
দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জেলা হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাট এখন দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বিমানবন্দরটি সচল করার স্বপ্ন এবার বাস্তবতার পথে এগোচ্ছে। সরকার বদলেছে বহুবার, কিন্তু বিমানবন্দরটি চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি—উত্তরাঞ্চলের মানুষের এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার যে ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছে, তার ওপর দাঁড়িয়েই বর্তমান নির্বাচিত সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিমানবাহিনীর প্রধান লালমনিরহাট বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে রানওয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে বিমান উড্ডয়নও করা হয়। পরে সেনাসদরের এক ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, দেশের স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার বিমানবন্দরটি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তখন সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্স অধিদপ্তরের পরিচালকও স্পষ্টভাবে বলেন, দেশের নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি হতে পারে, এমন কোনো কর্মকাণ্ডে কাউকে সম্পৃক্ত করার আগে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে।
সেই ভিত্তির ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর সচল করা, বুড়িমারী থেকে ঢাকায় সরাসরি ট্রেন চালু, চার লেন সড়ক নির্মাণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ এটি সরকারের আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগ কেন শুধু উন্নয়নের গল্পে থেমে নেই? কেন এটি এখন কূটনৈতিক চাপের কেন্দ্রেও? উত্তরটা মূলত ভৌগোলিক। লালমনিরহাট এমন একটি স্থানে অবস্থিত, যেখান থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডর মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে।
এই করিডরকে অনেকে বলেন ‘চিকেন নেক’। শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি হওয়ায় সামরিক ও কৌশলগত কারণে এই বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে ভারতের আপত্তি থাকাটা স্বাভাবিক বলেই মনে করি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো চুক্তি বা আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তাই দেশের স্বার্থে এই বিমানবন্দর চালু করার পথে এগিয়ে যাওয়াই যুক্তিসংগত।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই বিমানবন্দরে চীন সম্পৃক্ত হলে তা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে ভারত ত্রিপুরার কৈলাশহর বিমানঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় করার কাজ শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, এই ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে, সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে এই বাস্তবতাটুকু মাথায় রেখেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
ভারতের মূল উদ্বেগের কেন্দ্র আসলে চীন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সজাগ নজরে। যদি লালমনিরহাটে চীনা প্রযুক্তি কিংবা অর্থায়ন আসে, তবে প্রযুক্তি, তথ্য ও লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে এটি কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতা বর্তমান সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এই উদ্বেগ মানেই কি দেশের উন্নয়নকে থামিয়ে রাখা? আমার মতে, এই উদ্বেগ সামনে রেখেই একটি বিচক্ষণ কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। অর্থায়নের প্রশ্নে স্বচ্ছতা, ভারতের সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রাখা এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালনার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিলে সন্দেহের মাত্রা অনেকটা কমে আসতে পারে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটার অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে যে অবকাঠামো ঋণের আড়ালে কখনো কখনো সার্বভৌমত্বের দর-কষাকষি হয়। সেই ভুল এড়িয়ে, দশকের পর দশক অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের অধিকারকে ভূরাজনীতির মোড়কে বন্দী না করাটাই রাষ্ট্রের কর্তব্য।
তাহলে বর্তমান সরকারের সামনে পথটা কেমন হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, বিনিয়োগের উৎস নির্ধারণে স্বচ্ছতা রাখতে হবে। যেকোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো একটি পক্ষের কৌশলগত আধিপত্যের আশঙ্কা না থাকে। দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। বিমানবন্দরটি যে বেসামরিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হবে, তা শুধু বিবৃতিতে নয়, নীতির কাঠামোতেও স্পষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত, এই বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক সংযোগের হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলে নেপাল ও ভুটানকেও শুরু থেকে আলোচনায় রাখা দরকার। তাহলে এটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় না থেকে বহুপক্ষীয় উদ্যোগে পরিণত হবে, যা ভারতের আপত্তির যুক্তিকে দুর্বল করবে।
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা মিলিয়ে এই পুরো অঞ্চল বরাবরই দেশের অন্যতম অনগ্রসর এলাকা। শিল্প নেই বললেই চলে, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, রপ্তানির সুযোগ সংকুচিত। বিমানবন্দর চালু হলে কৃষিজাত পণ্য, হস্তশিল্প, এমনকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কার্গো সহজে দেশে-বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। হাঁড়িভাঙা আম এবং ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িমারী স্থলবন্দরের যাত্রী ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষায় চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে এই বিমানবন্দরের। মানুষ ঢাকামুখী না হয়ে স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। তাই বর্তমান সরকারের কাছে এই বিমানবন্দর শুধু একটি অবকাঠামোর প্রকল্প নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিও।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের হাতে এই মুহূর্তে একটি বড় সুযোগ আছে। অন্তর্বর্তী সরকার কঠিন পরিবেশে ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়ে গেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, আন্তর্জাতিক মনোযোগও তৈরি হয়েছে। এখন দরকার শুধু সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন। প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চললে, বিনিয়োগের উৎস নিয়ে সততা রাখলে এবং রাজনৈতিক চাপের বদলে অর্থনৈতিক যুক্তিকে সামনে রাখলে কোনো পক্ষই কার্যকরভাবে আপত্তি জানাতে পারবে না। উন্নয়নকে নিরপেক্ষতার কাঠামোয় উপস্থাপন করাটাই এই মুহূর্তে আমাদের জন্য হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দক্ষতা।
লালমনিরহাট বিমানবন্দর তাই শুধু একটি রানওয়ে নির্মাণের প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে এই উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে এবং পুরো দেশকে দেখাতে পারে আত্মবিশ্বাসী এক নতুন পথচলার দৃষ্টান্ত। ইতিহাস বলছে, যে সরকার নিজের শর্তে উন্নয়নের পথ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে, তারাই শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। বর্তমান সরকারের সামনেও সেই সুযোগ। এখন দেখার বিষয়, তারা কতটা সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক,ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ব যখন নতুন শক্তির সমীকরণ খুঁজছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১ দিন আগে
বর্তমান পৃথিবীতে মেধার বিকল্প কিছু নেই। এখন যা কিছু করবেন, যা কিছু ভাববেন, সবকিছুতেই মেধার দরকার। মেধার বিকল্প একমাত্র অধিক মেধাসম্পন্ন চিন্তাভাবনা। মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, বাস্তবভিত্তিক কাজকে সমাধান করার জন্য। মুক্তবুদ্ধির চিন্তা করতে হবে, যা চলমান আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মানানসই হয়।
১ দিন আগে
১২ মে ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের নার্স, আমাদের ভবিষ্যৎ, জীবন রক্ষায় প্রয়োজন নার্সের ক্ষমতায়ন’—আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক মৌলিক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। সেই সত্যটি হলো—নার্সরা শুধু স্বাস্থ্যসেবার একটি অংশ নন; তাঁরা আমাদের আস্থা, ভরসা এবং মানবিকতার প্রতীক।
১ দিন আগে
আজকের পত্রিকার একটি খবর থেকে জানা যায়, ৮ মে নাটোরের লালপুর উপজেলার গ্রিন ভ্যালি পার্কে রাজশাহীর কয়েকজন তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের হাতে দুই বিদেশি পর্যটক হেনস্তার শিকার হন। হেনস্তাকারী হিসেবে যারা অভিযুক্ত, তাদের মধ্য থেকে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
১ দিন আগে