বেঁচে থাকার জন্য শরীরে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি সেই খাদ্য প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজন রান্নার জ্বালানি। রান্নায় ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস এখন মানুষের প্রতিদিনের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই আগুন জ্বালানোর জ্বালানিই এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি আর্থিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় পাইপলাইনের গ্যাসের চেয়ে এলপিজি গ্যাস অনেক পরিবারের কাছে ছিল নির্ভরযোগ্য বিকল্প। কিন্তু ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই বিকল্প এখন অনেকের জন্য ব্যয়বহুল বোঝায় পরিণত হয়েছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে। ফলে রান্নার জ্বালানির ব্যয় মেটাতে গিয়ে চাপে পড়ছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
২ নভেম্বর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে অক্টোবরে দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। দেশের বাজারে এই প্রথম ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত মূল্য দুই হাজার টাকা ছাড়াল। এর প্রভাব পড়বে সরাসরি সংসারের মাসিক ব্যয়ে। এলপিজির দাম বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের এলপিজির বড় অংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং পরিবহন খরচের পরিবর্তন দেশের বাজারে প্রভাব ফেলে। বিইআরসি সাধারণত সৌদির আরামকোর ঘোষিত কন্ট্রাক্ট প্রাইসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মাসিক মূল্য সমন্বয় করে। নভেম্বরের মূল্য নির্ধারণেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থাকলেই দেশের বাজারে ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষিত থাকতে পারে না।
সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের ব্যবধান। বিইআরসি মূল্য নির্ধারণ করলেও সব জায়গায় সেই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের ৩ নভেম্বরের এক প্রতিবেদন মতে, ‘সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন সময়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটিতে বাজারে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামের কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ সরকারি মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।’ এখানে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা এবং বাজার তদারকির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত দাম আদায়, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে পরিবহন ও সরবরাহের নামে বাড়তি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব নিয়ে সরকারের তদারকির অভাব নতুন কোনো বিষয় না। তবে প্রমাণ ছাড়া সব মূল্যবৃদ্ধিকে সিন্ডিকেটের ফল হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। বরং কোথায় প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে আর কোথায় বাজারব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে, তা স্বচ্ছভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি এলপিজি সিলিন্ডারের ওজন ও নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার কিনেও যদি সঠিক পরিমাণ গ্যাস না পান, তাহলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি দ্বিগুণ হয়। সিলিন্ডারের ওজন, গ্যাসের পরিমাণ, মেয়াদ, ভালভের কার্যকারিতা এবং মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে অনিরাপদ বা ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার বাজারজাত করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, পরিবেশক ও বিক্রেতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বড় অভিঘাত পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। একটি সিলিন্ডারের পেছনে দুই হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হলে পরিবারের অন্য প্রয়োজনীয় খাতের বরাদ্দ কমাতে হয়। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পুষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব পরিবারে একাধিক সদস্যের জন্য রান্না করতে হয়, তাদের জ্বালানি ব্যয় আরও বেশি। ফলে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি প্রয়োজন। প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয় রসিদ প্রদান এবং অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি আমদানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা এবং সরকারি খাতের এলপিজি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় বিকল্প জ্বালানির সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তবে বিকল্প জ্বালানির নামে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ব্যবস্থার দিকে মানুষকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। এলপিজি কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার অজুহাতে দেশের ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়। মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা, বাজারে ন্যায্য দাম, সঠিক ওজন এবং নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, জ্বালানি নীতির প্রকৃত সফলতা শুধু আমদানি বা সরবরাহের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না; সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই তার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়।










