, অন্যদিকে মানসিকভাবে ও আর্থিকভাবে পঙ্গুত্ব তাঁদের করে তোলে দিশেহারা। ফলে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়া এবং দেশে লাশ হয়ে আসা নারী কর্মীদের অন্তত ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’কে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

শুধু বাংলাদেশিরাই মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন নয়। এই তালিকায় রয়েছে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের নারীরাও। একদিকে ফিলিপাইন সরকার কঠোর চুক্তি ও ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে, অন্যদিকে নেপাল ঝুঁকিপূর্ণ গৃহকর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ির মতো কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু আমাদের দেশের সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

দেশে যেহেতু কাজের সংকট আছে, সেহেতু বিদেশে কাজের জন্য কাউকেই আটকানো সম্ভব না। ফলে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া এবং পাশবিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য যদি সেখানে শ্রমিক পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়, তবে এটা সঠিক কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং তা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। এ সমস্যার সবচেয়ে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে, নারীদের উপযুক্ত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। দীর্ঘ মেয়াদে তাঁদের শুধু গৃহকর্মী হিসেবে না পাঠিয়ে অন্যান্য দক্ষ ও কারিগরি পেশায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যদিও এটি অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব না।

এ ছাড়া দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন অসম্ভব। পাশাপাশি, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও মিশনগুলোতে দূতাবাসের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক পাঠানোর আগে তাঁদের ভাষা শিক্ষায় দক্ষ করা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। একই সঙ্গে শোষণের মূল উৎস ‘কাফলা’ পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনসম্মত কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশফেরত নির্যাতিত নারীদের সরকারিভাবে বিনা মূল্যে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশের মেয়েরা সব সময়ই অবহেলিত এবং বিদেশের মাটিতেও তাঁরা নির্মম নির্যাতনের শিকার। তাঁদের আমরা যেন আর ‘কলঙ্কিত’ মনে না করি। তাঁরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু সহ্য করে এসেছেন; এখন সময় তাঁদের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে পাশে দাঁড়ানো। তাঁদের জন্য নিরাপদ সমাজ গঠনের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের একার নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত