Ajker Patrika

ট্রাম্প-সি বৈঠকে বিশ্ববাসী নতুন কিছু পাবে কি

চিররঞ্জন সরকার
ট্রাম্প-সি বৈঠকে বিশ্ববাসী নতুন কিছু পাবে কি
এবারের ট্রাম্প-সি বৈঠকে কোনো নাটকীয় ঐতিহাসিক চুক্তির সম্ভাবনা কম। ছবি: এএফপি

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ব যখন নতুন শক্তির সমীকরণ খুঁজছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামীকাল বুধবার তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। আলোচনার টেবিলে থাকবে ইরান সংকট, ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য—যে বিষয়গুলো আজকের বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তি আগ্রহের কারণও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই শক্তির শীর্ষ নেতারা যখন মুখোমুখি হন, তখন তা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় থাকে না; বরং বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাকাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও তা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বরাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিযোগিতা আর শুধু সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিগত আধিপত্য, জ্বালানিনিরাপত্তা, কৌশলগত সরবরাহ শৃঙ্খল, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণ—এসবই নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় ট্রাম্প-সি বৈঠক নিছক একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই বৈঠককে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নাটকীয় পুনর্মিলন হিসেবে দেখার সুযোগ খুব কম। বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটন ও বেইজিং এখন এমন এক কাঠামোগত প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে, যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজনীয় হলেও অবিশ্বাস গভীর। দুই দেশই জানে, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা তাদের কারও জন্যই বাস্তবসম্মত নয়। আবার কেউই অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা নিরাপত্তা প্রশ্নে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে এই বৈঠকের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য সম্পর্ক পুনর্গঠন নয়; বরং প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা—অর্থাৎ এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উত্তেজনা থাকবে, কিন্তু তা সরাসরি সংঘাতে রূপ না নেয়।

সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাণিজ্য ও অর্থনীতি। গত কয়েক বছরে শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠন এবং কৌশলগত পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমেই রাজনৈতিক চরিত্র পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চীনের শিল্প ভর্তুকি, বাজার প্রবেশাধিকার এবং বৌদ্ধিক সম্পত্তি সুরক্ষা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে চীন মনে করে, ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাকে জাতীয় নিরাপত্তার ভাষায় ব্যাখ্যা করে তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা সীমিত করতে চাইছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকে চীন মার্কিন কৃষিপণ্য, জ্বালানি বা বিমান খাতে কিছু বড় বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্রও সীমিত বাণিজ্যিক নমনীয়তার বার্তা দিতে পারে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তির সম্ভাবনা কম হলেও একটি সীমিত বাণিজ্যিক ‘ট্রুস’ বা উত্তেজনা-হ্রাসের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এই অর্থনৈতিক আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং হালকা প্রকৌশল খাতের বড় অংশ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা উৎপাদন ঘাঁটি বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করে, আর তখন বাংলাদেশ নতুন সুযোগ পেতে পারে। ইতিমধ্যে অনেক পশ্চিমা ক্রেতা ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের অংশ হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নজর দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিনিয়োগ ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে, কারণ, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো চীনা যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।

নিরাপত্তা ইস্যুও এই বৈঠকের একটি বড় স্তম্ভ হবে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নটি দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক মার্কিন অস্ত্র বিক্রি, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট জোরদার করা বেইজিংকে আরও সতর্ক করেছে। চীনের কাছে তাইওয়ান প্রশ্ন কেবল আঞ্চলিক রাজনীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রীয় বিষয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও মিত্রদের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অংশ।

এই ইস্যুতে বড় ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তবে সামরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, ভুল হিসাব থেকে সংঘাত এড়ানো এবং সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মতো বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

এখানেও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর এখন ক্রমেই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের কাছাকাছি হওয়ায় বড় শক্তিগুলোর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা দেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি পূর্ব এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে বৈশ্বিক শিপিং খরচ বৃদ্ধি, কনটেইনার সংকট এবং পণ্য পরিবহনে বিলম্ব বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাও এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। আজকের বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং বিরল খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ শক্তির ভিত্তি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত চিপ ও এআই প্রযুক্তি রপ্তানিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আর চীন নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরিতে বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করছে। একদিকে ডিজিটাল অবকাঠামো, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ফিনটেক এবং এআইভিত্তিক সেবায় নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্লক বিভাজন তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে প্রযুক্তিগত অংশীদার বেছে নিতে আরও কৌশলী হতে হবে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল সেবা খাতে এই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এবারের বৈঠককে আরও জটিল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা। ইরান ঘিরে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহনের অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারকদের একটি হওয়ায়, ওয়াশিংটন চাইতে পারে বেইজিং তেহরানের ওপর কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করুক। এই বিষয়টি প্রকাশ্যে না এলেও পর্দার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব আরও সরাসরি। বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। ফলে ট্রাম্প-সি বৈঠকে যদি জ্বালানিনিরাপত্তা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা আসে, তার পরোক্ষ সুবিধা বাংলাদেশও পেতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবতা হলো: অভাগা যেদিক দিয়ে যায় সাগরও শুকিয়ে যায়!

ব্যক্তিগত কূটনীতির প্রশ্নটিও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিং—দুজনই শক্তিশালী, কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের প্রতীক, যাঁদের ব্যক্তিগত রসায়ন অতীতে একাধিক সংকটময় মুহূর্তে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছিল। তবে ২০২৬ সালের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এখন ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ক আর শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করছে না; বরং প্রযুক্তিগত আধিপত্য, সামরিক নিরাপত্তা, জ্বালানি প্রবাহ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে।

তাহলে এই বৈঠক থেকে বিশ্বের প্রত্যাশা কী হওয়া উচিত? বাস্তবতা বলছে, এখানে কোনো নাটকীয় ঐতিহাসিক চুক্তির সম্ভাবনা কম; বরং সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি। যদি দুই পক্ষ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করে, বাণিজ্যে সীমিত নমনীয়তা দেখায়, সামরিক যোগাযোগ বাড়ায় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ভুল হিসাব এড়াতে ন্যূনতম আস্থার কাঠামো গড়ে তোলে—তাহলেই এই সফরকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা যাবে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতার বার্তাও স্পষ্ট। বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, কৌশলগত সুযোগও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাণিজ্য বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি—এই চারটি ক্ষেত্রেই আমাদের দেশকে আরও প্রস্তুত হতে হবে। কারণ, আজ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক শুধু দুই পরাশক্তির কূটনৈতিক সমীকরণ নয়; এর প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতিফলন পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং কৌশলগত অবস্থানের ওপরও। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রস্তুত?

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

৯০ লাখ ভোটার বাদ দিয়ে হারানো হয়েছে তৃণমূলকে, মমতার আবেদনে সাড়া দিলেন আদালত

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর: শুভেন্দু

জঙ্গল সলিমপুরে হবে দুটি পুলিশ একাডেমি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হাজিরা খাতায় মা উপস্থিত থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেন ছেলে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত