Ajker Patrika

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের কারণ

ফারহানা মীম
গ্লোবাল সাউথের উত্থানের কারণ

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতির পরিচিত সমীকরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কূটনৈতিক সক্রিয়তা এবং ব্রিকসের সম্প্রসারণ পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’।

প্রশ্ন হচ্ছে, গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান কি সত্যিই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করছে, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার পুরোনো প্রতিযোগিতায় নতুন পক্ষের আবির্ভাব? বাস্তবতা হলো, বিশ্ব এখনো পশ্চিমা আধিপত্যমুক্ত কোনো নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করেনি। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করছে। ফলে বর্তমান পরিবর্তনকে পশ্চিমা আধিপত্যের তাৎক্ষণিক অবসান না বলে বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।

‘গ্লোবাল সাউথ’ বলতে কেবল ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণে অবস্থিত দেশগুলোকে বোঝায় না। এটি মূলত এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয়, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ, উন্নয়নের বৈষম্য, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘদিনের প্রান্তিক অবস্থানের অভিজ্ঞতা। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় বিশ্বের ধারণা এবং ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মধ্যে। একসময় এসব দেশ পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বর্তমান গ্লোবাল সাউথের আকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত। এখন তাদের দাবি শুধু উন্নয়ন সহায়তা বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ম, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কার্যকর অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা।

এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাবের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজার এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সক্রিয় কূটনীতি পশ্চিমা শক্তির একচ্ছত্র প্রভাবকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এখন আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের অবস্থান অনুসরণ করতে দেখা যায় না। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান এই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ব্রিকসের সম্প্রসারণে। এখানেই গ্লোবাল সাউথের উত্থানের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে। একই জোটে অন্তর্ভুক্ত হলেই রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এক হয়ে যায় না। চীন ও ভারতের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত জোটের সব সদস্যের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন দেশগুলোর একটি বিস্তৃত পরিসর, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। আন্তর্জাতিক সংকটগুলোতেও এই স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিফলিত হচ্ছে।

জলবায়ু অর্থায়ন, বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন, ন্যায্য বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মতো বিষয়ে দেশগুলোকে সম্মিলিত অবস্থান তৈরি করতে হবে। শুধু সম্মেলনে অভিন্ন বক্তব্য দেওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক চুক্তি, কার্যকর উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময়, শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যনিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন ধরনের নির্ভরতার মুখে পড়বে। ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নিজস্ব ডিজিটাল পরিচয়, অর্থ লেনদেন ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এ ধরনের সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন নতুন বৈষম্য, নজরদারি বা তথ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।

সব মিলিয়ে গ্লোবাল সাউথের উত্থান বিশ্বরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এটি পশ্চিমা আধিপত্যের তাৎক্ষণিক অবসান নয়, আবার নতুন কোনো ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতাকেন্দ্রের জন্মও নয়। বরং বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে এবং নতুন শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলো আর কেবল আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের অনুসারী থাকতে চাইছে না; তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রেও নিজেদের অংশীদারত্ব দাবি করছে।

কিন্তু এই দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কতটা কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে তার ওপর। নতুন কোনো পরাশক্তির অধীনে পুরোনো নির্ভরতার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ন্যায়সংগত, অংশগ্রহণমূলক ও বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত তাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তন একটি সুযোগ, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কেবল কূটনৈতিক ভারসাম্য নয়, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম বদলানোর দাবি তোলার আগে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত বিশ্বক্ষমতার পালাবদলে কারা এগিয়ে থাকবে, তা শুধু তাদের অর্থনৈতিক আকার দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে কারা নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত